তোমার দুঃখিত হওয়ার কিছু নেই, কাটুস্কা। আমি জানি কী হয়েছে?
নিহন দেখতে পায় স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিয়ে নিরাপত্তাকর্মীরা তাদের ঘিরে ফেলছে। নিহন শান্ত চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে এক হাতে শক্ত করে কাটুঙ্কাকে ধরে রেখেছে অন্য হাতে ধারালো একটা চাকু। থরথর করে কাঁপছে কাটুস্কা। মেয়েটি আকুল হয়ে কাঁদছে। কেন কাঁদছে নিহন জানে না। কিন্তু তাতে কিছু আসে যায় না, সে মেয়েটিকে এদের হাত থেকে রক্ষা করবে।
১১. সমাজ দপ্তরের প্রধান
সমাজ দপ্তরের প্রধান একটু অবাক হয়ে তার যোগযোগ মডিউলের দিকে তাকিয়ে রইল, সেখানে একটা অবিশ্বাস্য তথ্য, কোয়াকম্প তার সঙ্গে কথা বলতে চাইছে! এর আগে কখনোই কোয়াকম্প সরাসরি কোনো মানুষের সাথে যোগাযোগ করে নি। সমাজ দপ্তরের প্রধান একটুখানি অবাক এবং অনেকখানি আতঙ্কিত হয়ে যোগাযোগ মডিউলটা স্পর্শ করে, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কোয়াকস্পের ক্রুদ্ধ কণ্ঠস্বর শুনতে পায়, তুমি এটা কী করেছ?
কী হয়েছে?
নগরকেন্দ্রে জলমানবকে নিয়ে অনুষ্ঠানটির কথা বলছি। এটি নৃতন প্রজন্মের উদ্দেশে একটি অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। জলমানবকে একটি অসভ্য বন্য প্রজাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার কথা ছিল। হাঙর মাছের হাতে তার মৃত্যুদৃশ্যটি নূতন প্রজন্মের উপভোগ করার কথা ছিল।
সমাজ দপ্তরের প্রধান একটু অধৈর্য গলায় বলল, আমরা তার ব্যবস্থা করেছিলাম। বিষয়টা নিশ্চিত করার জন্য একটির জায়গায় দুটি হাঙর মাছ দিয়েছিলাম। জলমানবকে দেখে যেন সবার ভেতরে এক ধরনের ঘৃণা হয় সেজন্য তাকে কুৎসিত একটা মুখোশ পরিয়েছিলাম। আমরা বুঝতে পারি নি সে নিজের মুখোশ খুলে ফেলবে। বুঝতে পারি নি। জলমানবটি দুই-দুইটা হাঙর মাছকে হত্যা করে বের হয়ে আসবে।।
কোয়াকম্প ভাবলেশহীন গলায় বলল, জলমানবের হাতে একটা ধারালো চাকু দেওয়ার সিদ্ধান্তটি একটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।
একেবারে খালি হাতে দুটি ক্ষুধার্ত হাঙর মাছের মাঝখানে ফেলে দেওয়াটা অমানবিক বলে মনে হয়েছিল। বিষয়টা আরো নাটকীয় করার জন্য তাকে ছোট একটা চাকু দেওয়া হয়েছিল। আমরা বিষয়টি তোমার সঙ্গে আলোচনা করে নিয়েছিলাম, তুমি অনুমতি দিয়েছিলে।
হ্যাঁ। তখন অনুমতি দিয়েছিলাম, কিন্তু অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে সিদ্ধান্তটা সঠিক ছিল।
সমাজ দপ্তরের প্রধান চমকে উঠে বলল, তুমি এর আগে কখনো ভুল সিদ্ধান্ত নাও নি। এই প্রথম তুমি একটা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছ, কোয়াকম্প।
কোয়াকম্প দীর্ঘসময় চুপ করে থেকে বলল, ভুলগুলো সংশোধনের সময় এসেছে। কথা ছিল এই ঘটনা দেখে জলমানবের জন্য এক ধরনের ঘৃণার জন্ম নেবে। হাঙর মাছের হাতে তার এক ধরনের নিষ্ঠুর মৃত্যু হলে সকল দর্শকের মাঝে জলমানবের জন্য ঘৃণা জন্ম নিত। উল্টো জলমানবটি সবার সামনে একজন সাহসী বীর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সবার সমবেদনা এবং ভালবাসা ছিল এই জলমানবের জন্য। এটি খুব বড় ভুল হয়েছে।
আমাদের কিছু করার ছিল না।
কোয়াকম্প বলল, কাটুস্কা নামের মেয়েটি পুরো বিষয়টাকে অনেক জটিল করে দিয়েছে। তাকে কিছুতেই মঞ্চে আসতে দেওয়া উচিত হয় নি। কিছুতেই জলমানবের কাছে পৌঁছাতে দেওয়া উচিত হয় নি।
নিরাপত্তাকর্মীরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সে বাধা উপেক্ষা করে মঞ্চে উঠে গেছে।
কোয়াকম্প শুষ্ক গলায় বলল, পুরো বিষয়টাকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার এখন একটি মাত্র উপায়।
কী উপায়?
জলমানবকে দিয়ে কাটুস্কাকে খুন করানো
সমাজ দপ্তরের প্রধান চমকে উঠে বলল, কাটুস্কা প্রতিরক্ষা দপ্তরের প্রধান রিওনের মেয়ে। রিওন তার মেয়েকে অসম্ভব ভালবাসে।
তাতে কিছু আসে যায় না। আমি ভালবাসা বুঝি না। আমি তোমাদের ভবিষ্যৎ বুঝি। আমার ওপর দায়িত্ব তোমাদের সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। তা ছাড়া
তা ছাড়া কী?
প্রতিরক্ষা দপ্তরের প্রধানের মধ্যে আমি এক ধরনের দুর্বলতা লক্ষ করছি। এই দুর্বলতা থাকলে সে প্রতিরক্ষা দপ্তরের প্রধান হতে পারবে না। তাকে আরো শক্ত হতে হবে। সে এই ঘটনায় শক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে।
সমাজ দপ্তরের প্রধান চুপ করে রইল, হঠাৎ করে সে অসহায় বোধ করতে থাকে। ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল, আমরা কেমন করে জলমানবকে দিয়ে কাটুঙ্কাকে খুন করার? জলমানব কাটুস্কাকে নিরাপত্তাকর্মীদের হাত থেকে রক্ষা করছে। কাটুস্কার জন্য তার এক ধরনের মায়া রয়েছে।
তোমরা সেটা আমার ওপর ছেড়ে দাও। জলমানবের বুদ্ধিবৃত্তি অত্যন্ত নিম্নশ্রেণীর। সঠিক কম্পনের ইলেকট্রোম্যাগনেটিক রেজোনেন্স তৈরি করে দিতে পারলেই সে খুনি হয়ে যাবে। তখন সামনে যাকেই পাবে তাকেই খুন করবে।
ও। সমাজ দপ্তরের প্রধান মৃদুস্বরে বলল, ঠিক আছে। বুঝতে পারছি।
তুমি শুধু কাটুস্কা আর জলমানবকে একঘরে বন্ধ কর। ঘরটির যেন ধাতব দেয়াল হয়।
ঠিক আছে।
কোয়াকম্প বলল, আর শোনো।
কী?
তোমার সঙ্গে আমার এই কথোপকথনটি কারো জানার প্রয়োজন নেই।
কিন্তু
এর মধ্যে কোনো কিন্তু নেই।
সমাজ দপ্তরের প্রধান একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে গেল। ঠিক কী কারণ জানা নেই। হঠাৎ করে সে নিজের ভেতরে ভয়ের একটা কাপুনি অনুভব করে।
.
ছোট একটা ঘরের ঠিক মাঝখানে একটা গোলটেবিল এবং সেই টেবিলের দুই পাশে দুটি চেয়ার টেবিলে কিছু শুকনো খাবার এবং একটা পানীয়ের বোতল। একটি চেয়ারে কাটুস্কা বসে আছে। নিহন তার পাশে ঘরের মোটামুটি ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। কাটুস্কা ঘরের চারদিকে একবার তাকিয়ে বলল, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না এখানে কী হচ্ছে?
