নিহন জিজ্ঞেস করল, কেন, কী হয়েছে?
আমি প্রতিরক্ষা দপ্তরের প্রধানের মেয়ে। আমাকে এভাবে ছোট একটা ঘরে আটকে রাখার কথা না। আমাকে নেওয়ার জন্য এখন প্রতিরক্ষা দপ্তর থেকে বড় বড় মানুষের চলে আসার কথা।
নিহন কোনো কথা বলল না। কাটুস্কা বলল, আমি তোমাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য হেলিকপ্টার আনিয়েছিলাম, কিন্তু হেলিকপ্টার কেন তোমাকে ছেড়ে দেয় নি, কেন এখানে নিয়ে এসেছে–আমি সেটাও বুঝতে পারছি না।
নিহন এবারো কোনো কথা বলল না। কাটুস্কা পকেট থেকে তার যোগাযোগ মডিউলটা বের করে বলল, আর কী আশ্চর্য, দেখ আমার যোগাযোগ মডিউলটা দিয়ে আমি আমার বাবার সাথে কিছুতেই যোগাযোগ করতে পারছি না।
নিহন কিছুক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থেকে বলল, আমি তোমাদের সমাজকে বুঝতে পারি। তোমাদের সমাজটা অন্য রকম।
কী রকম?
সে আমার ধারণা ছিল তোমরা হয়তো স্বার্থপরের মতো আমাদের সমুদ্রের পানিতে ঠেলে দিয়েছ, কিন্তু তোমরা হয়তো নিজেদের সর্বনাশ করবে না।
আমরা নিজেদের সর্বনাশ করছি?
হ্যাঁ।
এ কথা কেন বলছ?
তোমার বয়সী একটা মেয়ে কেন টিকিট কিনে হাঙর মাছ দিয়ে একটা মানুষকে খেয়ে ফেলার দৃশ্য দেখতে আসে? এটা কী রকম সমাজ? তোমরা কী রকম মানুষ?
কাটুস্কা কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেল। নিহন জিজ্ঞেস করল, কী হল? থেমে গেলে কেন? বল।
না, বলব না। বলে লাভ নেই। আমাদের যুক্তিগুলো তুমি বুঝবে না।
নিহন মাথা নাড়ল, আমি বুঝতে চাই না। আমাদের অনেক কষ্ট, কিন্তু তোমাদের এই জীবনের জন্য আমি কখনো আমার কষ্ট ছেড়ে আসব না।
কাটুস্কা স্থির দৃষ্টিতে নিহনের দিকে তাকিয়ে বলল, কেন? এ কথা কেন বলছ?
তোমাদের ল্যাবরেটরিতে আমাকে হাজার হাজার যন্ত্রপাতি দিয়ে পরীক্ষা করেছে। কত চমৎকার যন্ত্রপাতি, যেটা আমরা জীবনে দেখি নি, শুধু ছবি দেখেছি। কিন্তু অবাক ব্যাপার কী জান?
কী?
তোমাদের কোনো মানুষ সেই যন্ত্রপাতি কীভাবে কাজ করে সেটা জানে না। তোমাদের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে কোয়াকম্প, একটা কোয়ান্টাম কম্পিউটার! সে তোমাদের আদেশ দেয় তোমরা তার আদেশে ওঠ, তার আদেশে বস।
কাটুস্কা হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে নিজের ঠোঁটের আঙুল দিয়ে বলল, শ-স-স-স।
নিহন অবাক হয়ে বলল, কী হয়েছে?
কোয়াকম্প নিয়ে এখানে কোনো কথা বোলা না।
নিহন অবাক হয়ে বলল, কেন?
মানুষের বুদ্ধিমত্তা মস্তিষ্কের ভেতরে যে রকম থাকতে পারে, বাইরেও থাকতে পারে। কোয়াকম্প সে রকম আমাদের সবার মস্তিষ্কের বাইরের বুদ্ধিমত্তা। আমাদের সবার অস্তিত্ব-
হঠাৎ করে ঘরের ভেতর একটা ভোঁতা শব্দ হল, তার সঙ্গে এক ধরনের সূকম্পন। নিহন অবাক হয়ে বলল, কিসের শব্দ?
কাটুস্কা ওপরের দিকে তাকাল, তারপর ফিসফিস করে বলল, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক রেজোনেন্স।
কী হয় এই রেজোনেন্স দিয়ে?
মস্তিষ্কে স্টিমুলেশন দেওয়া হয়। অনুভূতির পরিবর্তন করা হয়।
নিহন অবাক হয়ে বলল, এখন কেউ আমাদের অনুভূতি পাল্টে দেবে?
কাটুস্কা ভয়ে ভয়ে উঠে দাঁড়াল, বলল, হ্যাঁ। মনে হয় আমাদের অনুভূতি পাল্টে দেবে।
নিহন হঠাৎ নিজের ভেতরে গভীর এক ধরনের বিষাদ অনুভব করে। তার মনে হতে থাকে এই জীবন অর্থহীন। বুকের ভেতর সে চাপা একটি হাহাকার অনুভব করে। ঘরের ভেতর তোতা শব্দটি হঠাৎ একটু তীক্ষ্ণ হয়ে যায়। নিহন তার মস্তিষ্কের ভেতর এক ধরনের যন্ত্রণা অনুভব করে, ভোঁতা যন্ত্রণায় মাথার ভেতর দপদপ করতে থাকে এবং যন্ত্রণার সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভেতর বিচিত্র একটা ক্রোধ দানা বাঁধতে থাকে। নিহন ফিসফিস করে নিজেকে বলল, আমাকে ওরা রাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। আমার কিছুতেই রেগে ওঠা চলবে না। কিছুতেই না।
তারপরও সে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠতে থাকে। কাটুঙ্কার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার ভেতর ভয়ঙ্কর একটি ক্রোধ বিস্ফোরণের মতো ফেটে পড়ে। এই মেয়েটি আমাকে খুন করার চেষ্টা করেছিল। নিহন দাঁতে দাঁত ঘষে নিজেকে বলে, এই মেয়েটি আমাকে ধরিয়ে এনেছে। এই মেয়েটির জন্য আমাকে ভয়ঙ্কর দুটি হাঙর মাছের মুখে পড়তে হয়েছিল। আমার এই হতভাগিনী মেয়েটিকে খুন করে ফেলা উচিত। ধারালো চাকু দিয়ে ফালা ফালা করে ফেলা উচিত।
নিহন অনেক কষ্টে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে, কিন্তু নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এক ধরনের অমানবিক ক্রোধ তার ভেতর পাক খেয়ে উঠতে থাকে। নিজের অজান্তেই সে তার পায়ে বেঁধে রাখা চাকুটা হাতে তুলে নেয়। ধারালো চাকুটা দিয়ে কাটুস্কাকে ফালা ফালা। করার এক ধরনের অমানবিক ইচ্ছা তাকে অস্থির করে তোলে।
তুমি কাটুস্কার চিৎকার শুনে নিহন তার চোখের দিকে তাকাল।
কাটুস্কা হাত তুলে নিহনের দিকে দেখিয়ে চিৎকার করে বলে, তুমি এই সর্বনাশের শুরু করেছ। তোমার জন্য আজ আমার এই অবস্থা! তোমাকে আমি খুন করে ফেলব!
নিহন পরিষ্কারভাবে কিছু চিন্তা করতে পারছিল না। ভয়ঙ্কর ক্রোধের ভেতর সে আবছাভাবে বুঝতে পারে ঠিক তার মতোই এই মেয়েটির মাথায় ভয়ঙ্কর ক্রোধ এসে তর করেছে। ঠিক তার মতোই এই ক্রোধ পুরোপুরি অযৌক্তিকভাবে তার সমস্ত চেতনাকে আচ্ছন্ন করে দিচ্ছে।
কাটুস্কা চিৎকার করে বলল, তুমি একটি হিংস্র জলমানব। তুমি কেন এসেছ আমাদের কাছে? কেন? যাও। তুমি যাও। তুমি চলে যাও এখান থেকে। তুমি জাহান্নামে যাও। আমার চোখের সামনে থেকে সরে যাও।
