আমি খারাপ কথা বলি নাই। সত্যি কথা বলেছি। এই লোক মহাধুরন্ধর। মহাডেঞ্জারাস। মহাবদমাইশ।
অনিক বলল, না, না জাফর ইকবাল, একজন মানুষ সম্পর্কে এরকম কথা বলার কোনো যুক্তি নেই। যুক্তি ছাড়া কথা বলা ঠিক না। যুক্তি ছাড়া কথা বলা অবৈজ্ঞানিক।
আমি রেগেমেগে বললাম, তুমি বিজ্ঞানী মানুষ ইচ্ছে হলে তুমি বৈজ্ঞানিক কথা বলো। আমার এত বৈজ্ঞানিক কথা বলার দরকার নাই।
অনিক বলল, আরে, আরে! তুমি রেগে যাচ্ছ কেন?
আমি চিৎকার করে পা দাপিয়ে বললাম, আমি মোটেই রাগি নাই। কথা নাই বার্তা নাই আমি কেন রাগ? কার ওপর রাগব? এই বলে আমি রেগেমেগে ঘর থেকে বের হয়ে গেলাম।
দুদিন পর আমি আবার অনিকের সাথে দেখা করতে গেলাম। এর আগের দিন আমি রেগেমেগে বের হয়ে গিয়েছিলাম বলে একটু লজ্জা লজ্জা লাগছিল, অনিক সেটা নিয়ে আমার ওপর রেগে আছে কিনা কে জানে। দরজায় শব্দ করার সাথে সাথে অনিক দরজা খুলল, আমাকে দেখে কেমন যেন ঠাণ্ডা গলায় বলল, ও তুমি? আস, ভেতরে আস।
আমি ভেতরে ঢুকলাম। আজকে ঘরদোর আগের মতন, অগোছালো এবং নোল্লা। টেবিলের ওপর একটা ফাইল, সেখানে কিছু কাগজপত্র। অনিক ফাইলটা বন্ধ করতে যাচ্ছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এইটা কী?
অলিক দুর্বল গলায় বলল, কিছু না।
আমি বললাম, কিছু না মানে? আমি স্পষ্ট দেখছি এক শ টাকার স্ট্যাম্পের ওপর কী কী লেখা তুমি মামলা করছ নাকি?
না, না। মামলা করব কেন?
তা হলে স্ট্যাম্পের ওপর এতসব লেখালেখি করার তোমার দরকার কী পড়ল? অনিক আমার কড়া চোখ থেকে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে আমতা-আমতা করে বলল, না, মানে আক্কাস আকন্দের লোকজন এসেছিল তো, তারা আমার সাথে একটা কন্ট্রাক্ট করে গেছে। সেই কন্ট্রাক্টটা একটু দেখছিলাম।
আমি আঁতকে উঠে বললাম, এর মাঝে তুমি কন্ট্রাক্ট সাইন করে ফেলেছ? তুমি দেখি আমার থেকে বেকুব।।
এবারে অনিক রেগে উঠে বলল, এর মাঝে তুমি বেকুবিব কী দেখলে?
কন্ট্রাক্টে কী লেখা আছে? কত টাকায় তুমি তোমার আবিষ্কার বিক্রি করে দিলে?
টাকার পরিমাণ লেখা হয় নাই। অনিক মুখ শক্ত করে বলল, আবিষ্কারটা হওয়ার পর আক্কাস আকন্দ সেটা কিনে নেবে সেটাই লেখা হয়েছে।
আমি অনিকের চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, তা হলে তুমি এরকম মনমরা হয়ে বসে আছ কেন?
আমি মোটেও মনমরা হয়ে বসে নাই। বলে অনিক আরো মনমরা হয়ে গেল।
আমি বললাম, আমার কাছে লুকানোর চেষ্টা করছ কেন? সত্যি কথাটা বলে ফেল কী হয়েছে।
কিছু হয় নাই। শুধু—
শুধু কী?
অনিক দুর্বল গলায় বলল, আমি একটা জিনিস বুঝতে পারছি না।
কী বুঝতে পারছ না?
এই কন্ট্রাক্ট সাইন করার পর আক্কাস আকন্দের লোকগুলো আমাকে একটা পানির বোতল, এক কেজি গুড় আর আধ কেজি লবণ দিয়ে গেল কেন?
আমি অবাক হয়ে বললাম, কী দিয়ে গেল?
এক বোতল পানি, এক কেজি গুড় আর আধ কেজি লবণ। অনিক মাথা চুলকে বলল, আমি যখন জিজ্ঞেস করলাম কেন, তখন বলল, কন্ট্রাক্টে নাকি এটা দেওয়ার কথা লেখা আছে। কিন্তু কাক্টে কোথাও সেটা খুঁজে পেলাম না।
দেখি কন্ট্রাক্টটা।
অনিক কেমন যেন অনিচ্ছা নিয়ে আমাকে কন্ট্রাক্টটা ধরিয়ে দিল। সেটা দেখে আমার আক্কেল গুড়ুম। এই মোটা কাগজের বান্ডিল কমপক্ষে চল্লিশ পৃষ্ঠা, পড়ে শেষ করতে একবেলা লেগে যাবে। আমি অবাক হয়ে বললাম, এত মোটা?
অনিক মাথা চুলকে বলল, হ্যাঁ, আমিও বুঝতে পারলাম না এত মোটা কেন।
কী লেখা এখানে, দেখি তো বলে আমি সেই বিশাল দলিল পড়ার চেষ্টা করলাম, ছোট ছোট অক্ষরে লেখা শুরু হয়েছে এভাবে :
কুতুব আলী মুহম্মদ ছগীর উদ্দিন নাছি জাহাঙ্গীর ওরফে অনিক লুম্বা সাং ১৪২ ঘটিমাছি লেন ঢাকার সহিত আকন্দ গ্রুপ অব ইন্ডাষ্ট্রিজের স্বত্বাধিকারী আক্কাস আকন্দের আইন কৌঁসুলির পক্ষে কেরামত মাওলা এসোসিয়েটসের আইনজীবী মাওলাবক্স কর্তক প্রস্তাবনামা প্রস্তুত নিমিত্তে প্রাথমিক অঙ্গীকারনামায় যথাক্রমে প্রথম পক্ষ, দ্বিতীয় পক্ষ এবং তৃতীয় পক্ষ হিসেবে উল্লিখিত ব্যক্তিবর্গ অথবা তাহাদের দেওয়া কর্তৃত্বনামায় উল্লিখিত প্রতিষ্ঠান অথবা ব্যক্তিবর্গকে ওকালতনামা দেওয়া সাপেক্ষ অঙ্গীকারনামায় সুষ্ঠু প্রস্তাবনার পক্ষে দ্বিতীয় পক্ষের আইনগত কৌঁসুলি অতীয় পক্ষের সহিত প্রথম ও দ্বিতীয় পক্ষের অঙ্গীকারনামায় চতুর্থ অনুচ্ছেদের দ্বিতীয় অংশে বর্ণিত শর্তাবলি সাপেক্ষে প্রথম পক্ষের সহিত কর্তৃত্ব প্রস্তুতের তালিকা বর্ণিত হইল।
আমি আমার জীবনে এর আগে এতবড় একটা বাক্য পড়ি নি। বাক্যটা পরপর পাঁচবার পড়েও এর অর্থ বোঝা দূরে থাকুক কী বলতে চেয়েছে বুঝতে পারলাম না। তখন বাক্যটা একবার উল্টাদিক থেকে পড়লাম আরেকবার আরবি ভাষার মতো ডানদিক থেকে বামদিকে পড়লাম। তারপরও কিছু বুঝতে পারলাম না, উপর থেকে নিচে পড়ে দেখব কিনা ভাবলাম কিন্তু ততক্ষণে টনটন করে আমার মাথাব্যথা করতে শুরু করেছে তাই আর সাহস করলাম না। আমি কাগজের বান্ডিলটা অনিকের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললাম, প্রথম বাক্যটা পড়েই মাথা ধরে গেছে, পুরো চল্লিশ পৃষ্ঠা পড়লে ব্রেনের রগ নির্ঘাত ছিঁড়ে যাবে।
পড়ার দরকার কী! অনিক পুরো বিষয়টা উড়িয়ে দেবার ভঙ্গি করে বলল, বলেই তো দিয়েছে এখানে কী লেখা। আমার আবিষ্কারটা শেষ হবার পর সেটা কিনে নেবে। শুধু–অনিক ইতস্তত করে থেমে গেল।
