কোথায় আসছে?
নিহন মাথা নাড়ল, বলল, জানি না। আমার মনে হয় আমাদের সরে যাওয়া উচিত।
নাইনা একটু অনুনয় করে বলল, একটু দেখি। আমি কখনো স্থলমানব দেখি নি।
তোমার ডলফিনের উপর উঠে বস। যদি পালাতে হয় যেন দেরি না হয়।
নাইনা কিকির উপর উঠে বসে। কিকি পানির উপর একবার লাফিয়ে ওঠার চেষ্টা করতে চাইল, কিন্তু নাইনা অনেক কষ্ট করে তাকে শান্ত করে রাখল।
নাইনা এবং নিহন একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে এবং দেখতে দেখতে চারজন স্থলমানব চারটা সাগর-স্কুটারে করে তাদের খুব কাছাকাছি চলে এল। নাইনা ফিসফিস করে নিহনকে বলল,দেখেছ, দুজন ছেলে দুজন মেয়ে।
হ্যাঁ।
নাইনা উত্তেজিত গলায় বলল, কী সুন্দর পোশাক দেখেছ?
দেখেছি।
ওদের হাতে কালো মতন ওটা কী?
নিহন বলল, আমি জানি না।
নাইনা বলল, দেখেছ ওরা কালো মতন জিনিসটা হাতে তুলে নিচ্ছে!
হ্যাঁ।
ওরা চারদিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে কেন?
নিহন বলল, ওরা আমাদের ঘিরে ফেলতে চেষ্টা করছে!
কেন? ওরা কেন আমাদের ঘিরে ফেলতে চাইছে?
হঠাৎ করে নিহনের কাছে পুরো ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে যায়, সে ভয়ার্ত মুখে নাইনার দিকে তাকিয়ে বলল, সর্বনাশ নাইনা! সর্বনাশ!
কী হয়েছে?
এই মানুষগুলো আমাদের মারতে আসছে।
নাইনা চমকে উঠে বলল, কী বলছ তুমি?
হ্যাঁ। নিহন লাফিয়ে শুর উপর উঠে বলল, পালাও! নাইনা, পালাও।
উত্তেজনায় শুশু নিহনকে নিয়ে পানি থেকে লাফিয়ে উঠে গেল এবং ঠিক তখন তারা। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের কর্কশ গুলির শব্দ শুনতে পেল। শিসের মতো শব্দ করে গুলিগুলো তাদের কানের কাছ দিয়ে ছুটে যায়। নিহন আতঙ্কিত চোখে নাইনার দিকে তাকাল, কিকির পিঠে বসে সে ছুটে পালানোর চেষ্টা করছে। পানি থেকে ভেসে উঠে সে আবার ডুবে গেল, আবার ভেসে উঠে আবার ডুবে গেল।
স্থলমানব চারজন তাদের সাগর-স্কুটার নিয়ে ছুটে যাচ্ছে, চলন্ত স্কুটার থেকে গুলি করা সহজ নয়, এক হাতে হ্যান্ডেলটা ধরে রেখে অন্য হাতে গুলি করতে হয়। গুলিগুলো তাই বেশিরভাগই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে যাচ্ছে। নিহন শুশুকে ধরে ফিসফিস করে বলল, সোজা যাও শুশু।
ভয়। শুশু ভয়।
কোনো ভয় নেই। আমি আছি।
তুমি আছ?
হ্যাঁ।
নাইনার পিছু পিছু দুজন স্থলমানব ছুটে যাচ্ছে, নিহন শুশুকে নিয়ে তাদের পিছু ছুটে যেতে থাকে। সাগর-স্কুটারের গতি খুব বেশি, ডলফিনকে নিয়ে সেটাকে ধরে ফেলা সম্ভব নয়। নিহন তবু চেষ্টা করল। স্কুটারে প্রপেলর থাকে ধারালো প্রপেলর সেখানে সাগলে সে কিংবা শুও জখম হয়ে যাবে, তাই খুব সাবধানে থাকতে হবে।
নিহন দেখল একজন স্থলমানব হাতের অস্ত্রটা ওপরে তুলেছে, গুলি করবে। নাইনাকে দেখা যাচ্ছে তার রক্তহীন, ফ্যাকাসে ভয়ার্ত মুখ। তার ডলফিনটাও অনভিজ্ঞ, কী করবে বুঝতে পারছে না, হঠাৎ করে পানি থেকে লাফিয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে। স্থলমানবটা ট্রিগার টেনে ধরতেই কান ফাটানো শব্দে গুলি বের হতে থাকে–নিহন তখন শুশুকে নিয়ে স্কুটারের। ওপর দিয়ে লাফিয়ে যায়, হ্যাঁচকা টান দিয়ে সে তার হাতের অস্ত্রটা টেনে নেওয়ার চেষ্টা করল। স্থলমানবটা এর জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না। তাল হারিয়ে সে পানিতে পড়ে যায়, নিয়ন্ত্রণহীন স্কুটারটা সমুদ্রের পানিতে গর্জন করে দুবার ঘুরপাক খেয়ে নিশ্চল হয়ে যায়। স্থলমানবটি পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে, অন্য একজন তখন তাকে সাহায্য করতে তার কাছে ছুটে আসতে থাকে।
নিহনের দিকে অন্য একজন স্থলমানব ছুটে আসছে-একটি মেয়ে, হাতের উদ্যত অস্ত্র তার দিকে তাক করে রেখেছে, চোখের দৃষ্টি কী ভয়ঙ্কর। নিহন সেই মেয়েটির দৃষ্টি দেখে হতবাক হয়ে যায়, এটি কি ক্রোধ, জিঘাংসা, নাকি ঘৃণা? সে কী করেছে? এই মেয়েটি কেন তাকে হত্যা করতে চায়? কেন তার জন্য এই ঘৃণা?
কানের কাছ দিয়ে গুলি ছুটে যেতে শুরু করেছে, নিহন শুশুকে নিয়ে লাফ দিয়ে মেয়েটির ওপর দিয়ে পার হয়ে গেল। প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ, সাগর-স্কুটারের ইঞ্জিনের কান ফাটানো গর্জন, পানির ঝাপটা তার মধ্যে হঠাৎ নিহন নাইনার আর্তচিৎকার শুনতে পায়। নাইনা কি গুলি খেয়েছে। এখন তা হলে কী হবে?
নিহন শুশুর পিঠে থাবা দিয়ে চিৎকার করে বলল, শুগু, নাইনার কাছে যাও।
যাই। নিহন যাই।
পানির নিচে ডুব দিয়ে শুশু নিহনকে নাইনার কাছে নিয়ে যায়, কাছাকাছি যাওয়ার আগেই সে পানির মধ্যে রক্তের গন্ধ পেল। নাইনা বিস্ফারিত চোখে কিকির দিকে তাকিয়ে আছে। নাইনা নয়, নাইনার ডলফিন কিকির শরীর গুলিতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। নিহন চাপা গলায় জিজ্ঞেস করল, নাইনা। কী হয়েছে?
কিকি! আমার কিকি!
ছেড়ে দাও কিকিকে। ছেড়ে দাও।
নাইনা অবুঝের মতো বলল, না। আমি ছাড়ব না। আমার কিকি মরে যাচ্ছে। মরে যাচ্ছে আমার কিকি।
নিহন ধমক দিয়ে বলল, ছেড়ে দাও। ছেড়ে দাও কিকিকে, তুমি তা না হলে বাঁচতে পারবে না।
নিহন হাত বাড়িয়ে নাইনাকে কাছে টেনে আনে, সঙ্গে সঙ্গে কিকি পানিতে ডুবে যেতে থাকে। এখন তারা দুজন মানুষ এবং একটা ডলফিন। তাদের বিরুদ্ধে চারজন মানুষ, তাদের কাছে আছে শক্তিশালী সাগর-স্কুটার, আছে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র। এই স্থলমানবদের সঙ্গে তারা কেমন করে পারবে? নিহন জোর করে মাথা থেকে চিন্তাটা সরিয়ে দেয়। কী হবে সে জানে না, কিন্তু যেভাবেই হোক নাইনাকে রক্ষা প্রতে হবে। নাইনার মা বিশ্বাস করে তার সঙ্গে নাইনাকে পাঠিয়েছে। যেভাবে হোক তার নাইনাকে রক্ষা করতে হবে। করতেই হবে।
