হ্যাঁ, গিয়েছিলাম।
তা হলে তখন শিকার করলে না কেন?
মাজুর থতমত খেয়ে বলল, মানে তখন-
কাটুস্কা হাসি গোপন করার চেষ্টা না করে বলল, তখন শিকার করতে পার নি। সত্যি কথা বলতে কী আরেকটু হলে এই জলমানবটাই তোমাকে শিকার করে ফেলত, মনে আছে? তোমাকে সে টেনে পানির ভেতর নিয়ে যায় নি? যদি তোমাকে ছেড়ে না দিত তা হলে কি তুমি এতক্ষণে পেট ফুলে পানিতে মরে ভেসে থাকতে না?
মাজুর মুখ শক্ত করে বলল, তুমি কী বলতে চাইছ, কাটুস্কা?
আমি বলতে চাইছি, এই জলমানবের কাছে তোমার কৃতজ্ঞ থাকার কথা যে সে তোমাকে মারে নি। তোমাকে মেরে ফেলার তার যথেষ্ট কারণ ছিল।
মাজুরের মুখে কুটিল এক ধরনের হাসি ফুটে ওঠে, সে হাসিটাকে তার মুখে আরো বিস্তৃত হতে দিয়ে বলল, এই জলমানব তার সুযোগ পেয়েছিল, সুযোগটা সে ব্যবহার করতে পারে নি। এখন আমি আমার সুযোগ পেয়ে আমি আমার সুযোগটা ব্যবহার করব।
কাটুস্কা মাথা নাড়ল, বলল, না।
মাজুর অবাক হয়ে বলল, না?
হ্যাঁ, তুমি একে মারতে পারবে না।
কেন পারব না?
কাটুঙ্কা বলল, কারণ আমি আমার জীবনে এর চাইতে সুন্দর কোনো মানুষ দেখি নি। তুমি তাকিয়ে দেখ, এর মুখমণ্ডল কী অপূর্ব। খাড়া নাক, বড় বড় কালো চোখ। উঁচু চিবুক। মাথা ভরা কুচকুচে কালো চুল-দেখ, সেটা ঘাড় পর্যন্ত নেমে এসেছে! এর শরীরটা দেখে মনে হয় কেউ যেন গ্রানাইট পাথর খোদাই করে তৈরি করেছে। শরীরে এক ফোঁটা মেদ নেই। দেখ, বুকটা কত চওড়া, শরীরে কী চমৎকার মাংসপেশি! তাকিয়ে দেখ, এর শরীরের ভেতর কী পরিমাণ শক্তি লুকিয়ে আছে। দেখে মনে হয় যেন সে একটা চিতাবাঘের মতো, যে কোনো মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে? তুমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখ মাজুর, তার হাতের আঙুলগুলো দেখ, লম্বা সুচালো, যেন একজন শিল্পীর হাত। দেখ, তার পা কত দীর্ঘ! তার কোমরটা দেখ, কেমন সরু হয়ে এসেছে। এই জলমানবটা একচিলতে কাপড় পরে আছে- দেখে কি মনে হচ্ছে না যার দেহ এত অপূর্ব তার এই একচিলতে কাপড়ই যথেষ্ট! তার এর চাইতে বেশি কাপড় পরে থাকা ঠিক নয়, তা হলে তার এই অসাধারণ সৌন্দর্য ঢাকা পড়ে যাবে। তাই কি মনে হয় না?
মাজুর হকচকিত হয়ে কাটুস্কার দিকে তাকিয়ে রইল। ইতস্তত করে বলল, তুমি কী বলতে চাইছ, কাটুস্কা?
আমি বলতে চাইছি, গ্রিক দেবতা থেকেও সুন্দর এই জলমানবের পাশে তোমাকে দেখাচ্ছে একটা কৌতুকের মতন! তুমি আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে দেখ মাজুর, ফোলা মুখ, ঢুলুঢুলু লাল চোখ! শুকনো দড়ির মতো লাল চুল। ঢিলেঢালা থলথলে শরীর। কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে আছ। তোমার মুখ রাগে-ঘৃণায় বিকৃত হয়ে আছে। অথচ এই জলমানবটির মুখের দিকে তাকিয়ে দেখ, সেখানে শিশুর মতো এক ধরনের নিষ্পাপ সারল্য–
মাজুর হিশহিশ করে বলল, তুমি কী বলতে চাইছ, কাটুস্কা?
আমি বলছি তুমি এই জলমানবকে হত্যা করতে পারবে না। তোমার মতন একজন অসুন্দর মানুষকে আমি এই অপূর্ব মানুষটিকে হত্যা করতে দেব না।
তুমি তাই মনে কর?
কাটুস্কা তার মুখে একটু হাসি ফুটিয়ে বলল, হ্যাঁ, আমি তাই মনে করি।
তুমি দেখতে চাও আমি একে হত্যা করতে পারি কি না?
আমার সাথে হম্বিতম্বি করার কোনো প্রয়োজন নেই, মাজুর। তুমি জান আমার বাবা নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান। আমি স্যাটেলাইট ফোনে বাবাকে একটু বলে দিলেই এখানে দুটো হেলিকপ্টার চলে আসবে। আমি তোমার প্রতি একটু বিরক্তি প্রকাশ করলেই তারা তোমাকে হাতকড়া লাগিয়ে নিয়ে যাবে।
মাজুরের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায়, সে নিচু গলায় বলে, তুমি কী বলতে চাইছ?
আমি বলছি তোমার নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে ভালো হবে আমাকে বিরক্ত না করা।
তু-তুমি আমাকে ভয় দেখাতে চাইছ?
এমনিতেই যদি আমার কথা শুনতে তা হলে আমার ভয় দেখানোর প্রয়োজন হত না মাজুর।
কাটুস্কা মাজুরের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে তার চোখে পানি এসে যায়। সে চোখের পানি মুছে বলল, মাজুর, তুমি এখন সরে যাও।
কেন?
আমি এখন এই জলমানবটার সঙ্গে কথা বলব।
কী বলছ তুমি, কাটুস্কা! তুমি-জান এরা কত ভয়ঙ্কর? কত নিষ্ঠুর?
আমার কাছে মোটেও ভয়ঙ্কর মনে হচ্ছে না। মোটেও নিষ্ঠুর মনে হচ্ছে না। বরং কী মনে হচ্ছে জান?
কী?
মনে হচ্ছে তুমি এর চেয়ে এক শ গুণ বেশি নিষ্ঠুর। এক শ গুণ বেশি ভয়ঙ্কর।
মাজুর হকচকিতের মতো কাটুস্কার দিকে তাকিয়ে রইল।
.
পায়ের শব্দ শুনে নিহন মাথা ঘুরিয়ে তাকাল-ঠিক তার বয়সী একটা মেয়ে কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। একটু আগে এই মেয়েটিও অন্যদের নিয়ে তাকে আর নাইনাকে গুলি করে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিল। কী ভয়ঙ্কর ছিল তার দৃষ্টি, চোখেমুখে কী আশ্চর্য রকম নিষ্ঠুরতা খেলা করছিল। এখন মেয়েটিকে দেখে মনে হচ্ছে একেবারেই কোমল স্বভাবের মেয়ে। চোখের দৃষ্টি নরম, ঠোঁটের কোনায় এক ধরনের হাসি। একটা মানুষ কেমন করে এক সময় এত ভয়ঙ্কর হতে পারে, আবার অন্য সময় এত কোমল চেহারার হতে পারে নিহন বুঝতে পারল না।
মেয়েটি কিছু একটা বলল, নিহন তার কথা ঠিক বুঝতে পারল না। ভাষাটি তাদের ভাষার মতোই তবে কথা বলার সুরটি অন্য রকম। নিহন সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে তাকাতেই মেয়েটি আবার কথা বলল। এবার নিহন কথাটি বুঝতে পারে, মেয়েটি বলছে, তোমার নাম কী?
