কী কথা?
তোমাদের যে অনুভূতি নেই সেটা আসলে সমস্যা নয়, সেটা হচ্ছে তোমাদের উপর আশীর্বাদ। এই ঝামেলা যাদের আছে তাদের জীবন একেবারে ফানা ফানা হয়ে যাচ্ছে।
হতে পারে। কিন্তু তবুও মানুষ নামের এই খল, ফন্দিবাজ, ধূর্ত, অসৎ বদমাইশ এবং ধুরন্ধর শত্রুকে বুঝতে হলে আমাদের এই অনুভূতির সাথে পরিচিত হতে হবে। সেই জন্যে আমরা অনেক দিন থেকে কাজ করছি, আমাদের বেশ খানিকটা সাফল্যও এসেছে।
টুকি ভয়ে ভয়ে মাথা বড় রবোটটির দিকে তাকিয়ে বলল, তার মানে তোমরা আজকাল রেগে যাও? দুঃখ আনন্দ এই সব পাও?
ইচ্ছা করলে পেতে পারি। আমরা সেটা আবিষ্কার করেছি। হার্ডওয়ার সফটওয়ার তৈরি হয়ে গেছে, এখন কপোট্রনে বসিয়ে দেওয়ার জন্যে ছোট চীপ তৈরি হচ্ছে।
কথা বলতে বলতে বুদ্ধিজীবী রবোটটা একটা বন্ধ ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। ঘরের উপরে লেখা দুঃখ ল্যাবরেটরি।
টুকি এবং ঝা একটু অবাক হয়ে বুদ্ধিজীবী রবোটটার দিকে তাকাতেই রবোর্টটা বলল, এই ল্যাবরেটরিতে আমরা রবোটদের দুঃখ দেওয়া নিয়ে গবেষণা করি।
ঝা মাথা নেড়ে বিড় বিড় করে বলল, মাথা খারাপ আর কাকে বলে। দুঃখ দেওয়ার গবেষণা!
টুকি জিজ্ঞেস করল, কতদূর হয়েছে গবেষণা?
আসুন, আপনাদের দেখাই।
রবোটটা কোথায় চেপে ধরতেই একটা স্বচ্ছ জানালা খুলে গেল এবং দেখা গেল ভিতরে ছোট একটা জানালার পাশে একটা শুকনো ধরনের রবোট বসে আছে। তার হাতে একটা বই। রবোটটি খুব মনোযোগ দিয়ে বইটি পড়ছে। বুদ্ধিজীবী রবোট বলল, এইটা খুব দুঃখের একটা বই। একটা রবোটের কপোট্রনের পাওয়ার সাপ্লাইয়ে কীভাবে ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেল সেই কাহিনী। লেখা আছে। এই বইটা পড়ে এই রবোটটা দুঃখ পায় কী না দেখা হচ্ছে।
বুদ্ধিজীবী রবোটের কথা শেষ হবার আগেই জানালার পাশে বসে থাকা শুকনো ধরনের রবোটটা হঠাৎ বই ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে মেঝেতে মাথা কুটে হাউ মাউ করে কাঁদতে আরম্ভ করল। টুকি এবং ঝা স্পষ্ট দেখতে পেল চোখ থেকে ঝরঝর করে পানি পড়ছে। বুদ্ধিজীবী রবোটটি খুব সন্তুষ্টির ভান করে বলল, সফল এক্সপেরিমেন্ট। চোখের পানিটা পরীক্ষা করে দেখতে হবে লোনা হয়েছে কী না!
টুকি এবং ঝা এবারে খানিকটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। কপোট্রনের পাওয়ার সাপ্লাইয়ে গোলমাল হলে কী এভাবে কান্নাকাটি করা উচিত? কে জানে। রহোটদের জীবনে এটাই হয়তো গভীর দুঃখের ব্যাপার। বুদ্ধিজীবী রবোট এবারে টুকি আর ঝাকে নিয়ে গেল পাশের ল্যাবরেটরিতে। তার উপর বড় বড় করে লেখা ক্রোধ ল্যাবরেটরি।
ঝা ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, এখানে কী রাগারাগি হয়?
হ্যাঁ। ক্রোধ অনুভূতিটি এর মাঝে বিশ্লেষণ করা হয়। কী কী কারণে রাগ হওয়া উচিত সেটা বের করে বিশাল একটা ডাটাবেস তৈরি করা হয়েছে। সেই সব কোন একটা ঘটনা ঘটে গেলেই রবোটেরা রেগে উঠে।
রেগে উঠে?
হ্যাঁ তখন কপোট্রনে উল্টোপাল্টা সিগনাল দেওয়া হয়। বিতিকিচ্ছি একটা ব্যাপার ঘটে। আপনাদেরকে দেখাই।
একটা সুইচ টিপে আগের মত একটা স্বচ্ছ জানালা খুলে দেওয়া হল। ভিতরে গাবদা গোবদা একটা রবোট টুলের উপর বসে আছে, তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে শুটকো মত একটা রবোট। বুদ্ধিজীবী রবোট বলল, যে রবোটটা বসে আছে তাকে এখন রাগিয়ে দেওয়া হবে।
কী ভাবে?
রবোটটি আরেকবার সুইচ টিপে দিয়ে বলল, দেখেই বুঝতে পারবেন।
টুকি এবং ঝা আবাক হয়ে দেখল শুটকো রবোটটি ঘরের এক কোণায় হেঁটে গিয়ে বিশাল একটা হাতুরী নিয়ে এসে বসে থাকা রবোটটার মাথায় গদাম করে মেরে বসল। মনে হলো সেই আঘাতে রবোর্টটার মাথা তার শরীরের ভিতর খানিকটা ঢুকে গেছে।
ঝা মাথা নেড়ে বলল, রাগানোর একেবারে এক নম্বর বুদ্ধি।
টুকি এবং ঝায়ের কোন সন্দেহই রইল না যে গাবদা গোবদা রবোর্টটা রেগে উঠছে। তার সবুজ চোখ দুটি আস্তে আস্তে টকটকে লাল হয়ে উঠল, কান থেকে ধোঁয়া বের হতে শুরু করল, শরীর থেকে ছোট ছোট বজ্রপাতের মত বিদ্যুৎপাত হতে শুরু করল। এক সময় হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে আঁ আঁ করে বিকট চিঙ্কার করতে করতে টুলটা তুলে নিয়ে শুটকো রবোটটাকে এলোপাথাড়িভাবে মারতে শুরু করল। টুলটা কিছুক্ষণের মাঝেই ভেঙ্গেচুরে টুকরো টুকরো হয়ে গেল তখন খালি হাতেই শুটকো রবোটটিকে চেপে ধরে কিল ঘুষি লাথি মারতে মারতে ঘরের এক কোণা থেকে অন্য কোথায় নিয়ে যায়, দেয়ালে চেপে ধরে পেটে ঘুষি মারতে থাকে, মাথা টেনে শরীর থেকে আলগা করে আনে, নিচে ফেলে উপরে লফিয়ে সমস্ত শরীরটাকে দলামোচা করে ফেলে। কিছুক্ষণেই শুকনো রবোটের শরীরের বিশেষ কিছু আর অবশিষ্ট থাকে না।
বুদ্ধিজীবী রবোট তার মস্ত মাথা নেড়ে বলল, নিখুঁত রাগ। একেবারে মানুষের খাঁটি রাগ।।
টুকি সাবধানে একটা নিঃশ্বাস ফেলে শুটকো রবোটটার ধ্বংসাবশেষের দিকে তাকিয়ে রইল।
টুকি এবং ঝা এভাবে আনন্দ ল্যাবরেটরি, ঘৃণা ল্যাবরেটরি, হিংসা ল্যাবরেটরি, ভালবাসা ল্যাবরেটরি দেখে শেষ পর্যন্ত একটা বড় ল্যাবরেটরির সামনে এসে দাঁড়াল। দরজার উপরে বড় করে লেখা কৌতুকবোধ ল্যাবরেটরি। বুদ্ধিজীবী রবোর্টটা ফোঁস করে একটা শব্দ করে বলল, আমাদের সমস্ত গবেষণা এইখানে এসে মার খেয়ে যাচ্ছে।
টুকি জিজ্ঞেস করল, কি ভাবে?
বছরের পর বছর আমরা গবেষণা করে যাচ্ছি কিন্তু কিছুতেই রবোটের মাঝে কৌতুকবোধ জাগাতে পারছি না। কোন জিনিসটা শুনে হাসতে হয় আমরা সেটা বুঝতে পারছি না। আমাদের মাঝে কোন সেন্স অফ হিউমার নেই।
