ঝা মেঝেতে বসে বড় একটা গলদা চিংড়ি চিবুতে চিবুতে বলল, তাতে সমস্যাটা কী? আমরা কী আর আত্মীয়তা করতে যাচ্ছি?
রোবি তার যন্ত্রপাতির দিকে ঝুকে পড়ে বলল, এ ছাড়াও আরো একটি সমস্যা আছে। হাইপার ডাইভ দেওয়ার পর মাঝে মাঝে সময় নিয়ে গোলমাল হয়।
টুকি তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে থেকে বলল, কী গোলমাল?
যেমন মনে করেন আজকে রওনা দিয়ে গতকাল পৌঁছে যাওয়া।
ঝা হা হা করে হেসে বলল, এটা গোলামাল হবে কেন? এটা তো ভাল, জীবনে খানিকটা সময় বাড়তি পেয়ে যাওয়া যাবে।
ঝা যত সহজে ব্যাপারটা মেনে নিল আসলেই এটা এত সহজে মেনে নেয়া উচিত কী না সেটা নিয়ে টুকির একটু সন্দেহ হয়। কিন্তু এখন সেটা নিয়ে তার আর মাথা ঘামানোর ইচ্ছে করছিল না। একটু অধৈর্য হয়ে বলল, রোবি, বকবক বন্ধ করে এখন তাহলে চল পৃথিবীর দিকে।
ব্যাপারটা যত সহজ হবে বলে ধারণা করা হয়েছিল সেটা যে এত সহজ নয়। সেটা টের পেল দুদিন পরেই। সবুজ রংয়ের মাঝারী একটা গ্রহের পাশে দিয়ে যাবার সময়, কথা নেই বার্তা নেই হঠাৎ করে একটা স্কাউটশীপ এসে টুকি, ঝা আর রোবিকে ধরে নিয়ে গেল।
যারা তাদের ধরে নিয়ে গেল তারা সবাই রবোট। যাদের কাছে ধরে নিয়ে গেল তারাও রবোট এবং তারা যাদের কাছে তাদের ধরে নিয়ে গেল তারাও রবোট। টুকি একজনকে জিজ্ঞেস করল, তোমাদের এখানে কোন মানুষ নেই?
যাকে জিজ্ঞেস করল সে কালচে রংয়ের বিদঘুটে একটি যন্ত্র, মুখ দিয়ে ফোৎ করে একটা শব্দ করে বলল, মানুষ? ছিঃ!
তাহলে আমাদের ধরে এনেছ কেন?
ধরে এনেছি? হাহ্।
এখানে কে আছে? কার সাথে কথা বলা যাবে?
কথা?
হুঁ!।
টুকি বুঝতে পারল এই নিম্নশ্রেনীর রবোটটির সাথে কথা বলার চেষ্টা করে কোন লাভ নেই। বিভিন্ন রবোটের মাঝে হাত বদল হয়ে যখন শেষ পর্যন্ত তারা মোটামুটি নেতা গোছের একটা চালাক চতুর রবোটের সামনে হাজির হল তখন টুকি জিজ্ঞেস করল, তোমরা আমাদের ধরে এনেছ কেন? রবোটটি তার সবুজ চোখ দুটিকে হালকা লাল রংয়ে পাল্টে দিয়ে বলল, তোমাদের কাপাট্রনের কন্ট্রোলার আই.সি.টা দরকার।
টুকি ভুরু কুচকে বলল, কী বললে? কন্ট্রোলার আই. সি.?
হ্যাঁ! তোমাদের মত রেপ্লিকা রবোট আমাদের খুব কম। যদি কপোট্রন থেকে–
ঝ চোখ কপালে তুলে বলল, রেপ্লিকা রবোট? আমরা মোটেও রেপ্লিকা রবোট না।
তাই নাকি? তোমরা কি তাহলে ড়ুপ্লিকা?
না আমরা রেপ্লিকা ড়ুপ্লিকা কোনটাই না। আমরা মানুষ।
মানুষ! রবোটটা একটা আর্ত চিৎকার করে দুই পা পিছিয়ে গেল। ক্লিক ক্লিক করে কয়েটা শব্দ হল, চারপাশে ঘিরে থাকা রবোটেরা হাতে অস্ত্র ধরে তাদের দিকে তাক করে ধরল। গবেট ধরনের একটা রবোট জিজ্ঞেস করল, গুলি করে দেব নাকি?
নেতা গোছের রবোর্টটা বলল, আগেই করো না, তবে গুলির রেঞ্জের মাঝে রাখ।
বেঁটে খাটো একটা রবোট ভাঙা গলায় বলল, সর্বনাশ! মোটা মানুষটা আমার দিকে তাকাচ্ছে। বিপদ হবে না তো আমার?
হতে পারে। চোখে চোখে তাকিও না। তোমার সর্বনাশ করে দেবে। ওদের সব বদমাইশী চোখের মাঝে।
টুকি এবং ঝা মোটামুটি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে কোনমতে নিজেদেরকে সামলে নিয়ে বলল, তোমরা আমাদের এত ভয় পাচ্ছ কেন?
ভয় পাব না? কী বল তুমি? মানুষ হচ্ছে এই সৃষ্টি জগতের সবচেয়ে খল, ফন্দিবাজ, ধূর্ত, অসৎ, বদমাইশ এবং ধুরন্ধর। তারা ইচ্ছা করলে দিনকে রাত করে দিতে পারে রাতকে দিন করে দিতে পারে। গ্রহকে নক্ষত্র করে দিতে পারে নক্ষত্রকে গ্রহ করে দিতে পারে। মানুষের অসাধ্য কিছু নেই। আমরা রবোটরা মানুষ থেকে দশ লাইট ইয়ার দূরে থাকি।
আমাদেরকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ঝা একটু হাসার চেষ্টা করে বলল, আমরা অত্যন্ত সাধারণ মানুষ।
সাধারণ মানুষ বলে কোন কথা নেই। আগুন যেরকম ঠাণ্ডা হয় না মানুষ সেরকম সাধারণ হয় না। মানুষ মানেই অসাধারণ
না। ঝা জোরে জোরে মাথা নাড়ল, মানুষের মাঝে দুষ্টু মানুষ আছে কিন্তু আমরা সেরকম মানুষ নই। আমরা কারো ক্ষতি করি না।
রবোটদের নেতাটি উঁচু গলায় অন্য রববাটদের বলল, বলেছিলাম না, মানুষেরা খুব যুক্তি দিয়ে অযৌক্তিক কথা বলে? এই দেখ। খবরদার কেউ এদের সাথে কথা বলো না।
টুকি একটু এগিয়ে এসে বলল, আমরা মোটেও অযৌক্তিক কোন কথা বলছি না। কিন্তু যদি তোমরা আমাদের সাথে কথা বলতে না চাও তাহলে আমাদের যেতে দাও। আমরা যাই।
গবেট ধরনের রবোটটা আবার বলল, গুলি করে দেব না কী?
না। আগেই করো না, গুলি করলে মরে যাবে। মানুষের মত অপদার্থ প্রাণী খুব কম রয়েছে ছোট একটা গুলি খেলেই মরে যায়।
মরে গেলে আবার সার্ভিসিং করে নেব।
মানুষ মরে গেলে সার্ভিসিং করা যায় না।
কোন কোম্পানি এদের তৈরি করে? কত দিনের ওয়ারেন্টি দেয়?
কোন কোম্পানি এদেরকে তৈরি করে না। এদের কোন ওয়ারেন্টি নেই।
গবেট ধরনের রবোটটা বলল, তাহলে গুলি করে দেই।
না। নেতা গোছের রবোটটা বলল, এদেরকে না মেরে সাবধানে এদের মস্তিষ্ক কেটে আলাদা করে নিতে হবে। তখন আর কোন ভয় থাকবে না, কিন্তু সব রকম বুদ্ধি নেওয়া যাবে। তখন এরা আমাদের সাহায্য করবে।
উপস্থিত সবগুলো রবোট মাথা নেড়ে বলল, চমৎকার বুদ্ধি! চমকার বুদ্ধি!!
টুকি এবং ঝা শুকনো গলায় বলল, তোমরা কী বলছ এই সব? মস্তিষ্ক কেটে নেবে মানে?
আমাদের অস্ত্রোপচারকারী রবোট আছে, নিখুঁতভাবে মস্তিষ্ক কেটে নিতে পারে।
নিলেই হল? তোমার ধারণা আমার মাস্তিষ্ক কেটে নিলে আমি কোনদিন তোমাদের সাহায্য করব?
