অনিক অস্বস্তিতে একটু নড়েচড়ে বলল, ঠিক আছে।
আপনি বলেছেন, আপনি মশা মারার একটা ওষুধ বানাচ্ছেন।
অনিক মাথা নেড়ে বলল, না, আমি সেটা বলি নাই, আমি বলেছি মশার সমস্যা দূর করে দেবার একটা সিস্টেম দাঁড় করাচ্ছি।
খোকস আকশ বলল, একই কথা! মশাকে না মেরে মশার সমস্যা দূর করবেন কেমন করে?
অনিক বলল, মশা একটা সমস্যা কারণ মশা কামড়ায়। আর মশা কামড়ায় বলেই মানুষের অসুখবিসুখ হয়। আমি গবেষণা করছি যেন মশা আর মানুষকে না কামড়ায়।
না কামড়ায়? খোক্কস আকন্দ তার খোলা ধরনের চোখ দুটো বড় বড় করে বলল, মশা মানুষকে কামড়াবে না?
না। সেটাই বের করার চেষ্টা করছি।
খোক্কস অক বলল, আমরা কেমন করে বুঝব যে আপনি ঠিক ঠিক গবেষণা করছেন? মশা আসলেই কামড়াচ্ছে না?
অনিক দাঁড়িয়ে বলল, আসেন, আপনাকে দেখাই। ভেতরে আসেন।
অনিক খোলা আকন্দকে ভেতরে নিয়ে গেল, মশার ঘরের সামনে গিয়ে লাইট জ্বালাতেই হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ মশা ভনভন শব্দ করে উড়তে শুরু করল। খোক্কস আকন্দ মুখ হাঁ করে এই বিচিত্র দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে রইল। অনিক মশার শব্দ ছাপিয়ে গলা উঁচিয়ে বলল, এখন যদি কেউ এই ঘরে ঢোকে তা হলে মশা এক মিনিটের মাঝে তার রক্ত শুষে খেয়ে ফেলবে। খালি মানুষটার ছোবড়া পড়ে থাকবে।
খোস আকন্দ একবার মুখ বন্ধ করে আবার খুলে বলল, ছোবড়া?
হ্যাঁ। ছোবড়া। অনিক মাথা নেড়ে বলল, আর যদি ঠিক ঠিক গবেষণা করে মশাকে অন্য কিছু খাওয়ানো শেখাতে পারি তা হলে যে কোনো মানুষ এর ভেতরে বসে থাকতে পারবে, মশা তাকে কামড়াবে না!
খোক্কস আকন্দ অনেকক্ষণ মশার ঘরের ভেতর লক্ষ লক্ষ কিলবিলে মশার দিকে ভাকিয়ে রইল। তারপর আবার বসার ঘরে এসে বসল। কিছুক্ষণ অনিকের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, এটা আবিষ্কার করতে আপনার কতদিন লাগবে?
আবিষ্কারের কথা কেউ বলতে পারে না। কালকেও হতে পারে আবার এক বছরও লাগতে পারে।
খোক্কস আকন্দ তার মুখে তেলতেলে হাসিটা ফুটিয়ে বলল, যদি আপনার এই আবিষ্কারটা হয়ে যায় তা হলে আমি সেটা কিনে নেব।
অনিক বলল, কিনে নেবেন? আমি জিজ্ঞেস করলাম, কত টাকা দিয়ে কিনবেন?
খোক্কস আকন্দ কেমন যেন বিরক্ত হয়ে আমার দিকে তাকাল, বলল, এইখানে টাকার পরিমাণটা কোনো ইস্যু না। কেনার সিদ্ধান্তটা হচ্ছে ইস্যু।
অনিক আমাকে খবর দিয়ে এনেছে এই লোকের সাথে কথাবার্তা বলার জন্যে, আমি তো চুপ করে বসে থাকতে পারি না, জিজ্ঞেস করলাম, আপনি ঠিক কী জিনিসটা কিনবেন?
সবকিছু। গবেষণার ফল। মশার ঘর। মশা। মশার বাচ্চাকাচ্চা।
কেন কিনবেন?
খোক্কস আকন্দ হা হা করে হাসতে শুরু করল, একটু পরে হাসি থামিয়ে বলল, আমার কাজ হচ্ছে এক জায়গা থেকে একটা জিনিস কিনে অন্য জায়গায় বিক্রি করা।
অনিক জিজ্ঞেস করল, এটা আপনি কার কাছে বিক্রি করবেন?
সেটা শুনে আপনি কী করবেন? আপনি বিজ্ঞানী মানুষ বিজ্ঞানের আবিষ্কার করবেন। আমি ব্যবসায়ী মানুষ আমি সেটা দিয়ে ব্যবসা করব।
আমি বললাম, কিন্তু কত টাকা দিয়ে কিনবেন বললেন না?
খোক্কস আকন্দ বলল, আপনি সেটা নিয়ে মাথা ঘামাবেন না। এই আবিষ্কার যত টাকা দিয়ে কেনা উচিত ঠিক তত টাকা দিয়ে কিনব।
অনিক আমাকে ডেকে এনেছে কথাবার্তা বলার জন্যে কাজেই আমি চেষ্টা করলাম ব্যবসায়িক কথা বলার জন্যে। বললাম, আপনি মশার ঘর আর মশাও কিনবেন?
হ্যাঁ।
একটা মশার জন্যে আপনি কত দেবেন?
খোক্কস আকন্দ চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকাল, বলল, একটা মশার জন্যে?
হ্যাঁ। এতগুলো মশা তো আর এমনি এমনি দেওয়া যাবে না। রীতিমতো চাষ করে এই মশা তৈরি হয়েছে। কী পুরুষ্টু এক একটা মশা দেখছেন? কত করে দেবেন?
খোক্কস আকন্দ চোখ ছোট করে বলল, আপনি কত করে চাচ্ছেন?
আমি কত বলা যায় অনুমান করার জন্যে অনিকের দিকে তাকালাম কিন্তু অনিক হাত নেড়ে বলল, এসব আলোচনা করার অনেক সময় পাওয়া যাবে। আগে আমার গবেষণা শেষ হোক।
খোক্কস আকন্দ বলল, ঠিক আছে। তারপর সে তার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, আমি তা হলে উঠি। অনিক আবার ভদ্রতা করে বলল, চা কফি কিছু খেলেন না!
আপনার আবিষ্কার শেষ হোক। তখন শুধু চা কফি না, আরো অনেক কিছু খাব। বলে সে এমনভাবে অনিকের দিকে তাকাল যে আমার মনে হল যেন সে তাকে আস্ত গিলে খেয়ে ফেলবে।
আমার মানুষটাকে একেবারেই পছন্দ হল না, এখান থেকে বিদায় হলে বাঁচি! দরজার কাছে পঁড়িয়ে খোক্কস আকন্দ আবার ঘুরে অনিকের দিকে তাকাল, বলল, আমি যদি আমার দুজন অফিসারকে আপনার এই সেটআপ দেখার জন্যে পাঠাই আপনার আপত্তি আছে?
আমার ইচ্ছে ইল বলি, অবশ্যই আপত্তি আছে। কিন্তু অনিক মাথা নেড়ে বলল, না,, আপত্তি থাকবে কেন?
আমি মুখ ভোতা করে বললাম, আপনার অফিসাররা কেন আসবেন?
খোক্কস আকন্দ বলল, দেখার জন্যে। শুধু দেখার জন্যে!
খোক্কস আকন্দ বের হয়ে যাবার পর দরজা বন্ধ করে অনিক ফিরে আসতেই আমি বললাম, অনিক তোমাকে আমি সাবধান করে দিই। এই মানুষ থেকে এক শ মাইল দূরে থাকতে হবে।
অনিক অবাক হয়ে বলল, এক শ মাইল দূরে থাকতে হবে কেন? আমার তো আক্কাস আকন্দ সাহেবকে বেশ পছন্দই হল।
আক্কাস আকন্দ নয়। খোক্কস আক।
খোক্কস আকন্দ?
হ্যাঁ। রাক্ষসের ভাই খোক্কস। তোমার রক্ত-মাংস চুষে খাবে, তারপর তোমার চামড়া দিয়ে ড়ুগড়ুগি বাজাবে।
অনিক আমার কথা শুনে চোখ বড় বড় করে বলল, কী আশ্চর্য! এই ভদ্রলোককে তুমি দশ মিনিট দেখে কিনা সন্দেই অথচ তার সম্পর্কে কত খারাপ খারাপ কথা বলে ফেললে!
