মেয়ে কণ্ঠে একজন উত্তর দিল, না, নাই। সব পরীক্ষা করা হয়েছে। কোয়াকম্প রিপোর্ট দিয়েছে।
তুমি নিজে দেখেছ সেই রিপোর্ট?
হ্যাঁ, দেখেছি।
আমি কোনো কিছু বিশ্বাস করি না। আমাদের এ রকম ঝুঁকিপূর্ণ কাজে লাগাবে কিন্তু সেজন্য আলাদা ইউনিট দেবে না এটা কেমন কথা?
মেয়ে কণ্ঠ উত্তর দিল, এটা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ না। সত্যি কথা বলতে কী, ঝুঁকিটা এই জলমানবের। আমাদের এখানে এক শ দশ রকম ভাইরাস। নির্ঘাত এর অসুখ হবে। খারাপ রকমের একটা অসুখ হবে।
মোটা কণ্ঠ উত্তর দিল, কিন্তু এই জলমানব যদি আমাদের আক্রমণ করে? এর শরীরটা দেখেছ? একটুও বাড়তি মেদ নেই, পুরোটা শক্ত মাংসপেশি। এর গায়ে নিশ্চয়ই মোষের মতো জোর।
না, এই জলমানব আক্রমণ করবে না। তাকে বেঁধে রাখা হয়েছে। যে ড্রাগ দেওয়া। হয়েছে তার কারণে এত তাড়াতাড়ি জ্ঞান ফিরে আসার কথা না। তা ছাড়া
তা ছাড়া কী?
তা ছাড়া জলমানব খুব নিরীহ প্রাণী। তাদের সমাজে কোনো ভায়োলেন্স নেই।
মোটা গলার মানুষটি বলল, ভায়োলেন্স নেই সেটা আবার কী রকম সমাজ?
মেয়েটি বলল, সমাজ নিয়ে কথা বলার অনেক সময় পাবে। এখন তাকে স্ক্যান করানো কু কর।
ঠিক আছে।
নিহনের খুব ইচ্ছা করছিল চোখ খুলে দেখে, কিন্তু সে চোখ বন্ধ করে রইল। সে অনুভব করে তাকে কোনো একটা যন্ত্রের ভেতর দিয়ে নেওয়া হচ্ছে, সে এক ধরনের অস্বস্তিকর উষ্ণতা এবং তীব্র কম্পন অনুভব করে।
মেয়ে কণ্ঠটি বলল, দেখ দেখ, জলমানবের ফুসফুসটা দেখ। কত বড় দেখেছ?
মোটা গলার মানুষটি বলল, আমার দেখার কোনো প্রয়োজন নেই। কাজ করতে এসেছি, কাজ করে চলে যাব। যা দেখার সেটা দেখবে কোয়াকম্প, আমাদের কোয়ান্টাম কম্পিউটার।
সে তো দেখছেই। সে দেখতে চাইছে বলেই তো আমরা স্ক্যান করছি।
মোটা গলার মানুষটা বলল, আচ্ছা, শরীরে ভেতরের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এ রকম স্পষ্ট দেখা যায় এই মেশিনটা কাজ করে কেমন করে জান?
উঁহু। আমাদের জানার কথা নয়, জানার প্রয়োজনও নাই। এই সব কোয়াকম্পের মাথাব্যথা।
নিহন সাবধানে চোখের পাতা খুলে যারা কথা বলছে তাদের দেখার চেষ্টা করল, একজন মোটাসোটা মানুষ, আরেকজন হালকা পাতলা মহিলা। স্ক্যানিং মেশিন কেমন করে কাজ করে তারা জানে না। নিহন জানে, সে পড়েছে। এই মানুষগুলোর কিছুই জানার দরকার নেই, কারণ কোয়াকম্প নামে তাদের কোয়ান্টাম কম্পিউটার সবকিছু জানে। জলমানবদের জানার দরকার আছে, কারণ তাদের কোয়ান্টাম কম্পিউটার নেই। কোনটা ভালো?
নিহন শুনতে পায় পুরুষ মানুষ এবং মহিলাটি কথা বলতে বলতে একটু দূরে চলে যাচ্ছে, তখন সে খুব সাবধানে তার চোখ অল্প একটু খুলে দেখার চেষ্টা করল। যন্ত্রপাতি বোঝাই একটা ঘর, তার মাঝামাঝি একটা শক্ত ধাতব টেবিলে সে শুয়ে আছে। তার ওপর একটা বড় উজ্জ্বল আলো, সেদিকে তাকালে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। চারপাশের যন্ত্রগুলোর দিকে সে লোভাতুর চোখে তাকাল, সে এগুলোর কথা পড়েছে, কখনো নিজের চোখে দেখবে ভাবে নি। এখন সে দেখছে। আহা, তারা যদি এরকম কিছু যন্ত্রপাতি পেত কী মজাই না হত!
নিহন হঠাৎ এক ধরনের ক্লান্তি অনুভব করে। স্ক্যান করার জন্য শরীরের ভেতরে তেজস্ক্রিয় দ্রবণ ঢুকিয়ে দিয়েছে, সেগুলো স্তিমিত হতে একটু সময় নেবে। ততক্ষণ তার বিশ্রাম নেওয়ার কথা। হয়তো সেজন্য ঘুমের ওষুধ দিয়েছে, আবার তার চোখে ঘুম নেমে আসে।
.
নিহনের ছাড়াছাড়াভাবে ঘুম হল, সমস্ত শরীর শক্ত করে বাঁধা, এর মাঝে সত্যিকার অর্থে ঘুমানো যায় না। ক্লান্ত হয়ে ছাড়া-ছাড়াভাবে চোখ বুজে আসে, বিচিত্র সব স্বপ্ন দেখে তখন। একটা বিশাল অক্টোপাস এসে তাকে পেঁচিয়ে ধরেছে, প্রচণ্ড যন্ত্রণায় সে ছটফট করছে, তখন অক্টোপাসটি পরিষ্কার মানুষের গলায় বলল, এদের বুদ্ধিমত্তা নিম্নশ্রেণীর।
নিহনের ঘুম ভেঙে যায়, তার মাথার কাছে দুজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, একজনের বড় বড় লাল চুল অন্যজনের চুল ছোট করে ছটা। লাল চুলের মানুষটি বলল, কেন বুদ্ধিমত্তা নিম্নশ্রেণীর হয়? এরা তো একসময় আমাদের মতো মানুষই ছিল।
বিবর্তন।
বিবর্তন?
হ্যাঁ, বিবর্তন যেরকম পজিটিভ হতে পারে, সেরকম নেগেটিভও হতে পারে। আমাদের বিবর্তন হচ্ছে পজিটিভ। যতই দিন যাচ্ছে আমরা আরো পূর্ণ মানুষ হচ্ছি, ভালো মানুষ হচ্ছি। এরা যাচ্ছে উল্টো দিকে।
লাল চুলের মানুষটি বলল, হ্যাঁ, সেটাই স্বাভাবিক। বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার না করলে সেটা কমে যায়। এদের বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করার সুযোগ নেই। জীবনের মান খুব নিচু। অনেকটা বন্য জন্তুর মতো। এদের সবকিছুই হচ্ছে সহজাত প্রবৃত্তি।
কালো চুলের মানুষটি বলল, হ্যাঁ, শরীরটা দেখলেই অনুমান করা যায়। দেখেছ এর শরীরে একটা জন্তু জন্তু ভাব আছে?
হ্যাঁ। খুব সাবধান! এরা নাকি আমাদের কথা মোটামুটি বুঝতে পারে। প্রথমেই একে বুঝিয়ে দেওয়া যাক আমরা কী করতে যাচ্ছি।
লাল চুলের মানুষটা এবার নিহনের গায়ে ছোট একটা ধাক্কা দিয়ে বলল, এই ছেলে। এই।
নিহন চোখ খুলে তাকাল। লাল চুলের মানুষটা বলল, তুমি কি আমার কথা বুঝতে পারছ?
নিহন মাথা নাড়ল, হ্যাঁ, পারছি।
চমৎকার! আমরা তোমার কিছু জিনিস পরীক্ষা করব। তোমাকে সহযোগিতা করতে হবে। বুঝেছ?
নিহন আবার মাথা নাড়ল, বলল, বুঝেছি।
