রিওন হাসার চেষ্টা করে বলল, তোমার সেটা নিয়ে বিচলিত হওয়ার কোনো কারণ নেই, কোয়াকম্প। মানুষ নিজেও অনেক সময় সেটা বুঝতে পারে না।
সামাজিক দপ্তরের প্রধান বিড়বিড় করে বলল, মানুষকে বোঝা এত সহজ নয়।
শিক্ষা দপ্তরের প্রধান বলল, নূতন প্রজন্মের মধ্যে উৎসাহের খুব অভাব, তাদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য সব সময় আমাদের নূতন কিছু খুঁজে বের করতে হয়। কিছুদিন আগে একটা কনসার্টের আয়োজন করা হয়েছে, সেই কনসার্টে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশন দিয়ে মস্তিষ্কে রেজোনেন্স করা হয়েছে। এর আগে আমরা নূতন একটা পানীয় বাজারে ছেড়েছিলাম-খুব হালকাভাবে স্নায়ু উত্তেজক। নূতন ফ্যাশন বের করতে হয়, নূতন গ্যাজেট বের করতে হয়। সব সময় আমাদের নূতন কিছু দেওয়ার জন্য ব্যস্ত থাকতে হয়।
কোয়ান্টাম কম্পিউটার ও গলায় বলল, আমার মনে হয় নূতন প্রজন্মকে ব্যস্ত রাখার জন্য নূতন আরো একটা প্রজেক্ট হাতে নেওয়া যায়।
কী প্রজেক্ট?
আমাদের হাতে একটা জলমানব আছে।
রিওন চমকে উঠে বলল, কী বললে? জলমানব?
হ্যাঁ।
তুমি কোথা থেকে জলমানব পেয়েছ?
যে জলমানবটাকে তুমি তার এলাকায় ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলে, আমি সেটাকে পরীক্ষা করার জন্য জৈব ল্যাবরেটরিতে নিয়ে এসেছি।
রিওন কয়েক মুহূর্ত কথা বলতে পারল না, কয়েকবার চেষ্টা করে বলল, কিন্তু কিন্তু আমি আমার মেয়েকে কথা দিয়েছিলাম সেই জলমানবটাকে তার এলাকায় ফিরিয়ে দেব।
আমি জানি। কোয়ান্টাম কম্পিউটার শুক গলায় বলল, কিন্তু এই জলমানবটা আমাদের প্রয়োজন ছিল। জলমানবদের বিবর্তন নিয়ে আমাদের কিছু ভবিষ্যদ্বাণী ছিল, সেটা কতটুকু সত্যি পরীক্ষা করে দেখার প্রয়োজন ছিল।
রিওন অধৈর্য গলায় বলল, কিন্তু আমি আমার মেয়ের সামনে মিথ্যাবাদী প্রিমাণিত হয়েছি।
তোমার মেয়ে যদি কখনো সত্যি কথাটা জানতে পারে তা হলে তুমি মিথ্যাবাদী প্রিমাণিত হবে। তার সত্যি কথাটা জানার কোনো প্রয়োজন নেই।
রিওন হতাশার ভান করে বলল, কিন্তু কিন্তু
কোয়ান্টাম কম্পিউটার কঠিন গলায় বলল, তোমরা মানুষেরা ছোট বিষয় নিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়। প্রতিদিন খাবারের জন্য তোমরা শত শত প্রাণী হত্যা কর। অথচ বিশেষ প্রয়োজনে একটি জলমানব ধরে নিয়ে আসা হলে সেটি তোমাদের কাছে বাড়াবাড়ি মনে হয়?
রিওন মাথা নাড়ল, বলল, কোয়াকম্প, তুমি বুঝতে পারছ না। মানুষের ভেতরে যারা আপনজন, তাদের ভেতরে একটা সম্পর্ক থাকে। সেই সম্পর্কটা হচ্ছে বিশ্বাসের সম্পর্ক। একজন মানুষ অন্য মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক নষ্ট করে না। নষ্ট করতে চায় না
কোয়াকম্প রিওনকে বাধা দিয়ে বলল, আমার একটা সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব আছে। সেই দায়িত্ব পালন করার জন্য আমাকে কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তোমাদের সেই সিদ্ধান্তগুলো মেনে নিতে হবে। তোমরা নিশ্চয়ই অস্বীকার করতে পারবে না যে আমি এখন পর্যন্ত কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিই নি কিংবা এখন পর্যন্ত আমার কোনো ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা প্রিমাণিত হয় নি।
রিওন বলল, কোয়াকম্প, তোমার কাছে আমাদের সব তথ্য জমা থাকে। তুমি সেগুলো বিশ্লেষণ কর-কাজেই তোমার ভুল সিদ্ধান্ত নেবার কোনো সুযোগ নেই। তোমার ভবিষ্যদ্বাণীও ভুল হতে পারবে না। যেদিন তোমার সিদ্ধান্ত কিংবা ভবিষ্যদ্বাণী ভুল প্রিমাণিত হবে সেদিন তুমি আর আমাদের দায়িত্ব নিতে পারবে না। তোমাকে সেদিন বিদায় নিতে হবে।
কোয়াকম্প এক মুহূর্ত দ্বিধা করে বলল, হ্যাঁ রিওন। তোমার কথা সত্যি।
যাই হোক, আমরা আগের কথায় ফিরে যাই। রিওন বলল, তুমি জলমানব নিয়ে কিছু একটা বলছিলে।
কোয়াকম্প বলল, হ্যাঁ, জলমানব নিয়েও আমার সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী ছিল। তারা। পানিতে অত্যন্ত কঠিন একটা জীবন যাপন করে, সেই জীবনে কোনো সৃজনশীলতা নেই। কাজেই যতই সময় যাচ্ছে ততই তাদের বুদ্ধিমত্তা কমে আসছে। বিবর্তন উল্টো দিকে গেলে কী হতে পারে জলমানব হল তার প্রিমাণ। জলমানবটি ধরে নিয়ে এসে আমি তাকে পরীক্ষা করে দেখেছি। বুদ্ধিমত্তার নিনীষ স্কেলে সে মাত্র প্রথম স্কেলে। তার বয়সী একজন সাধারণ মানুষ থাকে সপ্তম স্কেলে। জ্ঞান-বিজ্ঞান দূরে থাকুক, সাধারণ সংখ্যা পর্যন্ত সে জানে না। ছোট সংখ্যা যোগ করতে পারে, বিয়োগ করতে পারে না। এই মুহূর্তে আমরা তাদের জলমানব বলে সম্বোধন করি, আগামী শতক পরে তাদের জলজ প্রাণী বলে সম্বোধন করা হবে।
হলোগ্রাফিক কালো টেবিল ঘিরে থাকা অনেকেই সম্মতির ভঙ্গি করে মাথা নাড়ল। কোয়াকম্প তার ভাবলেশহীন গলায় একঘেয়ে সুরে বলল, জলমানব বুদ্ধিমত্তার দিকে অনেক পিছিয়ে গেলেও শারীরিকভাবে একটা চমকপ্রদ ক্ষমতার অধিকারী। এই জলমানবটি দীর্ঘসময় পানির নিচে নিঃশ্বাস না নিয়ে থাকতে পারে। শুনে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, এই জলমানবটি পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন তার ত্বকের ভেতর দিয়ে নিতে পারে। খুব বেশি পরিমাণে নয়, কিন্তু কয়েক মিনিট বেশি বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট।
শিক্ষা দপ্তরের প্রধান অবাক হয়ে বলল, সত্যি?
হ্যাঁ সত্যি। কোয়াকম্প বলল, তার শারীরিক চমকপ্রদ ক্ষমতার কথা খুব বেশি মানুষ জানে না, কিন্তু যে জিনিসটা অনেকেই গুরুত্ব দিয়ে নেবে সেটা হচ্ছে তার সুঠাম শরীর আর দৈহিক সৌন্দর্য। আমাদের নূতন প্রজন্মের অনেকের কাছেই সেটা অত্যন্ত আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। সেটা আমাদের জন্য একটা সমস্যা হতে পারে।
