ম্যাঙ্গেল ক্বাস একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমি ঠিক করেছি মিত্তিকাকে আমার সঙ্গী করে নেব। কী বল?
তোমার মতো একজন দানবের চরিত্রের সাথে মানানসই একটা সিদ্ধান্ত।
ম্যাঙ্গেল ক্বাস কোমরে বেঁধে রাখা অস্ত্রটি খুলে এবারে হাতে নিয়ে বলল, তোমার নিজের মঙ্গলের জন্যে বলছি ইবান, সীমা অতিক্রম করো না। ব্যাপারটি নিয়ে দুঃখিত হবারও সুযোগ পাবে না।
তুমি আমার মতামত জানতে চেয়েছিলে–
আসলে মতামত জানতে চাই নি, তোমাকে জানিয়ে রাখছিলাম। তোমার আসল সমস্যাটি কোথায় জানো?
ঠিক কোন সমস্যার কথা বলছ জানালে হয়ত বলতে পারতাম।
না, পারতে না। কারণ তুমি জানো না। ন্যায়-অন্যায় অপরাধ-মহত্ত্ব এসবের সংজ্ঞার পরিবর্তন হয়েছে। মস্তিষ্কের একটি ছোট অংশ আছে কি নেই সেটা হচ্ছে অপরাধী এবং নিরপরাধীর মাঝে পার্থক্য। যার সেই ছোট অংশ নেই তাকে কি আর অপরাধী হিসেবে ঘৃণা করা যায়, নাকি শাস্তি দেয়া যায়?
আমি কোনো কথা বললাম না। ম্যাঙ্গেল ক্বাস কয়েকমুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, প্রাচীনকালে অপরাধী ছিল, নীতিবান মানুষও ছিল, এখন ওসব কিছু নেই। যেমন মনে করো মিত্তিকার কথা। মেয়েটিকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে। কিন্তু আমি কি তাকে জোর করে আমার সঙ্গী করব? ম্যাঙ্গেল ক্বাস নিঃশ্বাস ফেলে বলল, কখনোই না। আমি তার মস্তিষ্কে ছোট একটা অস্ত্রোপচার করব, মিত্তিকা তখন তার চারপাশের জগৎকে নতুন চোখে দেখবে।
ম্যাঙ্গেল ক্বাস হাত দিয়ে নিজের বুক স্পর্শ করে বলল, মিত্তিকার তখন মনে হবে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে সবচেয়ে সুদর্শন সবচেয়ে আকর্ষণীয় মানুষ হচ্ছে ম্যাঙ্গেল ক্বাস। পতঙ্গ যেভাবে আগুনের দিকে ছুটে যায়, গ্রহাণু যেভাবে ব্ল্যাকহোলের দিকে ছুটে যায় ঠিক সেভাবে সে আমার কাছে ছুটে আসবে। বুঝেছ?
আমি মাথা নেড়ে জানালাম যে আমি বুঝেছি।
ঠিক এরকম সময়ে মহাকাশযানটি একটু কেঁপে উঠল, ম্যাঙ্গেল ক্বাসের ভুর একটু কুঞ্চিত হয়ে উঠল, সে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে?
আমরা নিউট্রন স্টারের মাধ্যাকর্ষণের কাছাকাছি চলে আসছি। ফোবিয়ানের গতিবেগ বেড়ে যাচ্ছে, এই ভয়ঙ্কর গতিবেগের জন্যে এটা মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে। আমরা নিউট্রন স্টারের মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে ব্যবহার করে গ্যালাক্সির এই অংশ পাড়ি দেব।
স্লিং শট প্রক্রিয়া?
হ্যাঁ।
অত্যন্ত অস্থিতিশীল সময়?
খানিকটা। তোমার হিসেবে ভুল হলে নিউট্রন স্টারে গিয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে।
আমি শান্ত গলায় বললাম, হিসেবে ভুল হবে না। ফোবিয়ান পঞ্চম মাত্রার মহাকাশযান, এর নিউরাল নেটওয়ার্ক হিসেবে ভুল করে না।
ম্যাঙ্গেল ক্বাস উঠে দাঁড়াতে গিয়ে খানিকদূর ভেসে গেল, ঘুরেফিরে এসে বলল, ইবান, এই ভরশূন্য পরিবেশ আমার আর ভালো লাগছে না। তুমি মহাকাশযানটিকে অক্ষের উপর ঘুরিয়ে মাধ্যাকর্ষণ ফিরিয়ে এনো।
আমি বললাম, আনব। নিশ্চয়ই আনব।
ম্যাঙ্গেল ক্বাস চলে যাবার পর আমি নিয়ন্ত্রণ প্যানেলের সামনে বসে দীর্ঘ সময় নিয়ে ফোবিয়ানের যাত্রাপথ পর্যবেক্ষণ করলাম। ফোবিয়ানের জ্বালানি সীমিত কাজেই যাত্রাপথে প্রতিটি বড় গ্রহ, নিরাপদ নক্ষত্র বা নিউট্রন স্টারকে ব্যবহার করা হয়, কোনো বিপদ না ঘটিয়ে যতটুকু সম্ভব কাছাকাছি যাওয়া হয়, প্রবল মহাকর্ষণে ফোবিয়ানের গতিবেগ বাড়িয়ে নেয়া হয়। গতিপথটি খুব যত্ন করে ছক করে নিতে হয় যেন নির্দিষ্ট দিকে নির্দিষ্ট বেগে যাওয়া যায়। ফোবিয়ানের নিউরাল নেটওয়ার্ক হিসেবে কোনো ভুল করবে না সে-ব্যাপারে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত, তবুও পুরোটা নিজের চোখে দেখতে চাইলাম। ম্যাঙ্গেল ক্বাসের দলকে উদ্ধার করার জন্যে খানিকটা ঘুরে আসতে হয়েছে। জ্বালানি। নষ্ট না করে সেই ক্ষতিটুকু পূরণ করার জন্যে এই নিউট্রন স্টারের বেশ কাছাকাছি যেতে হচ্ছে, যে ব্যাপারটি আমার ঠিক পছন্দ হচ্ছে না। এখান থেকে যে পরিমাণ বিকীরণ হচ্ছে সেটা ফোবিয়ান কতক্ষণ সহ্য করতে পারবে কে জানে। আমি নিয়ন্ত্রণ প্যানেলে নিউট্রন স্টারের অবস্থানটুকু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে একটা নিঃশ্বাস ফেললাম, এর আকর্ষণে মহাকাশযানটির গতিবেগ প্রতিমুহূর্তে বেড়ে যাচ্ছে। মহাকাশযানে একধরনের কম্পন অনুভব করা যাচ্ছে, যতই সময় যাচ্ছে সেটা ততই বেড়ে যাচ্ছে। এরকম সময়ে যদি কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে যায়, সেটা নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন হবে।
আমি নিয়ন্ত্রণ প্যানেল থেকে সরে এসে ব্যায়াম করার ঘরটিতে ঢুকে সেটা ঘুরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করলাম। দেখতে দেখতে ঘূর্ণি বেড়ে গেল আমি সাথে সাথে দেয়ালে এসে দাঁড়ালাম। কিছুক্ষণের মাঝেই আমার দেহের ওজন বেড়ে যেতে শুরু করে, আমি আবার আমার শরীরের সহ্য করার ক্ষমতা পরীক্ষা করে দেখতে শুরু করে দেই।
কিছুক্ষণের মাঝেই আমার শরীর সিসার মতো ভারী হয়ে আসে, আমার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়, আমার চোখের সামনে লাল পর্দা কাঁপতে থাকে, আমি কোনোমতে পা টেনে টেনে দৌড়াতে থাকি, আমি টের পাই আমার সমস্ত শরীর ঘামতে শুরু করেছে। যখন মনে হলো আমি লুটিয়ে মাটিতে পড়ে যাব ঠিক তখন আমার কানের কাছে ফোবির কথা শুনতে পেলাম, মহামান্য ইবান।
আমি হাঁপাতে হাঁপাতে কোনোভাবে বললাম, বল ফোবি।
আপনি আবার নিরাপত্তার সীমা অতিক্রম করছেন।
ইচ্ছে করেই করছি ফোবি।
আমি এখনো বুঝতে পারছি না কেন।
সময় হলেই বুঝবে। এখন আমার একটা কথা শোন।
