নিহন নাইনাকে ধরে রেখে বলল, নাইনা তুমি শুশুকে নিয়ে পালাও।
আর তুমি?
আমি পরে আসছি।
কীভাবে আসবে?
নিহন অধৈর্য হয়ে বলল, আমি তার ব্যবস্থা করব। তুমি এখন পালাও।
নিহন নাইনাকে শুশুর পিঠে বসিয়ে তার শরীরে খারা দিয়ে বলল, যাও। শুশু যাও।
শুশু মাথা ঘুরিয়ে বলল, তুমি?
আমি পরে যাব।
মানুষ খারাপ।
হ্যাঁ। নিহন মাথা নাড়ল, মানুষগুলো খারাপ। দেরি কোরো না, পালাও।
শুশু নাইনাকে নিয়ে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। নিহন এখন একা পানিতে ভেসে আছে। যে মানুষটি পানিতে পড়ে গিয়েছিল সে আবার তার সাগর-স্কুটারে উঠে দাঁড়িয়েছে। অন্য সবাই এখন এগিয়ে আসছে। নিহন বুকভরে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে পানিতে ডুবে যায়। ডুবসাঁতার দিয়ে সে পানির নিচে দিয়ে যেতে থাকে, ওপর দিয়ে সাগর-স্কুটারগুলো যাচ্ছে। শক্তিশালী প্রপেলরে পানি কেটে যাওয়ার সময় বাতাসের বুদুদে ওপরটুকু ঢেকে যাচ্ছে। ইঞ্জিনের গর্জনে পানি কেঁপে কেঁপে উঠছে।
নিহন পানির নিচে অপেক্ষা করে, ঠিক মাথার ওপর দিয়ে একটা সাগর-স্কুটার যাবার সময় সে লাফিয়ে নিচে থেকে সেটাকে ধরে ফেলে। স্কুটারটা সঙ্গে সঙ্গে কাত হয়ে যায়, নিহন টান দিয়ে নিজের শরীরটা স্কুটারের ওপরে তুলে নেয়। সাগর-স্কুটারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা হতচকিত হয়ে নিহনের দিকে তাকিয়ে আছে, নিহন তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে স্কুটারের নিয়ন্ত্রণটা নেওয়ার চেষ্টা করল। লাভ হল না, স্কুটারটা কাত হয়ে পানিতে পড়ে গেল। মানুষটা স্কুটার ধরার চেষ্টা করল, পারল না, হাত থেকে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রটা পড়ে গেছে পানিতে ডুবে গেছে সাথে সাথে। নিহন মানুষটিকে নিয়ে পানিতে পড়ে যায় মানুষটির শরীরে লাইফ জ্যাকেট তাই ভেসে উঠছিল, কিন্তু নিহন তাকে টেনে পানির নিচে নিয়ে যায়!
মানুষটি পানির নিচে নিঃশ্বাস নিতে পারছে না, চোখেমুখে ভয়ঙ্কর আতঙ্ক এসে ভর করেছে। নিহন দেখতে পায় তার নাক-মুখ দিয়ে কিছু বাতাসের বুদ্বুদ বের হয়ে আসছে। নিহন একবার নিঃশ্বাস নিয়ে যেরকম দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকতে পারে এই মানুষটি সেটা পারে না। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় মানুষটি ছটফট করছে বাতাসের জন্য, তার বুকটা মনে হয় ফেটে যাবে! নিহন এক ধরনের বিস্ময় নিয়ে এই অসহায় মানুষটির দিকে তাকিয়ে থাকে ইচ্ছে করলেই সে তাকে মেরে ফেলতে পারে। তাকে কি সে মেরে ফেলবে? এই নিষ্ঠুর মানুষটিকে কি মেরে ফেলাই উচিত না?
কিন্তু নিহন মানুষটিকে মারল না, শেষ মুহূর্তে তাকে ছেড়ে দিল। ছেড়ে দিতেই মানুষটি প্রাণপণে উপরে উঠে গিয়ে বুকভরে নিঃশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করতে থাকে। গলা দিয়ে পানি ঢুকে যায় আর সে খকখক করে কাশতে থাকে। নিহন নিজেও ধীরে ধীরে উপরে ভেসে আসে। অন্য স্থলমানবগুলো তাকে ঘিরে ফেলছে। সে তাকিয়ে থাকে, দেখে আরো বেশ কয়েকটি সাগর-স্কুটার আসছে। সেখানে আরো মানুষ, তাদের হাতে আরো অস্ত্র।
নিহন এক ধরনের ক্লান্তি অনুভব করে। হঠাৎ করে সে বুঝতে পারল সে এই স্থলমানবদের হাত থেকে পালিয়ে যেতে পারবে না। যে কোনো মুহূর্তে একঝক গুলি এসে তাকে ঝাজরা করে দেবে। তার সময় শেষ হয়ে এসেছে।
নিহন তবুও সাবধানে বুক থেকে একটা নিঃশ্বাস বের করে দেয়। নাইনাকে সে বাঁচিয়ে দিয়েছে। নাইনার মাকে কথা দিয়েছিল পাগলী মেয়েটিকে দেখে রাখবে, সে সেই কথা রেখেছে। নিহন পানিতে ভেসে ভেসে একঝাক গুলির জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।
» ০৬. নিজের হাতে হত্যা
মাজুর বলল, আমি এটাকে নিজের হাতে হত্যা করতে চাই।
মাজুর যাকে নিজের হাতে হত্যা করতে চাইছে সেই নিহনকে ইয়টের ডেকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। একজন মানুষকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখার মধ্যে এক ধরনের অবর্ণনীয় নিষ্ঠুরতা রয়েছে, যদিও এখানে কেউই সেই নিষ্ঠুরতাটুকু ধরতে পারছে না।
মাজুর তার হাতের অস্ত্রটি হাত বদল করে বলল, তোমরা নিশ্চয়ই আমাকে হত্যা করতে দেবে। দেবে না?
দ্রীমান জিজ্ঞেস করল, তুমি কেন একে হত্যা করতে চাইছ?
মাজুর একটু অধৈর্য হয়ে বলল, কেন চাইব না? আমরা কি জলমানব শিকার করতে আসি নি?
কিন্তু শিকার করার জন্য প্রাণীটাকে মুক্ত থাকতে হয়। দ্রীমান গম্ভীর গলায় ব্যাখ্যা করল, বেঁধে রাখা প্রাণীকে শিকার করলে সেটা তো খুন করা হয়ে যায়।
মানুষকে হত্যা করলে সেটা খুন হয়। মাজুর নিহনকে দেখিয়ে বলল, এটা তো মানুষ নয়।
দ্রীমান বলল, আমার কাছে তো বেশ মানুষের মতোই মনে হচ্ছে। মাজুর রেগে গিয়ে বলল, মানুষের মতো দেখালেই একজন মানুষ হয়ে যায় না।
তা হলে কখন মানুষ হয়?
যখন ক্রোমোজমে নির্দিষ্ট জিনসগুলো পাওয়া যায় তখন তাকে বলে মানুষ।
দ্রীমান জিজ্ঞেস করল, তুমি কি এই মানুষটির জিনসগুলো পরীক্ষা করে দেখেছ?
কী বলছ তুমি আবোল-তাবোল? মাজুর রেগে গিয়ে নিজের অস্ত্রটি হাতে নিয়ে বলল, আমি তোমাদের কোনো কথা শুনব না। দশ হাজার ইউনিট খরচ করে আমি এসেছি জলমানব শিকার করতে! আমি অন্তত একটা জলমানব শিকার না করে যাব না।
কাটুস্কা এতক্ষণ চুপচাপ দুজনের কথা শুনছিল, এবার সে কথা বলল, মাজুরকে জিজ্ঞেস করল, তোমাকে তো শিকার করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সাগর-স্কুটারে করে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিয়ে তুমি তো গিয়েছিলে শিকার করতে। যাও নি?
