বলুন মহামান্য ইবান।
আমার কথা কি পুরোপুরি গোপনীয়? আর কেউ কী শুনতে পাবে?
না মাহামান্য ইবান, আর কেউ শুনতে পাবে না।
বেশ, তাহলে শোন আমি তোমাকে সপ্তম মাত্রার একটি জরুরি নির্দেশ দিচ্ছি।
ফোবি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, সপ্তম মাত্রার নির্দেশ? আপনি কি সত্যিই বলছেন?
আমি সত্যিই বলছি।
সপ্তম মাত্রার নির্দেশে মহাকাশযানকে ধ্বংস করার পর্যায়ে নেয়া হয়।
হ্যাঁ। আমি জানি। অধিনায়ক হিসেবে আমার সেই ক্ষমতা আছে।
আপনি কেন সপ্তম মাত্রার আদেশ দিচ্ছেন মহামান্য ইবান?
তুমি নিশ্চয়ই জানো ম্যাঙ্গেল ক্বাস মিত্তিকার মস্তিষ্কে একটা অস্ত্রোপচার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
জানি। অত্যন্ত দুঃখজনক একটি সিদ্ধান্ত।
সে যদি সত্যিই অস্ত্রোপচার শুরু করে তোমাকে এই আদেশ কার্যকরী করতে হবে। যদি না করে তাহলে প্রয়োজন নেই।
আমি কীভাবে আদেশ কার্যকরী করব?
ফোবিয়ানের গতিবেগ কমিয়ে আনতে শুরু করবে।
তার জন্যে ইঞ্জিন চালু করার প্রয়োজন রয়েছে।
আমি তোমাকে ইঞ্জিন চালু করার অনুমতি দিচ্ছি।
ফোবিয়ান দীর্ঘ সময় চুপ করে থেকে বলল, ফোবিয়ানের গতিবেগ কমিয়ে আনার অর্থ আমরা নিউট্রন স্টারে গিয়ে আঘাত করব।
হ্যাঁ, আমার ধারণা আত্মহত্যার জন্যে সেটি চমৎকার একটি উপায়।
আপনি আত্মহত্যা করতে চাইছেন মহামান্য ইবান?
না, চাইছি না। তবে অনেক সময় কিছু একটা না চাইলেও সেটা করতে হয়।
ফোবি আবার দীর্ঘ সময় চুপ করে থেকে বলল, আপনি সত্যিই এটা করতে চাইছেন?
হ্যাঁ। ফোবি আমি চাইছি।
বেশ তবে আমার কিছু সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রয়োজন। কী হারে গতিবেগ কমাব।
আমি বলছি, তুমি মন দিয়ে শোনো।
আমি আমার পাথরের মতো ভারী দেহকে টেনে নিতে নিতে ফোবিকে নির্দেশ দিতে শুরু করলাম।
৭. মাত্র কিছুক্ষণ হলো
মাত্র কিছুক্ষণ হলো আমি ফোবিয়ানে খানিকটা মাধ্যাকর্ষণ বল ফিরিয়ে দেয়ার জন্যে পুরো মহাকাশযানটিকে তার অক্ষের উপর ঘােরানো শুরু করেছি। এত বড় মহাকাশযানটিকে ঘুরাতে প্রচুর শক্তির প্রয়োজন, খুব ধীরে ধীরে সেটা ঘুরতে শুরু কছে। প্রায় সাথে সাথেই আমরা সবাই মহাকাশযানের দেয়ালে দাঁড়াতে শুরু করেছি। যতক্ষণ ভেসেছিলাম বুঝতে পারি নি এখন বুঝতে পারছি যে ফোবিয়ান আসলে ভয়ানকভাবে কাঁপছে, নিউট্রন স্টারের প্রবল মহাকর্ষ বলটি এই মহাকাশযানের উপর বেশ ভয়ঙ্কর চাপ সৃষ্টি করেছে। আমি নিয়ন্ত্রণ প্যানেলে ফোবিয়ানের যাত্রাপথটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলাম তখন পায়ের শব্দ শুনে ঘুরে তাকিয়ে আমি ভয়ানকভাবে চমকে উঠলাম। ম্যাঙ্গেল কাস সৈনিকদের মতো পা ফেলে হেঁটে আসছে, তার পিছনে দুজন অপরিচিত মানুষ, তারা মিত্তিকাকে ধরে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে আসছে।
আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, কী হচ্ছে, কী হচ্ছে এখানে?
ম্যাঙ্গেল ক্বাস শীতল গলায় বলল, বিশেষ কিছু নয়। এই মহাকাশযানের নতুন দুজন সদস্যকে তোমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিই অধিনায়ক ইবান।
মিত্তিকাকে ধরে রাখা দুজন মানুষ অদ্ভুত একটা ভঙ্গিতে হাসার চেষ্টা করল, তাদের চোখের দৃষ্টি দেখে তাদেরকে স্বাভাবিক মানুষ বলে মনে হলো না। এদেরকে আমি আগে কখনো দেখি নি, নিশ্চয়ই শীতল কক্ষ থেকে তাদের জাগিয়ে আনা হয়েছে। আরেকটু কাছে এলে আমি দেখতে পেতাম দুজনের কপালের ঠিক একই জায়গায় একটা ক্ষত, ম্যঙ্গেল ক্বাস নিশ্চয়ই তার অস্ত্রোপচার করে এই দুজন মানুষকে ঘাঘু অপরাধীতে পাল্টে নিয়েছে।
ম্যাঙ্গেল ক্বাস আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল, এরা হচ্ছে ক্লদ এবং মুশ। একসময়ে নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্য ছিল এখন আমার একান্ত অনুগত সদস্য। তাই না?
ম্যাঙ্গেল ক্বাসের কথার উত্তরে দুজনেই অনুগত গৃহপালিত রবোটের মতো মাথা নাড়ল। ম্যাঙ্গেল ক্বাস মুখে হাসি। ফুটিয়ে বলল, আমি তাদেরকে তাদের প্রথম দায়িত্ব দিয়েছি, দেখো তারা কী উৎসাহ নিয়ে দায়িত্ব পালন করছে।
আমি একটা নিঃশ্বাস নিয়ে বললাম, দায়িত্বটি কী?
মিত্তিকাকে চিকিৎসা কক্ষে নিয়ে অপারেশন থিয়েটারে শুইয়ে দেয়া। আমার তৃতীয় অস্ত্রোপচারের জন্যে প্রস্তুত করা।
মিত্তিকা আতঙ্কে চিৎকার করে ঝটকা মেরে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল কিন্তু পারল না, ক্লদ এবং মুশ শক্ত করে তাকে ধরে রেখেছে। তাদের মুখে একটা উল্লাসের ছায়া পড়ল, মনে হতে লাগল পুরো ব্যাপারটিতে তাদের। খুব আনন্দ হচ্ছে। আমি কঠোর গলায় বললাম, মিত্তিকাকে ছেড়ে দাও।
ক্লদ এবং মুশ এমনভাবে আমার দিকে তাকাল যেন আমি একটা অত্যন্ত মজার কথা বলেছি, তারা একে অপরের দিকে তাকাল এবং উচ্চস্বরে হাসতে শুরু করল। আমি গলার স্বর উঁচু করে বললাম, তোমরা বুঝতে পারছ না। তোমাদের মাথায় এই মানুষটি অস্ত্রোপচার করেছে? এখন তোমাদের ভেতরে কোনো ন্যায়-অন্যায় বোধ নেই। তোমাদের দিয়ে ম্যাঙ্গেল ক্বাস ভয়ঙ্কর অন্যায় করিয়ে নিচ্ছে।
ক্লদ হাত দিয়ে তার ক্ষতস্থান স্পর্শ করে মুখে জোর করে একধরনের হাসি ফুটিয়ে বলল, অস্ত্রোপচার যদি করে থাকে সেটি আমাদের ভালোর জন্যেই করেছে।
মুশ মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ, ভালোর জন্যেই করেছে।
দুজনে মিলে মিত্তিকাকে টেনে নিতে নিতে বলল, এখন আমরা এই মেয়েটার মাথায় অস্ত্রোপচার করব, তখন। সেও আমাদের একজন হয়ে যাবে।
মিত্তিকা আবার নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ইবান আমাকে বাঁচাও।
