কে? কে কথা বলে? আমি চোখ খোলার চেষ্টা করলাম কিন্তু পারলাম না। আমি আবার গলার স্বর শুনতে পেলাম, ইবান। তুমি কিছুতেই জ্ঞান হারাতে পারবে না। তোমাকে যেভাবে হোক চেতনাকে ধরে রাখতে হবে। যেভাবেই হোক।
কে কথা বলছে? মানুষের গলার স্বরটি আমি আগে কোথাও শুনেছি কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছি না। গলার স্বরটি আবার কথা বলল, ইবান। তুমি চোখ খুলে তাকাও।
আমি পারছিলাম না, কিছুতেই চোখ খুলতে পারছিলাম না, কিন্তু গলার স্বরটি আবার জোর করল, চোখ খুলে তাকাও, ইবান।
আমি অনেক কষ্টে চোখ খুলে তাকালাম, আমার মুখের কাছে ঝুঁকে রিতুন ক্লিস দাঁড়িয়ে আছেন। আমাকে চোখ খুলে তাকাতে দেখে বললেন, আমি হলোগ্রাফিক প্রতিচ্ছবি না হয়ে সত্যিকার মানুষ হলে তোমাকে বুকে করে তুলে নিতাম ইবান। কিন্তু আমি সেটা পারব না। তোমাকে জেগে উঠতে হবে ইবান। যেভাবেই হোক জেগে উঠতে হবে। যদি মিত্তিকাকে বাঁচাতে চাও এই মহাকাশযানটিকে বাঁচাতে চাও তোমাকে জেগে উঠতেই হবে।
আমি দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বললাম, আমি পারছি না, কিছুতেই পারছি না।
তোমাকে পারতেই হবে। যেভাবেই হোক তোমাকে পারতেই হবে। ওঠ। ম্যাঙ্গেল ক্বাস আর তার দুইজন অনুচর অচেতন হয়ে আছে, ওঠ তুমি।
আমি কী করব?
নিহিলা গ্যাসের সিলিন্ডারটি এনেছ না?
হ্যাঁ, এনেছিলাম।
এই সিলিন্ডারটি এনে তাদের কাছাকাছি খুলে দিতে হবে— এদেরকে দীর্ঘ সময় অচেতন রাখতে হবে। ওঠ তুমি।
আমি ওঠার চেষ্টা করে পারলাম না, মনে হলো একটি পাহাড় ধরে চেপে রেখেছে। মনে হলো সমস্ত শরীর কেউ শিকল দিয়ে মেঝের সাথে বেঁধে রেখেছে। কয়েকবার চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিয়ে বললাম, পারছি না আমি মহামান্য রিতুন ক্লিস।
না পারলে হবে না ইবান। তোমাকে পারতেই হবে। এই যে দেখ তোমার পাশে কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্যে অক্সিজেন সিলিন্ডারটি আছে, তুমি এনেছিলে চিকিৎসা কক্ষ থেকে। সেটা নিজের কাছে টেনে নাও, টিউবটা তোমার নাকে লাগাও, তুমি শরীরে জোর পাবে ইবান।
আমি অমানুষিক পরিশ্রম করে পাশে পড়ে থাকা সিলিন্ডারটি নিজের কাছে টেনে আনলাম, জরুরি অবস্থায় শ্বাস নেবার জন্যে ছোট অক্সিজেন সিলিন্ডারটির সাথে লাগানো টিউবটি নিজের নাকে লাগানোর সাথে সাথে মনে হলো বুকের ভেতরে বাতাস এসে আমাকে বাঁচিয়ে তুলছে। বুক ভরে দুবার নিঃশ্বাস নিতেই মাথার ভেতর দপদপ করতে থাকা ভাবটা একটু কমে এল, আমি আবার চোখ খুলে তাকালাম।
রিতুন ক্লিস মুখে হাসি ফুটিয়ে বললেন, চমৎকার ইবান! চমৎকার। এবারে নিহিলা গ্যাসের সিলিন্ডারটি নিয়ে ম্যাঙ্গেল ক্বাসের কাছে যাও। সে এখনো অচেতন হয়ে আছে, তার নাকের কাছে নিহিলা গ্যাসটি ছেড়ে দিতে হবে, সে যেন আর জ্ঞান ফিরে না পায়।
কিন্তু সে অচেতন হয়ে থাকলেও তার মাথার ভিতরে কপোট্রন রয়েছে।
থাকুক। সেটা পরে দেখা যাবে। তুমি এগিয়ে যাও। নিহিলা গ্যাসের সিলিন্ডারটা নিয়ে এগিয়ে যাও। দেরি করো না।
আমি সমস্ত শক্তি ব্যয় করে কোনোভাবে উপুড় হয়ে নিলাম। তারপর নিহিলা গ্যাসের সিলিন্ডারটি হাতে নিয়ে সরীসৃপের মতো গড়িয়ে গড়িয়ে এগিয়ে যেতে থাকি। মেঝের সাথে ঘর্ষণে আমার মুখের চামড়া উঠে গিয়ে সমস্ত মুখ রক্তাক্ত হয়ে যায়, আমার পোশাক ছিড়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়, কিন্তু আমি তার মাঝেই নিজেকে টেনে টেনে নিতে থাকি। নিয়ন্ত্রণ কক্ষের এক অংশ থেকে অন্য অংশে যেতে আমার মনে হলো একযুগ লেগে গেল। প্রথমে ক্লদ এবং তারপর। মুশের অচেতন দেহ পার হয়ে আমি ম্যাঙ্গেল ক্বাসের কাছে এগিয়ে গেলাম। ক্লদ আর মুশ দুজনেই খারাপভাবে আঘাত পেয়েছে, মহাকাশযানের ভয়ঙ্কর ত্বরণের সাথে অপরিচিত অনভিজ্ঞ দুজন মানুষ প্রথম ধাক্কাতেই ছিটকে পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারিয়েছে। মাথার কোথাও আঘাত লেগেছে সেখান থেকে চুইয়ে চুইয়ে রক্ত বের হচ্ছে। আমি তাদের মুখের উপর নিহিলা গ্যাসের মাস্কটি কয়েক সেকেন্ডের জন্যে লাগিয়ে এসেছি, খুব সহজে এখন তাদের জ্ঞান ফিরে আসবে না।
আমি ম্যাঙ্গেল ক্বাসের কাছে পৌছে খুব কষ্ট করে মাথা তুলে তার দিকে তাকালাম, সে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে, নিঃশ্বাসের সাথে সাথে খুব ধীরে ধীরে তার বুক ওঠানামা করছে। আমি খুব সাবধানে ধীরে ধীরে নিহিলা গ্যাসের মাস্কটি হাতে নিয়ে ম্যাঙ্গেল ক্বাসের মুখে লাগানোর জন্যে এগিয়ে গেলাম, হঠাৎ করে ম্যাঙ্গেল কাসের চোখ খুলে গেল এবং তার ডান হাতটি খপ করে আমার হাত ধরে ফেলল। আমি হাতটি ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করে পারলাম না, সেটি শক্ত লোহার মতো আমার হাতকে ধরে রেখেছে। ম্যাঙ্গেল ক্বাস এবারে খুব ধীরে ধীরে আমার দিকে তাকাল, তার। চোখে একটি অতিপ্রাকৃত দৃষ্টি, সে বিচিত্র একটি যান্ত্রিক গলায় বলল, তুমি কে? তুমি কী করছ?
ম্যাঙ্গেল ক্বাসের মাথায় বসানো কপোট্রনটি কথা বলছে। আমি অবাক হয়ে লক্ষ করলাম সেটি আমাকে চেনে না— সম্ভবত ম্যাঙ্গেল ক্বাস যখন পুরোপুরি অচেতন হয়ে যায় শুধুমাত্র তখনই সেটি তার শরীরের দায়িত্ব নেয়। সম্ভবত এটি আমার জন্যে একটি সুযোগ। আমি গলার স্বর অত্যন্ত স্বাভাবিক রেখে বললাম, আমি ইবান। আমি মহাকাশযান ফোবিয়ানের অধিনায়ক।
তুমি নিহিলা গ্যাস মাস্ক নিয়ে কী করছ?
আমি ফোবিয়ানের সকল যাত্রীকে অচেতন করে রাখছি।
কেন?
ফোবিয়ানকে রক্ষা করার জন্যে তার গতিবেগকে অত্যন্ত দ্রুত বাড়াতে হবে, তার জন্যে প্রয়োজনীয় ত্বরণ মানুষের শরীর সহ্য করতে পারে না। যতক্ষণ পর্যন্ত গতিবেগ নিয়ন্ত্রিত না হচ্ছে ফোবিয়ানের সকল যাত্রীকে অচেতন করে রাখতে হবে।
