সেটা পরীক্ষা করার জন্য তোমার হাত ও পায়ের বাধন খুলে দিতে হবে। বুঝেছ?
বুঝেছি।
কিন্তু হাত-পা খুলে দেওয়ার পর তুমি যেন আমাদের হঠাৎ করে আক্রমণ করে না বস
আমি তোমাদের আক্রমণ করব না।
আমরা বিষয়টা নিশ্চিত করতে চাই। সেজন্য আমরা তোমার শরীরে একটা পোব লাগাব। তুমি যদি বিপজ্জনক কিছু কর তা হলে আমরা একটা সুইচ টিপে ধরব, তখন তুমি একটা ভয়ঙ্কর ইলেকট্রিক শক খাবে।
নিহন কোনো কথা না বলে নিঃশব্দে মানুষটার দিকে তাকিয়ে রইল। মানুষটা বলল, ইলেকট্রিক শক কথাটা তুমি হয়তো শোন নাই, তাই এই কথাটার অর্থ তুমি বুঝতে পারবে না। কিন্তু আমার কথা বিশ্বাস কর, এটা ভয়ানক একটা জিনিস, একবার খেলে সারা জীবন মনে থাকবে।
কালো চুলের মানুষটা এবার এগিয়ে আসে, নিহনের হাতে হোট একটা স্ট্র্যাপ দিয়ে প্রোবটা বেঁধে দিয়ে বলল, জিনিসটা পরীক্ষা করে দেখা যাক।
হাতে ধরে রাখা একটা সুইচ টিপে ধরতেই নিহন প্রচণ্ড যন্ত্রণায় আর্তচিৎকার করে উঠল। সমস্ত শরীর ভয়ঙ্কর ইলেকট্রিক শকে ঝাঁকুনি দিয়ে কেঁপে কেঁপে ওঠে। লাল চুলের মানুষটার মুখে একটা হাসি ফুটে উঠল, সে মাথা নেড়ে বলল, বুঝেছ? এটা হচ্ছে ইলেকট্রিক শক।
নিহন মাথা নাড়ল, শুকনো গলায় বলল, বুঝেছি।
কাজেই তুমি যদি উল্টাপাল্টা কোনো কাজ কর তা হলেই ঘ্যাচ করে এই সুইচ টিপে ধরব, সঙ্গে সঙ্গে তুমি ইলেকট্রিক শক খাবে। বুঝেছ?
বুঝেছি।
তাই তুমি কোনো উল্টাপাল্টা কাজ করবে না। ঠিক আছে?
ঠিক আছে।
মানুষ দুজন তখন নিহনের বাধন খুলে দেয়, নিহন তার টেবিলে বসে চারদিকে ঘুরে তাকাল। নানারকম যন্ত্রপাতি গুঞ্জন করছে, সেগুলো দেখে নিহন মুগ্ধ হয়ে যায়। তার আবার মনে হয়, আহা! সে যদি এ রকম কয়েকটা যন্ত্র নিয়ে যেতে পারত তা হলে কী চমৎকারই না হত!
লাল চুলের মানুষটা বলল, আমরা তোমার কিছু জিনিস পরীক্ষা করব। তুমি কীভাবে চিন্তা কর তার একটা ধারণা নেব। বুঝেছ?
নিহন মাথা নাড়ল, বলল, বুঝেছি।
আমি তোমাকে কিছু প্রশ্ন কর, তুমি সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেবে। যদি প্রশ্ন বুঝতে না পার আমাদের জিজ্ঞেস কোরো।
করব।
খবরদার! অন্য কিছু করার চেষ্টা কোরো না।
না। করব না।
লাল চুল এবং কালো চুলের মানুষ দুটি কিছু ধাতব ব্লক, বোর্ড, নানা ধরনের জ্যামিতিক আকারের নকশা বের করে নিহনের পরীক্ষা নেওয়া শুরু করল। নিহন সবিস্ময়ে আবিষ্কার। করে, তারা তাদের ডলফিনগুলোর বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষা করার জন্য যে পরীক্ষা করে, এই পরীক্ষাটা অনেকটা সে রকম। মানুষ দুজন ধরেই নিয়েছে নিহনের বুদ্ধিমত্তা অত্যন্ত নিম্নস্তরের, প্রায় পশুর কাছাকাছি।
নিহন তাদের নিরাশ করল না। ঠিক কী কারণ জানা নেই, নিহনের মনে হল সে যদি এই মানুষ দুটোকে ধারণা দেয় যে আসলেই তার বুদ্ধিমত্তা নিম্নস্তরের তা হলে সেটা পরে কাজে লাগতে পারে। নিহন তাই খুব চিন্তাভাবনা করে পুরোপুরি নির্বোধের মতো আচরণ করতে শুরু করল।
মানুষ দুজন গম্ভীরভাবে মাথা নেড়ে ফিসফিস করে নিজেদের ভেতর কথা বলে। নিহন শুনল, লাল চুলের মানুষটি বলল, এর মানসিক বয়স ছয় থেকে সাত বছরের কাছাকাছি।
কালো চুলের মানুষটি বলল, দশ পর্যন্ত গুনতে পারে। যোগ কী তার ধারণা আছে। কিন্তু বিয়োগ করতে পারে না।
ভাষাও খুব দুর্বল। নিজেকে খুব ভালো করে প্রকাশ করতে পারে না।
কোথাও মনোযোগ দিতে পারে না একটা জিনিস একটানা বেশি চিন্তা করতে পারে।
লাল চুলের মানুষটা বলল, দেখেছ, কোয়াকম্পর ভবিষ্যদ্বাণী পুরোপুরি মিলে গেছে।
হ্যাঁ। পুরোপুরি মিলে গেছে। জলমানবের এই প্রজাতি ধীরে ধীরে এক ধরনের জ্যুতে পরিণত হচ্ছে। এদের ভবিষ্যটুকু দেখতে খুব কৌতূহল হচ্ছে।
এদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমরা যেরকম আমাদের যে কোনো কাজের জন্য কোয়াকম্পকে ব্যবহার করতে পারি, তারা তো সেটা করতে পারে না।
নিহন একটাও কথা না বলে চুপচাপ বসে রইল। সে চোখেমুখে এক ধরনের ভাবলেশহীন ভঙ্গি ফুটিয়ে চোখের কোনা দিয়ে সবকিছু লক্ষ করে।
মানুষ দুজন কোয়াকম্পের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের তথ্য পাঠাতে থাকে। কিছু রিপোর্ট পরীক্ষা করে এবং সবশেষে যোগাযোগ মডিউল দিয়ে কিছু মানুষের সঙ্গে কথা বলে।
নিহনকে কিছু খাবার দেওয়া হল। তার খিদে নেই, বিস্বাদ খাবার, তবু সে জোর করে খেয়ে নিল। তাকে একটা বাথরুম ব্যবহার করতে দেওয়া হল, সেখানে দীর্ঘসময় সে পানির। ধারার নিচে দাঁড়িয়ে রইল। তার দৈনন্দিন জীবন কাটে পানির খুব কাছাকাছি একা দীর্ঘসময় সে পানি থেকে দূরে থাকে নি। সে বুঝতে পারছিল তার পুরো শরীর পানির জন্য হাহাকার করছিল। পুরো শরীর পানিতে ভিজিয়ে সে যখন আগের ঘরটিতে ফিরে এল, মানুষ দুজন তাকে দেখে খুব অবাক হল। বলল, তোমার শরীর ভিজে।
হ্যাঁ।
শরীর মুছে নাও।
না। নিহন মাথা নাড়ল, আমি ভেজাই থাকতে চাই।
কেন?
আমার ভেজা থাকতে ভালো লাগে।
কী আশ্চর্য!
নিহন কোনো কথা বলল না। মানুষ দুজন একজন আরেকজনের মুখের দিকে তাকাল। লাল চুলের মানুষটা বলল, আমাদের মনে হয় বিষয়টা কোয়াকম্পকে জানানো দরকার।
হ্যাঁ। কালো চুলের মানুষটি মাথা নাড়ল, বলল, জানানো দরকার।
নিহন দেখল মানুষ দুজন ঘরের এক কোনায় গিয়ে কিছু যন্ত্রপাতির সামনে বসে কিছু একটা লিখতে থাকে। তারপর আবার নিহনের কাছে ফিরে আসে। লাল চুলের মানুষটা বলল, তোমাকে আরো কিছু পরীক্ষা করতে হবে।
