কেন?
এই প্রচণ্ড ত্বরণের মাঝে মানুষ যেন নিজে থেকে কিছু করার চেষ্টা করে নিজের শরীরের ক্ষতি না করে ফেলে। সেজন্যে।
কিন্তু তুমি তো অচেতন নও।
আমি একটু ইতস্তত করে বললাম, না, আমি এখনো অচেতন নই।
কেন নও?
আমিও নিজেকে অচেতন করে ফেলব।
তাহলে কেন নিজেকে অচেতন করছ না?
ম্যাঙ্গেল ক্বাসের মস্তিষ্কে বসানো কপোট্রনটিকে এরকম সম্পূর্ণ একটি সপ্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে এরকম গুর তর আলোচনা শুরু করতে দেখে আমি খুব অবাক হয়ে গেলাম। আমার কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল কিন্তু তবুও জোর করে প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাচ্ছি। ম্যাঙ্গেল ক্বাসের গলা থেকে আবার বিচিত্র একটা শব্দ বের হলো, আমার প্রশ্নের উত্তর দাও,
তুমি কেন নিজেকে অচেতন করছ না?
তুমি কেন এটা জানতে চাইছ?
আমি ম্যাঙ্গেল ক্বাসের মস্তিষ্কের কপোট্রন। যখন প্রভু ম্যাঙ্গেল ক্বাস অচেতন থাকেন তখন আমি তার নিরাপত্তার দায়িত্ব নেই। আমাকে জানতে হবে তুমি কী করছ।
কেন?
যদি আমার মনে হয় তুমি প্রভুর বিরদ্ধে কিছু করছ তাহলে আমি তোমাকে হত্যা করব।
আমি আতঙ্কে শিউরে উঠে দেখলাম ম্যাঙ্গেল ক্বাসের একটি হাত খুব ধীরে ধীরে আমার মস্তিষ্কের দিকে তাক করে স্থির হলো। আমি জানি তার হাতের আঙুলে ভয়ঙ্কর বিস্ফোরক লুকানো রয়েছে, মুহূর্তে সেটি ছুটে এসে আমার মস্তিষ্ককে ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারে। আমি বিস্ফারিত চোখে দেখলাম তার আঙুলের ভেতর চামড়ার নিচে দিয়ে কিছু একটা নড়ে গেল, সম্ভবত বিস্ফোরকটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে স্থির হয়েছে।
ম্যাঙ্গেল ক্বাসের গলা দিয়ে আবার যান্ত্রিক বিচিত্র একটি শব্দ বের হলো, কাটা-কাটা গলায় বলল, আমার প্রশ্নের উত্তর দাও ইবান। তুমি কেন নিজেকে অচেতন করছ না?
আমি হতচকিত হয়ে ম্যাঙ্গেল ক্বাসের উদ্যত হাতের দিকে তাকিয়ে রইলাম, ইতস্তত করে বললাম, যারা নিজেদেরকে অচেতন করতে পারছে না আমি শুধু তাদের অচেতন করছি।
আমি ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলার জন্যে আরো কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলাম, মনে হলো হঠাৎ করে ম্যাঙ্গেল ক্বাসের ভিতরে কিছু একটা ঘটে গেছে, সে অত্যন্ত বিচিত্র ভঙ্গিতে স্থির হয়ে রইল। সে কিছু বলল না বা কিছু করল না। তার উদ্যত হাতটি এতটুকু নড়ল না এবং যে হাত দিয়ে আমাকে শক্ত করে ধরে রেখেছিল, সেই হাতটিও হঠাৎ করে শিথিল হয়ে গেল। কী হয়েছে আমি কিছু বুঝতে পারলাম না কিন্তু আমি বোঝার চেষ্টাও করলাম না। নিহিলা গ্যাসের মাস্কটি ম্যাঙ্গেল ক্বাসের মুখে চেপে ধরলাম, আমি দেখতে পেলাম ম্যাঙ্গেল কাসের বুক ওঠানামা করছে, এই গ্যাসটি তার ফুসফুসে রক্তের সাথে মিশে যাচ্ছে। মস্তিষ্কের কপোট্রনের উপর আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই কিন্তু মানুষ ম্যাঙ্গেল কাস। সহজে ঘুম থেকে জেগে উঠবে না।
আমি প্রবল ক্লান্তিতে মেঝেতে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করলাম। ঠিক তখন কে যেন আমার খুব কাছে হেসে উঠল। আমি কষ্ট করে চোখ খুলে তাকালাম, আমার খুব কাছে রিতুন ক্লিস দাঁড়িয়ে আছেন। হাসতে হাসতে তিনি আমার পাশে বসে পড়লেন, বললেন, চমৎকার! ইবান— চমৎকার।
কী হয়েছে?
তুমি দেখছ না কী হয়েছে?
না দেখছি না। আমি বড় একটা নিঃশ্বাস নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে?
ম্যাঙ্গেল কাসকে তুমি নিহিলা গ্যাস দিয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্যে অচেতন করে দিয়েছ। তার কপোট্রনকেও অচল করে দিয়েছ।
আমি কপোট্রনকে অচল করে দিয়েছি? কখন? কীভাবে?
তোমার সাথে কথোপকথনের সময় তুমি তাকে কী বলেছ মনে আছে?
না। আমার মনে নেই। অচেতন করা নিয়ে কিছু একটা বলছিল তখন আমিও জানি ভয় পেয়ে কিছু একটা উত্তর দিয়েছি।
রিতুন ক্লিস আবার হেসে উঠে বললেন, তোমার মনে নেই কিন্তু আমার খুব ভালো করে মনে আছে। কারণ তোমাদের এই কথোপকথন হচ্ছে ঐতিহাসিক একটি ব্যাপার। এরকম কথোপকথন আগে কখনো হয়েছে বলে আমার জানা নেই, ভবিষ্যতেও কখনো হবে কি না জানি না। কিন্তু যুক্তি তর্ক বা গণিতের একেবারে প্রাথমিক আলোচনাতেও এই কথোপকথনের যুক্তিগুলি থাকে।
আমি অবাক হয়ে বললাম, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
আমি বুঝিয়ে দিচ্ছি। রিতুন ক্লিস আমার আরো কাছে ঝুঁকে পড়ে বললেন, ম্যাঙ্গেল ক্বাসের কপোট্রন তোমাকে জিজ্ঞেস করেছে তুমি কেন নিজেকে অচেতন করছ না?
আমি কষ্ট করে মাথা নাড়লাম, হ্যাঁ মনে পড়েছে।
তুমি বলেছ, যারা নিজেদেরকে অচেতন করতে পারছে না তুমি শুধু তাদের অচেতন করছ। তাহলে কি তুমি নিজেকে অচেতন করবে? এই প্রশ্নের শুধুমাত্র দুটি উত্তর হতে পারে, এক : নিজেকে অচেতন করবে কিংবা দুই : নিজেকে অচেতন করবে না। ধরা যাক প্রথমটি সত্যি, অর্থাৎ তুমি নিজেকে অচেতন করবে, কিন্তু তুমি বলেছ যারা নিজেকে অচেতন করছে না তুমি শুধু তাদের অচেতন করছ কাজেই এটা হতে পারে না। তাহলে নিশ্চয়ই দ্বিতীয় উত্তরটি সত্যি, অর্থাৎ তুমি নিজেকে অচেতন করছ না। কিন্তু তুমি বলেছ যারা নিজেদেরকে অচেতন করছে না তুমি শুধু তাদের অচেতন করছ কাজেই এটাও সত্যি হতে পারে না। এটি একটি অত্যন্ত পুরানো গাণিতিক বিভ্রান্তি, তুমি খুব চমৎকারভাবে এখানে ব্যবহার করেছ। এই কপাট্রনের ক্ষমতা খুব সীমিত, এই বিভ্রান্তি থেকে সেটি কিছুতেই বের হতে পারছে না।
আমি মাথা নেড়ে বললাম, আমি এটা বুঝে ব্যবহার করি নি, হঠাৎ করে ঘটে গেছে।
আমি ভাগ্যে বিশ্বাস করি না, এটা নিশ্চয়ই হঠাৎ করে ঘটে নি। কিন্তু সেটা নিয়ে পরে আলোচনা করা যাবে, এখন আরো একটা খুব জরুরি কাজ বাকি রয়েছে।
