রিওন ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, কী সমস্যা?
জলমানব একটি জন্তু ছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু নূতন প্রজন্ম যদি তাদের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে তা হলে ভবিষ্যতে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না।
রিওন কঠিন মুখে জিজ্ঞেস করল, কেন তাদের বিরুদ্ধে আমাদের কোনো ব্যবস্থা নিতে হবে। সমুদ্রের বুকে ঝড়বৃষ্টি টাইফুনে তারা এমনিতেই ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু যত তাড়াতাড়ি শেষ হবার কথা, তারা এত তাড়াতাড়ি শেষ হচ্ছে না। টাইফুনের সময় তারা কেউ ছিল না, টাইফুন শেষে হঠাৎ করে তারা হাজির হয়েছে। তারা পর মতো বেঁচে থাকতে শিখে যাচ্ছে। পশুর মতো বেঁচে থাকবে পশুরা, মানুষের জন্য পশুর মতো বেঁচে থাকা ঠিক নয়। আমাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
রিওন শীতল গলায় জিজ্ঞেস করল, তা হলে তুমি কী করতে চাও?
কোয়াকম্প শুষ্ক গলায় বলল, আমি আমাদের নূতন প্রজন্মের ভেতর আর জলমানবের ভেতর একটা দূরত্ব তৈরি করতে চাই।
তুমি সেটা কীভাবে করবে?
জলমানব যে মানুষ থেকে একেবারেই ভিন্ন আমি সেটা প্রতিষ্ঠিত করতে চাই।
শিক্ষা দপ্তরের প্রধান বলল, তুমি সেটা কীভাবে প্রতিষ্ঠিত করবে?
কাজটি সহজ। জলমানব একটা জন্তুর মতো, তাকে অন্য কোনো জন্তুর সাথে প্রদর্শন করতে হবে।
উপস্থিত যারা ছিল তারা সবাই সম্মতির ভঙ্গি করে মাথা নাড়তে থাকে। শুধু রিওন বলল, আমার মেয়ে এখনো আসল ব্যাপারটি জানে না। প্রদর্শনী হলে নিশ্চিতভাবে জেনে যাবে। আমি তখন তার সামনে মুখ দেখাতে পারব না।
কোয়ান্টাম কম্পিউটার রিওনের আপত্তিটুকু গায়ে মাখল না, বলল, সামুদ্রিক কোনো প্রাণীর সঙ্গে এই জলমানবের যুদ্ধের ব্যবস্থা করা যেতে পারে, তরুণ প্রজন্ম স্বচক্ষে দেখতে পেলে সেটি খুব উপভোগ করবে।
শিক্ষা দপ্তরের প্রধান বলল, হ্যাঁ, সেরকম একটা কিছু করতে হবে। শুধু একটা প্রদর্শনী হলে কেউ যাবে না। আজকালকার ছেলেমেয়েরা মিউজিয়াম বা চিড়িয়াখানাতেও যায় না। তারা সাধারণ কিছু দেখে আনন্দ পায় না। সেখানে তায়োলেন্স থাকতে হয়। উত্তেজনা থাকতে হয়। মস্তিষ্কে স্টিমুলেশন থাকতে হয়।
রিওন বলল, আমি এখনো বুঝতে পারছি না জলমানবকে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করলে কেন আমাদের তরুণ প্রজন্মের সাথে দূরত্বের সৃষ্টি হবে।
কোয়াকম্প শান্ত গলায় বলল, সেটা নির্ভর করবে তাকে কীভাবে প্রদর্শন করা হয় তার ওপর। আমরা তাকে পশু হিসেবে উপস্থাপন করব, সে অন্য পশুর সাথে থাকবে, পশুর মতো। আচরণ করবে।
রিওন বলল, আমি এখনো নিশ্চিত নই।
কোয়াকম্প শীতল গলায় বলল, তোমার নিশ্চিত হবার কোনো প্রয়োজন নেই রিওন। বিষয়টাকে তুমি আমার হাতে ছেড়ে দাও। মনে রেখ আমি তোমাদের একমাত্র কোয়ান্টাম কম্পিউটার হিসেবে তোমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করি। আমার ওপরে বিশ্বাস রেখ।
রিওন কোনো কথা না বলে একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
কোয়াকম্প বলল, প্রদর্শনীটার আয়োজন করবে সামাজিক দপ্তর। শুধু প্রদর্শনী হলে হবে না তার সাথে থাকতে হবে একটা কনসার্ট
সামাজিক দপ্তরের প্রধান বিড়বিড় করে বললেন, শুধু আমাদের পক্ষে এ রকম একটা প্রদর্শনীর আয়োজন করা সম্ভব হবে না। বিষয়টার দায়িত্ব আরো কাউকে দিতে হবে।
কথাটা লুফে নিয়ে কোয়াকম্প বলল, হ্যাঁ। আমরা এই জলমানবকে কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে দিতে পারি, তারা একে ব্যবহার করে যা করা দরকার তা-ই করতে পারবে। যেখানে অর্থের বিনিময় নেই সেখানে সৃজনশীলতা নেই।
রিওন কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে বসে রইল। হঠাৎ করে সে সভায় কথা বলার উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে। সে হঠাৎ করে কোয়াকম্পের সত্যিকারের পরিকল্পনাটা বুঝতে পেরেছে। নূতন প্রজন্মের উপস্থিতিতে এই জলমানবটিকে কোনো জলজ প্রাণীকে দিয়ে হত্যা করানো হবে। সেই হত্যাকাণ্ডটি করানো হবে সবার সম্মতিতে– সবার আগ্রহে। না জেনে না বুঝেই নূতন প্রজন্ম সম্মিলিতভাবে এই ঘটনার দায়তার গ্রহণ করবে। অপরাধবোধ থেকে তাদের ভেতরে জন্ম নেবে ক্রোধ আর ঘৃণা! জলমানবের বিরুদ্ধে ক্রোধ, জলমানবের জন্য ঘৃণা!
রিওন হঠাৎ করে নিজের ভেতরেই একধরনের ঘৃণা অনুভব করতে থাকে।
০৯. ঘরের দরজায় কার যেন ছায়া
ঘরের দরজায় কার যেন ছায়া পড়ল। কায়ীরা মাথা তুলে তাকিয়ে দেখে কমবয়সী কয়েকজন ছেলেমেয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। ছেলেমেয়েগুলোকে সে চিনতে পারে। এরা সবাই নিহনের বন্ধু। ডলফিনের ওপর চেপে যে দলটি সমুদ্রে ঘুরে বেড়ায় এরা সেই দলের ছেলেমেয়ে।
কায়ীরা তার হাতের কাগজটা টেবিলে রেখে জিজ্ঞেস করল, কী ব্যাপার?
আমরা তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি, কায়ীরা।
হ্যাঁ, সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি। এস ভেতরে এস।
ছেলেমেয়েগুলো কায়ীরার ছোট ঘরটাতে ঢুকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে পড়ে। তারা কী জন্য এসেছে কায়ীরা সেটা ভালো করেই জানে। তাই সে কোনো কথা না বলে চুপচাপ অপেক্ষা করতে থাকে। ছেলেমেয়েগুলোর ভেতরে যে একটু বড়, সুদর্শন ক্ৰিহা ভণিতা না। করে কথা বলতে শুরু করে, কায়ীরা, আমাদের নিহনকে স্থলমানবেরা ধরে নিয়ে গেছে।
কায়ীরা নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। ক্ৰিহা বলল, ঘটনার সময় নাইনা সেখানে ছিল, সেখানে কী ঘটেছে আমরা সেটা নাইনার মুখে শুনেছি।
