ক্রানা বুকের মধ্যে আটকে থাকা নিঃশ্বাসটা বের করে দিয়ে বলল, আমি আর অপেক্ষা করতে পারছি না। কখন শুরু হবে কনসার্ট?
কিছুক্ষণের মাঝেই কনসার্টটা শুরু হয়ে গেল। অ্যাকুরিয়ামটা ঘিরে গায়কেরা মাথা কঁকিয়ে গান গাইতে শুরু করে। তাদের শরীরে লাগানো নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্র শরীরের তালের সঙ্গে সঙ্গে বিচিত্র সঙ্গীতের ধ্বনি তৈরি করতে শুরু করেছে। বাতাসে মিষ্টি এক ধরনের গন্ধ, নিশ্চিতভাবেই সেখানে স্নায়ু উত্তেজক এক ধরনের গ্যাস ছাড়া হচ্ছে, যারা উপস্থিত তারা ধীরে ধীরে উত্তেজিত হয়ে উঠতে থাকে। সঙ্গীতের তালে তালে তাদের দেহ নড়তে থাকে, মাথা দুলতে থাকে। তারা একজন আরেকজনকে জাপটে ধরে নাচতে থাকে, চিৎকার করতে থাকে। তারুণ্যের উদ্দাম আনন্দ যেন সব বাধা ভেঙে ফেলবে! এভাবে কতক্ষণ চলেছে কেউ জানে না হঠাৎ করে সকল সঙ্গীত বন্ধ হয়ে যায়। নগরকেন্দ্রের ভেতর কোথাও এতটুকু শব্দ নেই।
সবাই অবাক হয়ে দেখল মঞ্চের ঠিক মাঝখানে স্বল্পবসনা একটি মেয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। মাথা ঝাঁকিয়ে সবাইকে অভ্যর্থনা জানিয়ে সে চিৎকার করে বলল, এখন তোমাদের সামনে আসছে এ সময়ের সবচেয়ে উত্তেজনাময় মুহূর্ত।
সবাই আনন্দে চিৎকার করে ওঠে। মেয়েটি দুই হাত তুলে সবাইকে থামার জন্য ইঙ্গিত করে বলল, স্টেজে এই বিশাল অ্যাকুরিয়ামে রয়েছে দুটি ক্ষুধার্ত হাঙর। গত এক সপ্তাহ তাদের অভুক্ত রাখা হয়েছে। এই অভুক্ত হাঙর দুটির মতো হিংস্র প্রাণী এখন পৃথিবীতে আর কিছু নেই। তাদের সামনে এখন কোন জীবন্ত প্রাণী এলে এক মুহূর্তে তাকে ছিন্নভিন্ন করে দেবে এই ক্ষুধার্ত, ক্রুদ্ধ এবং হিংস্র হাঙর মাছ। তোমরা কেউ কি এই দুটি হাঙর মাছের মুখোমুখি হতে চাও?
নগরকেন্দ্রের হাজার হাজার ছেলেমেয়ে চিৎকার করে বলল, না?
আমি জানি তোমরা এই ক্রুদ্ধ, ক্ষুধার্ত এবং হিংস্র হাঙর মাছের সামনে যেতে চাও না। মেয়েটি চিৎকার করে বলল, কিন্তু এই হিংস্র হাঙর মাছের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে একটি জলজ প্রাণী। বিস্ময়কর এক জলপ্রাণী দেখতে অনেকটা মানুষের মতো কিন্তু সেটি মানুষ নয়। এই হাঙর মাছের মতোই হিংস্র এই জলজ প্রাণী মানুষের মতো দেখতে এই নির্বোধ, বীভৎস হিংস্র প্রাণীটি কি হাঙর মাছের সামনে টিকে থাকতে পারবে? দুটি হাঙর মাছ কতক্ষণে তাকে ছিঁড়েখুঁড়ে খাবে? তোমাদের ভেতরে কার সাহস আছে সেই দৃশ্য দেখার?
শত শত ছেলেমেয়ে চিৎকার করে বলল, আমার! আমার সাহস আছে। আমার।
এস। সবাইকে আমন্ত্রণ জানাই এই ভয়ঙ্কর খেলায়। দেখ, উপভোগ কর! যাদের স্নায় দুর্বল তারা চোখ বন্ধ করে রেখ। তা না হলে এই ভয়ঙ্কর দৃশ্য তোমাদের দিনের পর দিন, রাতের পর রাত তাড়া করে বেড়াবে! ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন দেখে তোমরা জেগে উঠবে প্রতি রাতে। তাই সাবধান!
বিকট এক ধরনের যন্ত্রসঙ্গীত বাজতে থাকে, মঞ্চ অন্ধকার হয়ে আসে, শুধু দেখা যায় বিশাল অ্যাকুরিয়ামে ভয়ঙ্করদর্শন দুটি হাঙর মাছ ঘুরে বেড়াচ্ছে। মঞ্চের এক কোনায় একটা স্পটলাইট এসে পড়ল এবং সবাই দেখল সেখানে বিচিত্র একটি মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। মূর্তিটির শরীরটুকু ছোপ ছোপ রঙিন, মুখে ভয়ঙ্করদর্শন একটি মুখোশ, সেই মুখোশে কৃর এক ধরনের দৃষ্টি। মূর্তিটির দুই হাত শেকল দিয়ে বাধা, সুগঠিত পেশিবহুল শরীর। কোমর থেকে ছোট এক টুকরো কাপড় ঝুলছে, এ ছাড়া শরীরে কোনো পোশাক নেই।
মূর্তিটি দেখে কাটুস্কা চমকে ওঠে। কয়দিন আগে তার সঙ্গে দেখা হওয়া জলমানবটির কথা তার মনে পড়ে যায়। তার শরীরও ছিল পেশিবহুল সুগঠিত, সে ছিল অসম্ভব সুদর্শন। এর মুখটি মুখোশ দিয়ে ঢাকা, এই মুখোশের আড়ালে যে মুখটি লুকিয়ে আছে সেটি কি নিহন নামের সেই তরুণটির? কিন্তু সেটা তো হতে পারে না। তার বাবার সঙ্গে কথা বলে কাটুস্কা তো নিহন নামের সেই সুদর্শন জলমানবটিকে হেলিকপ্টারে করে তার এলাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিল। এটি নিশ্চয়ই অন্য কোনো প্রাণী। অন্য কোনো জলমানব।
নগরকেন্দ্রের শত শত ছেলেমেয়ে চিৎকার করতে থাকে, হত্যা কর। হত্যা কর। হত্যা কর
কাটুস্কা অবাক হয়ে দেখে, মনে হয় নগরকেন্দ্রের সবাই বুঝি উন্মাদ হয়ে গেছে। হাত নেড়ে তারা উন্মত্তের মতো চিৎকার করছে, হত্যা কর। হত্যা কর। হত্যা কর
দুই পাশ থেকে দুজন মানুষ এসে মুখোশ পরা মূর্তিটিকে ধরে তার হাতের শেকলটা খুলে দেয়, তারপর তাকে ঠেলে ছোট একটা খাঁচার ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়। খাঁচাটাকে একটা ক্রেন দিয়ে ধীরে ধীরে উপরে তুলে নেয়া হয়, তারপর খুব সাবধানে অ্যাকুরিয়ামের উপর এনে স্থির করা হয়। কারো বুঝতে বাকি থাকে না যে হঠাৎ করে খাঁচার তলাটুকু খুলে যাবে আর এই মুখোশ পরা মূর্তিটি অ্যাকুরিয়ামের ভেতরে পড়বে। নগরকেন্দ্রের শত শত ছেলেমেয়ে হঠাৎ চুপ করে যায়। যে ভয়ঙ্কর দৃশ্যটি তারা দেখতে যাচ্ছে তার জন্য সবার ভেতরে এক ধরনের উত্তেজনা এসে ভর করেছে। তাদের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে, হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে যায়, নিজের অজান্তেই তাদের শরীর শক্ত হয়ে আসে।
মূর্তিটিকে নিয়ে খাঁচাটি অ্যাকুরিয়ামের ওপর স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছে। সঙ্গীত দ্রুত থেকে দ্রুততর হয়ে ওঠে এবং হঠাৎ সেটি থেমে যায়। বিস্ফোরণের মতো একটা শব্দ হল এবং হঠাৎ করে মূর্তিটির পায়ের নিচে থেকে পাটাতনটি সরে যায়, সঙ্গে সঙ্গে সেটি পানির ভেতরে পড়ে যায়।
