ছেলেমেয়েগুলো একটা নিঃশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ায়। কায়ীরা টেবিল থেকে তার কাগজটা তুলে এনে বলল, আমি খুব খুশি হয়েছি যে তোমরা আমার কাছে এসেছ। প্রতিশোধ নেওয়ার কথা বলছ। তোমাদের এই বয়সে তোমরা এত বড় অবিচার মুখ বুজে সহ্য করলে খুব ভুল হত। নিহনের জন্য তোমাদের এই ভালবাসাটুকুকে আমি খুব সম্মান দিচ্ছি। আমরা পৃথিবীতে বেঁচে আছি শুধুই এই একটি কারণে, মানুষের জন্য মানুষের ভালবাসার কারণে।
নাইনা ভাঙা গলায় বলল, তোমার কী মনে হয়, কায়ীরা, নিহন কি বেঁচে আছে?
জানি না। ওখানে ডলফিনদের একটা দল ছিল, তারা বলেছে নিহনকে মারে নি। ধরে নিয়েছে। সেটা একটা ভালো সংবাদ।
কিন্তু ধরে নিয়ে তো কিছু একটা করে ফেলতে পারে।
হ্যাঁ। তা পারে। কিন্তু তবু আমরা আশা নিয়ে থাকব। সমুদ্রের সব ডলফিনকে খবর দেওয়া আছে-যদি তারা নিহনকে দেখে তাকে যেন সাহায্য করে।
ক্রিহা বলল, কায়ীরা।
বল, ক্ৰিহা।
আমরা কি স্থলমানবদের একটা খবর পাঠাতে পারি না? তাদের বলতে পারি না নিহনকে ফেরত দিতে?
পারি। কিন্তু সেই খবর পাঠালে লাভ হবে কি না, আমি সেটা এখনো বুঝতে পারছি না। আমাকে একটু ভেবে দেখতে দাও।
তুমি যদি কোনো খবর পাঠাতে চাও আমাকে বোলো। আমি সেই খবর নিয়ে যাব, কায়ীরা।
ঠিক আছে, ক্ৰিহা। আমি জানি তোমার অনেক সাহস।
যদি অন্য কিছুও করতে চাও সেটাও আমাদের বোলো। নিহনের জন্য আমরা যা ইচ্ছে তাই করতে পারি।
কায়ীরা মাথা নাড়ল, বলল, আমি জানি। এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, তোমরা তো জান এই পৃথিবীতে এখন আমাদের বেঁচে থাকার একটাই উপায়। সেটা হচ্ছে আমাদের মেধা। আমাদের বিদ্যাবুদ্ধি। আমাদের জ্ঞান। তোমরা সেটা ভুলবে না। তোমাদের শিখতে হবে। সবকিছু শিখতে হবে। জানতে হবে। বিদ্যাবুদ্ধিতে স্থলমানবদের হারাতে হবে, তা না হলে আমরা কিন্তু শেষ হয়ে যাব।
১০. কাটুস্কা ঘর থেকে বের হতে গিয়ে
কাটুস্কা ঘর থেকে বের হতে গিয়ে থেমে গেল, তার বাবার ঘরে আলো জ্বলছে। এ রকম সময় কখনো তার বাবা বাসায় থাকে না, আজকে বাসায় আছে কেন কে জানে। সে বাবার ঘরে উঁকি দিল, বাবা টেবিলের সামনে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে, বসার ভঙ্গিটা কেমন যেন বিষণ্ণ। কাটুঙ্কা মৃদু গলায় ডাকল, বাবা।
রিওন মাথা ঘুরিয়ে তাকাল, কে, কাটুস্কা?
হ্যাঁ, বাবা।
কী খবর, তুমি কোথায় যাচ্ছ?
নগরকেন্দ্রে, বাবা। আজকে নূতন কনসার্ট এসেছে, তার সঙ্গে নূতন জলনৃত্য।
জলনৃত্য?
হ্যাঁ, বাবা। বিজ্ঞাপন দেখ নি? নূতন এক ধরনের জলজ প্রাণীর খেলা, খুব নাকি উত্তেজনাপূর্ণ।
রিওনকে হঠাৎ কেমন জানি ক্লান্ত দেখায়। কাটুস্কা দুশ্চিন্তিত মুখে বলল, বাবা, তোমার শরীর ভালো আছে?
হ্যাঁ, মা। আমার শরীর ভালো আছে।
তোমাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে।
হ্যাঁ। আমি আসলে একটু ক্লান্ত।
কেন, বাবা, তুমি তো কখনো ক্লান্ত হও না। এখন কেন ক্লান্ত হয়েছ?
রিওন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, জানি না কেন। হঠাৎ করে কেন জানি ক্লান্তি লাগছে। সবকিছু নিয়ে এক ধরনের ক্লান্তি। গলার স্বর পাল্টে রিওন বলল, বুঝলি কাটুস্কা, পৃথিবীটা খুব জটিল। মনে হয় এখানে বেঁচে থাকাটা আরো জটিল।
কাটুস্কা একটু অবাক হয়ে বলল, কেন, বাবা? তুমি এ রকম কথা কেন বলছ?
জীবনটা ঠিক করে চালিয়েছি কি না মাঝে মাঝে খুব সন্দেহ হয়। সবকিছু ঠিক করে করার পরও কোথায় কোথায় জানি গোলমাল হয়ে যায়।
কাটুস্কা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, রিওন তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, কাটুস্কা।
কী বাবা।
আজকের কনসার্টে তোমার কি যেতেই হবে?
কাটুস্কা অবাক হয়ে বলল, তুমি একথা কেন জিজ্ঞেস করছ?
না গেলে হয় না?
তুমি তো কখনো আমাকে কিছু করতে নিষেধ কর না। আজকে কেন নিষেধ করছ?
রিওন একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমি জানি না। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, মনে হচ্ছে-
কী মনে হচ্ছে?
রিওন হঠাৎ করে থেমে গেল, বলল, না, কিছু না।
বল বাবা-, কাটুস্কা বলল, কী বলতে চাইছিলে, বল।
না কিছু না। তুমি যেখানে যাচ্ছিলে যাও। উপভোগ করে এস।
কাটুস্কা কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে ঘর থেকে বের হয়ে আসে। তার ভেতরে কী যেন খচখচ করছে, ঠিক কী হচ্ছে সে বুঝতে পারছে না। শুধু মনে হচ্ছে কিছু একটা কোথাও যেন ভুল হয়ে গেছে, কেন হয়েছে, কীভাবে হয়েছে কেউ সেটা ধরতে পারছে না।
.
নগরকেন্দ্রে কমবয়সী ছেলেমেয়েরা এসে ভিড় করেছে। কাটুস্কা তার বন্ধুবান্ধবদের খুঁজে বের করল। এক কোনায় দলবেঁধে দাঁড়িয়ে হইচই করছিল, কাটুস্কাকে দেখে সবাই হইচই করে উঠল। মাজুর বলল, কী খবর, কাটুস্কা, তোমার মুখ এত গম্ভীর কেন? তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি কনসার্ট শুনতে আস নি, তুমি বুঝি কারো মৃত্যুসভায় এসেছ!
খুব মজার একটা কথা বলেছে এ রকম ভঙ্গি করে সবাই হিহি করে হাসতে থাকে। কাটুস্কা বলল, কনসার্ট এখনো শুরু হয় নি। যখন শুরু হবে তখন হয়তো এটাকে শোকসভার মতোই মনে হবে।
দ্রীমান মুখ গভীর করে বলল, না না। তুমি কী বলছ, কাটুস্কা? আমরা কত ইউনিট খরচ করে টিকিট করেছি দেখেছ? এতগুলো ইউনিট নিয়ে ভালো কিছু দেখাবেই।
সবাই স্টেজের দিকে তাকাল, সেখানে বিশাল একটা অ্যাকুরিয়াম, তার ভেতর ভয়ঙ্করদর্শন দুটি হাঙর মাছ ঘুরে বেড়াচ্ছে। রঙিন আলোতে পুরো অ্যাকুরিয়ামটি আলোকিত, পুরো অ্যাকুরিয়ামটিকে একটা অলৌকিক প্রেক্ষাগৃহের মতো মনে হয়।
