সবাই রুদ্ধ নিঃশ্বাসে দেখতে পেল মূর্তিটি পানির নিচে ঘুরে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে, এক হাত দিয়ে পায়ে বেঁধে রাখা একটা ছোরা হাতে নিয়ে অন্য হাতে নিজের মুখোশটা খুলে ফেলেছে, কাটুস্কা তখন মূর্তিটি চিনতে পারল, সে যা ভেবেছিল তা-ই! মানুষটি নিহন।
কাটুস্কা চিৎকার করে উঠে দাঁড়ায়, না। না। না।
নগরকেন্দ্রে পিনপতন স্তব্ধতা, তার মধ্যে কাটুস্কার চিৎকার শুনে সবাই অবাক হয়ে তার দিকে ঘুরে তাকাল। সবাই দেখল একজন তরুণী না, না, না- বলে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছে, তারপর শত শত দর্শকের ভেতর দিয়ে স্টেজের দিকে ছুটে যাচ্ছে।
অ্যাকুরিয়ামের ভেতরে নিহন তার কিছু জানে না। সে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে হাঙর মাই দুটির দিকে। সে জানে হাঙর মাছ দুটি তার উপস্থিতির কথা টের পেয়েছে, তার শরীর থেকে তৈরি হওয়া অতি সূক্ষ্ম বৈদ্যুতিক সিগন্যালকে লক্ষ করে এখন হাঙর মাছ দুটি ছুটে আসবে। সমুদ্রের সবচেয়ে দ্রুতগামী প্রাণী, এর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সহজ নয়।
নিহন সাবধানে পিছিয়ে আসে, অ্যাকুরিয়ামের শক্ত প্লেক্সিগ্নাসের দেয়ালের সঙ্গে নিজের শরীরটা লাগিয়ে সে অপেক্ষা করে। পেছনে প্লেক্সিগ্লাসের দেয়াল, হাঙর মাছ ছুটে এসে তাকে আক্রমণ করতে পারবে না, দেয়ালে ধাক্কা খাওয়ার ঝুঁকি নেবে না হাঙর মাছ। চেষ্টা করবে ওপর থেকে নিচে তাকে টেনে নিতে। অত্যন্ত দ্রুত তাকে সরে যেতে হবে, এক মুহূর্ত সময় পাবে হাঙরের বুকে ধারালো চাকুটা বসিয়ে দেওয়ার, ঠিক জায়গায় বসাতে পারলে মুহূর্তে তার পুরো তলদেশ দুই ভাগ হয়ে যাবে।
সামনে ভেসে থাকা হাঙর মাছটি আক্রমণ করল। উপস্থিত দর্শকেরা হতবিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তীব্র গতিতে একটি হাঙর মাছ ছুটে আসছে-একটা হটোপুটি এবং হঠাৎ করে একটা রক্তের ধারা। পানিটুকু লাল হয়ে গেছে, সবাই নিশ্চিত হয়ে ছিল যে মূর্তিটির শরীরের একটা অংশ খাবলে নিয়ে গেছে এই হাঙর মাছ। কিন্তু তারা অবাক হয়ে দেখল, মূর্তিটি অক্ষত হয়ে ভেসে আছে, হাঙর মাছটির বুক থেকে নিচের পুরো অংশটুকু দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। রক্তের একটি ধারা ছড়াতে ছড়াতে হাঙর মাছটি নিচে নেমে যাচ্ছে।
উপস্থিত শত শত ছেলেমেয়ের বুকের ভেতর আটকে থাকা নিঃশ্বাসটি বের হয়ে আসে। নিজের অজান্তেই তারা আনন্দধ্বনি করে ওঠে। এক ধরনের বিস্ময় নিয়ে তারা সামনে তাকিয়ে থাকে। বিশাল অ্যাকুরিয়ামে একজন তরুণ পানির নিচে নিঃশ্বাস না নিয়ে দীর্ঘ সময় ডুবে আছে, সেটিও তারা ভুলে যায়। নিজের অজান্তেই তাদের মনে হতে থাকে এই বিস্ময়কর তরুণটির অসাধ্য কিছু নেই।
কাটুস্কা চিৎকার করতে করতে স্টেজের দিকে ছুটে যেতে থাকে, কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মী তাকে থামানোর চেষ্টা করল, কিন্তু কাটুস্কা একটা ঝটকা দিয়ে নিজেকে মুক্ত করে সে স্টেজের দিকে ছুটে যেতে থাকে। সবাই সবিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে, দেখে, পানির নিচে ডুবে থাকা বিচিত্র মানুষটি আবার প্লেক্সিগ্লাসের দেয়ালে পিঠ লাগিয়ে দ্বিতীয় হাঙর মাছটির জন্য অপেক্ষা করছে। একটু আগে যে মূর্তিটির উদ্দেশে সবাই চিৎকার করে বলেছে হত্যা কর, হত্যা কর, হত্যা কর হঠাৎ করে সবার ভালবাসা সেই মানুষটির জন্য। সবাই রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে আছে, অপেক্ষা করছে এই বিস্ময়কর তরুণটি কখন দ্বিতীয় হাঙর মাছটিকেও তার বুক থেকে নিচ পর্যন্ত চিরে ফেলবে।
হাঙর মাছটি তার লেজ ঝাপটা দিয়ে ঘুরে যায়, তারপর তীব্র গতিতে ছুটে আসতে থাকে নিহনের দিকে। একটা হুটোপুটি হয়, কে কী করছে বোঝা যায় না। হাঙর মাছটি ঘুরে যায়, যেখানে মানুষটি ছিল সেখানে সে নেই। সবাই অবাক বিস্ময়ে দেখে হাঙরের পিঠে সে চেপে বসেছে হাতের ধারালো চাকু দিয়ে মাছটির মাথায় আঘাত করছে। রক্তের একটা ক্ষীণ ধারা বইছে-আর ছটফট করতে করতে হাঙর মাছটি অ্যাকুরিয়ামের তলদেশে ডুবে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
নিহন এবার হাঙর মাছটিকে ছেড়ে পানির ওপর ভেসে ওঠে। বুক ভরে একবার নিঃশ্বাস নেয়। হলঘরে হাজার হাজার ছেলেমেয়ে চিৎকার করছে, তার মাঝে সে অবাক হয়ে দেখল একজন তরুণী অ্যাকুরিয়ামের ওপর উঠে এসেছে। নিহন তরুণীটিকে চিনতে পারে, তরুণীটি কাটুস্কা। এই তরুণীটি তাকে মুক্ত করে দিতে চেয়েছিল।
নিহন অবাক হয়ে দেখে, মেয়েটি হিস্টিরিয়াগ্রস্তের মতো চিৎকার করতে করতে নিহনকে জাপটে ধরে তাকে টেনে উপরে তুলতে চেষ্টা করছে। কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে, কিন্তু মানুষের চিৎকারে সে কী বলছে, শোনা যাচ্ছে না। কাটুস্কাকে ঘিরে অনেক নিরাপত্তাকর্মী, তাকে টেনে সরানোর চেষ্টা করছে, পারছে না।
নিহন পানি থেকে বের হয়ে আসে, এক হাতে কাটুঙ্কাকে জাপটে ধরে নিজের কাছে টেনে আনে। অন্য হাতে ধারালো চাকুটা ধরে রেখে সে শান্ত গলায় নিরাপত্তাকর্মীদের বলল, সবাই সরে যাও।
নিরাপত্তাকর্মীরা কাটুস্কাকে ছেড়ে দিয়ে সাথে সাথে সরে গেল। চোখের কোনা দিয়ে সবাইকে লক্ষ করতে করতে নিহন কাটুস্কার দিকে তাকাল, নরম গলায় বলল, ভালো আছ, কাটুঙ্কা।
কাটুস্কা হঠাৎ ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে। নিহনকে আঁকড়ে ধরে বলে, আমি বুঝি নি, তোমাকে এভাবে এখানে আনবে। আমি বুঝি নি। আমি দুঃখিত, নিহন। আমি খুব দুঃখিত।
