পাগলী মেয়ে, বাবাকে ধন্যবাদ দেওয়ার কী আছে।
বিদায়, বাবা!
বিদায়! সমুদ্রভ্রমণ উপভোগ কর।
.
কাটুস্কা তার যোগাযোগ মডিউলটা ভাজ করে পকেটে রেখে নিহনের দিকে এগিয়ে বলল, আমি সব ব্যবস্থা করে এসেছি।
কী ব্যবস্থা?
তোমাকে তোমার এলাকায় নামিয়ে দিয়ে আসবে।
নিহন কিছুক্ষণ অবাক হয়ে কাটুস্কার দিকে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করল, কেমন করে?
হেলিকপ্টারে করে?
হেলিকপ্টারে?
হ্যাঁ।
তুমি কেমন করে হেলিকপ্টার আনবে।
আমার বাবা প্রতিরক্ষা দপ্তরের প্রধান। আমার বাবার অনেক ক্ষমতা।
ও।
তুমি এখন আমার কথা বিশ্বাস করেছ?
নিহন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর বলল, হ্যাঁ, বিশ্বাস করেছি।
চমৎকার! কাটুস্কা একটু হাসার চেষ্টা করে বলল, তোমাকে এভাবে ধরে এনে আমার খুব খারাপ লাগছিল। তোমাকে তোমার এলাকায় ছেড়ে দিয়ে আসব ভেবে আমার এখন একটু ভালো লাগছে।
নিহন নিজেও এবার একটু হাসার চেষ্টা করল। কাটুস্কা বলল, তুমি একটু অপেক্ষা। কর। আমি তোমার শেকলটা খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করি।
কাটুস্কা চলে যেতে যেতে ফিরে এসে জিজ্ঞেস করল, তোমার কি খিদে পেয়েছে? তুমি কি কিছু খেতে চাও? কোনো পানীয়?
না, কাটুস্কা। ধন্যবাদ।
কাটুস্কা চলে যাচ্ছিল, নিহন তাকে ডাকল, কাটুস্কা।
বল।
তুমি আমার নাম জিজ্ঞেস করেছিলে। আমার নাম নিহন।
কাটুস্কা তার হাতটি নিহনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, নিহন, তোমার সঙ্গে পরিচিত হয়ে খুব খুশি হলাম।
নিহন কাটুস্কার হাতটা স্পর্শ করে বলল, আমিও খুব খুশি হলাম, কাটুস্কা।
.
হেলিকপ্টারটি বেশ বড়, ইয়টের ডেকে সেটি নামতে পারল না। ইয়টের ওপর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে নাইলন কর্ডের একটা মই নামিয়ে দিল। নিহন মই বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে মাঝখানে থেমে নিচে তাকাল, ইয়টের ডেকে বেশ কয়জন দাঁড়িয়ে আছে, তাদের মধ্যে কাটুস্কাও আছে। নিহনকে তাকাতে দেখে কাটুস্কা হাত নাড়ল। নিহনও প্রত্যুত্তরে তার হাত নাড়ল।
হেলিকপ্টারের দরজা দিয়ে একজন মাথা বের করেছিল। সে নিহনকে তাড়া দিয়ে। বলল, দেরি কোরো না। চট করে উঠে এস।
নিহন দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে আসে। ভেতরে পাশাপাশি কয়েকটা বসার জায়গা, একজন নিহনকে তার একটাতে বসার ইঙ্গিত করল। নিহন বসার সঙ্গে সঙ্গেই হেলিকপ্টারটা গর্জন করে উপরে উঠে যেতে শুরু করে। নিহন জানালা দিয়ে দেখতে পায় কাটুস্কা এখনো হাত নাড়ছে। নিহন জানালা দিয়ে এই অন্য রকম মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই মায়াবতী মেয়েটির সাথে তার আর কোনো দিন দেখা হবে না।
হেলিকপ্টারের ভেতর একজন মানুষ নিহনের দিকে এগিয়ে আসে, হাতে একটা গ্লাস, গ্লাসে স্বচ্ছ এক ধরনের পানীয়। মানুষটা গ্লাসটি নিহনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, নাও। খাও।
নিহন মাথা নাড়ল, বলল, আমি কিছু খেতে চাই না।
তবু খাওয়া উচিত। তোমার শরীরে পানীয়ের অভাব হয়েছে, ছেলে।
নিহন হাত বাড়িয়ে গ্লাসটা নিজের কাছে নিয়ে এসে চুমুক দিল, ঝাঁজালো এক ধরনের স্বাদ। নিহন কয়েক চুমুকে গ্লাসটা শেষ করে খালি গ্লাসটি মানুষটার হাতে ফিরিয়ে দেয়।
নিহন জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল, সমুদ্রের নীল পানির ওপর দিয়ে হেলিকপ্টারটা ছুটে যাচ্ছে। সে কখনো কি ভেবেছিল যে সে একটা হেলিকপ্টারে উঠবে? সত্যিকারের হেলিকপ্টার, যেটা আকাশে উড়তে পারে? কী আশ্চর্য! নিহন নিজের ভেতরে এক ধরনের শিহরণ অনুভব করে।
নিহন হেলিকপ্টারের ভেতরে তাকাল, বড় হেলিকপ্টারের ভেতরে অনেকখানি ভোলা জায়গা, সুদৃশ্য কয়েকটা চেয়ার এবং ধবধবে সাদা টেবিল। দেয়ালে যন্ত্রপাতির একটা প্যানেল। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ নিহন অন্যমনস্ক হয়ে যায়। হেলিকপ্টারটি উত্তর দিকে যাওয়ার কথা, এখন যাচ্ছে পূর্ব দিকে।
নিহন ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে জিজ্ঞেস করল, আমাকে তোমরা কোথায় নামাবে? তোমরা পূর্ব দিকে যাচ্ছ কেন?
মানুষটা কোনো কথা বলল না, তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। নিহন আবার জিজ্ঞেস করল, কোথায় নামাবে?
মানুষটির মুখে এবার মৃদু হাসি ফুটে ওঠে, সে আস্তে আস্তে বলে, তোমাকে কোথাও নামানো হবে না, ছেলে!
নিহন চমকে উঠল, বলল, নামানো হবে না?
না। তোমাকে আমরা নিয়ে যাচ্ছি।
কিন্তু কিন্তু
কিন্তু কী?
কাটুস্কা নামের ওই মেয়েটি যে বলেছিল আমাকে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছে।
মানুষটা বলল, কাটুস্কা তা-ই জানে।
তোমরা ওই মেয়েটিকে মিথ্যা কথা বলেছ?
মানুষটা শব্দ করে হাসল, যার সঙ্গে যেরকম কথা বলার প্রয়োজন তা-ই বলতে হয়। কাউকে বলতে হয় সত্যি কথা। কাউকে বলতে হয় মিথ্যা কথা। আর কাউকে বলতে হয় সত্য আর মিথ্যা মিশিয়ে।
তোমরা আমাকে নিয়ে কী করবে?
আমাদের জৈব ল্যাবে তোমাকে পরীক্ষা করা হবে।
কীভাবে পরীক্ষা করা হবে?
কাটাকুটি করে দেখবে মনে হয়
নিহন লাফিয়ে উঠতে গিয়ে আবিষ্কার করে তার হাতে-পায়ে কোনো জোর নেই। সে উঠতে পারছে না। এক ধরনের আতঙ্ক নিয়ে সে মানুষটার দিকে তাকাল-মানুষটা আবার তার দিকে তাকিয়ে হাসে, ফিসফিস করে বলে, নির্বোধ জলমানব, তোমার এখন ঘুমানোর কথা। তোমার পানীয়ের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে। স্নায়ুগুলো কাজ করার কথা নয়
নিহন আবিষ্কার করল, সত্যি-সত্যি তার শরীরের সব স্নায়ু শিথিল হয়ে আছে। সে নড়তে পারছে না। নিহন ঘোলা চোখে মানুষটার দিকে তাকিয়ে রইল, সে এখনো কিছুই বিশ্বাস করতে পারছে না। ধীরে ধীরে তার চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে আসতে থাকে। নিহন ঠিক করে চিন্তা করতে পারছিল না। তার মনে হতে থাকে, কোনো কিছুতেই আর কিছু আসে যায় না।
০৭. নিহনের জ্ঞান ফিরে আসে
খুব ধীরে ধীরে নিহনের জ্ঞান ফিরে আসে। তাকে একটা শক্ত টেবিলে শোয়ানো হয়েছে। তার হাত-পা এবং মাথা শক্ত করে বাঁধা, শরীরটুকু সে নাড়াতে পারছে না। তার আশপাশে কিছু মানুষ আছে, তারা নিচু গলায় কথা বলছে। নিহন চোখ না খুলে তাদের কথা শোনার চেষ্টা করল। মোটা গলায় একজন বলল, তুমি নিশ্চিত এই জলমানবের শরীরে কোনো ভাইরাস নাই।
