নিহন কোনো কথা বলল না। লাল চুলের মানুষটা বলল, পানির ভেতরে তুমি কেমন থাক, কী কর, কোয়াকম্প সেটা জানতে চায়।
নিহন এবারো কোনো কথা বলল না। লাল চুলের মানুষটা বলল, তোমাকে একটা বড় পানির ট্যাঙ্কে রাখা হবে, তোমার শরীরে নানা রকম মনিটর লাগানো হবে, তোমার রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ মাপা হবে-এটা হবে অনেক দীর্ঘ পরীক্ষা।
নিহন একটা নিঃশ্বাস ফেলল, বলল, ঠিক আছে।
ঘণ্টাখানেক পরে বড় একটা চৌবাচ্চায় পানির মধ্যে নিহনকে নামিয়ে দেওয়া হল। চারপাশে কয়েকজন মানুষ তাকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ করতে থাকে। যখন তাকে পানির নিচে যেতে বলে, নিহন পানির নিচে চলে যায়। যখন তাকে ভেসে উঠতে বলে, তখন সে আবার ভেসে ওঠে। মনিটরে তার শরীরের তাপ, রক্তচাপ, রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ, হৃৎস্পন্দন এবং এ। রকম অসংখ্য ঘুঁটিনাটি বিষয় মাপতে থাকে। যে মানুষগুলো পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছিল, তারা কোয়াকম্পের জন্য তথ্য সগ্রহ করছিল, তথ্যের মধ্যে বিস্ময়কর কোনো বিষয় আছে কি না। সেটা আর বুঝতে পারছিল না। তথ্যগুলো যে বিস্ময়কর সেটা কোয়াকস্পের পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিল, কিন্তু এই অসাধারণ ক্ষমতাশালী কম্পিউটারটি অসাধারণ জটিল সমস্যার সমাধান করতে পারলেও তার অবাক হওয়ার ক্ষমতা ছিল না।
০৮. জরুরি একটা সভা বসেছে
জরুরি একটা সভা বসেছে–কোয়াকম্পের অনুরোধেই এই জরুরি সভাটি ডাকা হয়েছে। সভাতে শারীরিকভাবে কেউ আসে নি, সবাই নিজের নিজের অফিসে বসেই সভায় হাজির হয়েছে। হলোগ্রাফিক স্ক্রিনে সবারই মনে হচ্ছে তার চারপাশে অন্যরা বসে আছে। সভার শুরুতে প্রতিরক্ষা দপ্তরের প্রধান রিওন বলল, তোমাদের সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে আমাদের সভা শুরু করছি। আজকের সভায় তোমাদের অন্য সভার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের কোয়ান্টাম কম্পিউটার কোয়াকম্প সক্রিয়ভাবে উপস্থিত থাকবে। আমাদের সঙ্গে সে যেন সহজভাবে কথা বলতে পারে সেজন্য আজকে তার ইন্টারফেসের সঙ্গে একটা কণ্ঠস্বর সিনথেসাইজার লাগানো হয়েছে। ও
কৃত্রিম কালো টেবিল ঘিরে বসে থাকা সামাজিক দপ্তরের প্রধান, আইন বিভাগের প্রধান, শিক্ষা বিভাগের প্রধান, স্বাস্থ্য দপ্তরের প্রধান সবাই একটু নড়েচড়ে বসল। সব গুরুত্বপূর্ণ সভাতেই কোয়াক উপস্থিত থাকে তবে সেটা হয় নীরব উপস্থিতি। সভার কথাবার্তাগুলো কোয়াকম্পের তথ্যভাণ্ডারে সরাসরি চলে যায়। সক্রিয়ভাবে কণ্ঠস্বর সিনথেসাইজারসহ কথা বলতে পারে এভাবে কোয়াকম্প খুব বেশি উপস্থিত থাকে না।
রিওন বলল, কোয়াকম্প, তুমি কি সভার শুরুতে আমাদের উদ্দেশে কিছু বলতে চাও?
কোয়াকম্পের ভাবলেশহীন শুষ্ক গলার স্বর শোনা গেল, তোমাদের সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি। তোমাদের সেবা করার সুযোগ পেয়ে আমি ধন্য হয়েছি।
রিওন বলল, কোয়াকম্প, তোমার অনুরোধে আজকের এই সভাটি ডাকা হয়েছে। তুমি কি বলবে ঠিক কী নিয়ে আজ আলোচনা শুরু হবে?
কোয়াকম্প বলল, আমি আমাদের নূতন প্রজন্ম নিয়ে আলোচনা করতে চাই।
চমৎকার! রিওন বলল, আমরা আমাদের কিছু পরিসংখ্যান নিয়ে শুরু করছি। আমাদের তরুণ সমাজকে নিয়ে আমি খুব চিন্তিত। আমাদের শতকরা পনের ভাগ তরুণ তরুণী আত্মহত্যা করছে। শতকরা তিরিশ ভাগ মাদকাসক্ত। শতকরা চল্লিশ ভাগ। হতাশাগ্রস্ত। বলা যায়, মাত্র পনের ভাগ মোটামুটিভাবে স্বাভাবিক। সেটাও খুব আশাব্যঞ্জক না। কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুরো অবস্থাটা আরো খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
শিক্ষা বিভাগের প্রধান বলল, একটা সময় ছিল, লেখাপড়া এবং জ্ঞানচর্চার পুরো বিষয়টা ছিল খুব কঠিন। কোয়াকম্প আসার পর থেকে পুরো বিষয়টা এখন হয়েছে খুব। সহজ। কিন্তু তারপরও তরুণ-তরুণীদের লেখাপড়ায় আগ্রহ নেই। তারা কিছু শিখতে চায় না। কিছু জানতে চায় না।
সামাজিক দপ্তরের প্রধান কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কোয়াকম্প তাকে বাধা দিয়ে বলল, মানুষের পরিসংখ্যান নিয়ে একটা ভীতি আছে। আমি কোয়ান্টাম কম্পিউটার হিসেবে তোমাদের আশ্বস্ত করতে চাই, পরিসংখ্যান নিয়ে তোমরা বিচলিত হয়ো না। তোমরা তোমাদের মূল লক্ষ্য এবং মূল উদ্দেশ্যটার দিকে নজর দাও। যতক্ষণ পর্যন্ত মূল উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্যের দিকে তোমরা অগ্রসর হতে পারবে, তোমাদের ভয়ের কিছু নেই।
রিওন ভুরু কুঁচকে বলল, কিন্তু আমরা কি অগ্রসর হতে পারছি?
কোয়াকম্প শুক স্বরে বলল, পারছি। তোমাদের জীবনের মান আগের থেকে উন্নত হয়েছে। আমরা আমাদের শক্তির প্রয়োজন প্রায় মিটিয়ে ফেলেছি। শক্তির অভাব ঘুচিয়ে ফেলাই হচ্ছে মানবসভ্যতার সত্যিকারের লক্ষ্য। যদি অফুরন্ত শক্তি থাকে তা হলে আমরা যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারব।
সামাজিক দপ্তরের প্রধান বিড়বিড় করে বলল, কিন্তু নূতন প্রজন্মের মনে যদি আনন্দ না থাকে, সুখ না থাকে তা হলে অফুরন্ত শক্তি দিয়ে আমরা কী করব?
কোয়ান্টাম কম্পিউটার বলল, এই একটি বিষয়ে আমি তোমাদের বুঝতে পারি না। আনন্দ এবং সুখ। আমি আগেও লক্ষ করেছি, আনন্দ এবং সুখ কথাগুলো মানুষ অনেক সময় বিপরীত অর্থে ব্যবহার করে। আমার ধারণা, যে পরিবেশে মানুষের সুখী হওয়ার কথা, অনেক সময়ই সেই পরিবেশে তারা অসুখী। যেই পরিবেশে তাদের আনন্দ পাওয়ার কথা, সেই পরিবেশে অনেক সময় তাদের মানসিক যন্ত্রণা হয়। আমি ব্যাপারটা বুঝতে পারি না।
