নিহন নামটি বলতে গিয়ে থেমে যায়, কেন এই মেয়েটিকে তার নাম বলতে হবে? একটা পত্তকে মানুষ যেভাবে বেঁধে রাখে ঠিক সেভাবে শেকল দিয়ে তাকে বেঁধে রেখেছে, অথচ তার সঙ্গে মেয়েটা কথা বলছে খুব স্বাভাবিক একটা ভঙ্গিতে।
মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, তুমি আমার কথা বুঝতে পারছ?
হ্যাঁ। নিহন মাথা নাড়ল, বলল, বুঝতে পারছি।
মেয়েটি এবার হেসে ফেলে বলে, তুমি কী বিচিত্রভাবে কথা বল!
নিহন কোনো কথা না বলে নিঃশব্দে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটি বলল, আমার নাম কাটুস্কা।
নিহন এবারও কোনো কথা বলল না। মেয়েটি বলল, একজন যখন তার নাম বলে তখন অন্যজনকেও তার নাম বলতে হয়।
নিহন বলল, একজন যখন গুলি করে তখন কি অন্যজনকেও গুলি করতে হয়?
নিহনের কথাটা বুঝতে কাটুস্কা নামের মেয়েটির একটু সময় লাগল, যখন বুঝতে পারল তখন হঠাৎ করে তার মুখটি একটু বিবর্ণ হয়ে যায়। কাটুস্কা এক পা এগিয়ে এসে বলল, আমি খুব দুঃখিত। আমি-আমি-আমি ভেবেছিলাম
কী ভেবেছিলে?
আমি ভেবেছিলাম তোমরা অন্য রকম।
সেজন্য তোমরা আমাদের গুলি করে মারতে চাইছিলে?
কাটুস্কা নিঃশব্দে নিহনের দিকে তাকিয়ে রইল। নিহন বলল, তোমরা দেরি করছ কেন? কখন মারবে আমাকে?
আসলে
আসলে কী?
এই পুরো ব্যাপারটা আসলে একটা খুব বড় ভুল।
নিহন মাথা নাড়ল, বলল, না এটা ভুল না। আমি জানি আমাদের গুলি করে মারা তোমাদের জন্য এক ধরনের খেলা তোমরা সেই খেলা খেলতে এসেছ।
কাটুস্কা কোনো কথা বলল না। তার মুখটি আবার বিবর্ণ হয়ে যায়। নিহন বলল, তোমরা খেলা শেষ করবে না?
কাটুস্কা মাথা নাড়ল, বলল, না। আমরা খেলা শেষ করব না।
নিহন একটু অবাক হয়ে মেয়েটির দিকে তাকাল। বলল, সত্যি তোমরা খেলা শেষ করবে না?
কাটুস্কা মাথা নাড়ল। বলল, না।
কেন না?
অনেকগুলো কারণ আছে। তার মধ্যে একটা হচ্ছে- কাটুস্কা হঠাৎ থেমে যায়।
নিহন সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে কাটুস্কার দিকে তাকাল। কাটুস্কা একটু হেসে বলল, কারণটা হচ্ছে আমি আমার জীবনে তোমার মতো সুন্দর কোনো মানুষ দেখি নাই! এত সুন্দর একজন মানুষকে কিছু করা যায় না।
নিহন এ ধরনের একটা কথার জন্য প্রস্তুত ছিল না, সে থতমত খেয়ে বলল, আমি সুন্দর মানুষ না। আমাদের দ্বীপে আমার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর মানুষ আছে।
থাকতে পারে। কিন্তু আমি তোমার মতো সুন্দর মানুষ আগে কখনো দেখি নাই।
নিহন কী বলবে বুঝতে না পেরে বলল, তুমিও অনেক সুন্দর।
কাটুস্কা খিলখিল করে হেসে বলল, আমার সঙ্গে তোমার ভদ্রতা করতে হবে না। আমি কী রকম আমি জানি।
নিহন কী বলবে বুঝতে না পেরে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। কাটুস্কা বলল, আজকে আমরা যেটা করেছি সেটা খুব বড় একটা নির্বুদ্ধিতা ছিল।
এখন তা হলে কী করবে?
তোমাকে চলে যেতে দেব।
নিহন অবাক হয়ে বলল, সত্যি?
হ্যাঁ, সত্যি।
নিহন একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমি বিশ্বাস করি না।
তুমি বিশ্বাস কর না?
না।
কেন বিশ্বাস কর না?
আমরা পানিতে থাকি। সমুদ্রের পানিতে কিছু ভয়ঙ্কর প্রাণী থাকে, নৃশংস আর হিংস্র। কিন্তু আমরা জানি স্থলমানবেরা তার চেয়েও বেশি নৃশংস আর হিংস্র।
কাটুস্কা অবাক হয়ে নিহনের দিকে তাকিয়ে রইল। নিহন বলল, আমরা জানি কোনো টাইফুন আমাদের নিশ্চিহ্ন করবে না। যদি আমাদের কখনো কেউ নিশ্চিহ্ন করে দেয়, সেটা হবে তোমরা। স্থলমানবেরা।
কাটুস্কার মুখে হঠাৎ বেদনার একটা ছায়া পড়ল। সে তার ঠোঁট কামড়ে ধরে রেখে বলল, এটা সত্যি নয়। তুমি আমাকে বিশ্বাস কর, আমি তোমাকে তোমার নিজের এলাকায় যেতে দেব! দেবই দেব।
কাটুস্কা একটু সরে গিয়ে তার যোগাযোগ মডিউলটা বের করে তার বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করল, ছোট স্ক্রিনে বাবার ছবিটা ফুটে উঠতেই তার দিকে তাকিয়ে বলল, বাবা।
কী হল, কাটুস্কা! তোমাদের সমুদ্রের অ্যাডভেঞ্চার কেমন হচ্ছে?
আমি যে রকম ভেবেছিলাম সে রকম না।
কেন, কাটুস্কা?
একটা নিঃশ্বাস ফেলে কাটুস্কা বলল, আমি ভেবেছিলাম জলমানবেরা হবে মানুষের অপভ্রংশ। তারা দেখতে হবে ভয়ঙ্কর। বীভৎস। হিংস্র।
তারা তা হলে কী রকম?
তারা অপূর্ব সুন্দর, বাবা। তারা গ্রিক দেবতা থেকেও সুন্দর।
কাটুস্কার বাবা প্রতিরক্ষা দপ্তরের প্রধান রিওন কোনো কথা না বলে শিস দেওয়ার মতো একটা শব্দ করল। কাটুস্কা বলল, জলমানবকে শিকার করা সম্ভব না।
ঠিক আছে। তা হলে চলে এস।
একটা ব্যাপার ঘটেছে, বাবা।
কী ঘটেছে?
আমরা সবাই মিলে একটা জলমানব ধরেছি।
কী বললে? রিওন অবিশ্বাসের গলায় বলল, জলমানবকে ধরেছ? জ্যান্ত ধরেছ?
হ্যাঁ, বাবা। এখন আমি তাকে ছেড়ে দিতে চাই।
ছেড়ে দিতে চাও?
হ্যাঁ, বাবা। তুমি যেভাবে হোক তার ব্যবস্থা করে দাও।
রিওন এক মুহূর্ত কী যেন ভাবল, বলল, তুমি কেন তাকে ছেড়ে দিতে চাও?
কারণ আমি তাকে কথা দিয়েছি। সে আমার কথা বিশ্বাস করে নাই। আমি তাকে দেখাতে চাই আমরা সত্যি কথা বলি।
ও আচ্ছা! রিওন আস্তে আস্তে বলল, তুমি জলমানবের সঙ্গে কথাও বলেছ?
হ্যাঁ, বাবা। জলমানবটি খুব শান্ত। খুব চমৎকার।
রিওন আবার বলল, ও আচ্ছা।
তুমি তাকে ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা কর।
ঠিক আছে। আমি একটা হেলিকপ্টার পাঠাচ্ছি। হেলিকপ্টারে করে জলমানবটাকে তার এলাকায় নামিয়ে দিয়ে আসবে।
সত্যি?।
হ্যাঁ, সত্যি।
বাবা, তোমাকে যে কী বলে ধন্যবাদ দেব।
