বৃদ্ধ ডিরেক্টর খনখনে গলায় বলল, সেই বিষয়টি তোমার আগে চিন্তা করা উচিত ছিল মেয়ে। এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। তীর তোমার হাতের ধনুক থেকে ছুটে গেছে, এখন সেই তীরকে তোমার হাতে ফিরিয়ে আনতে পারবে না।
লানা অসহায়ভাবে নিউলাইট কোম্পানির বয়স্ক ডিরেক্টরদের দিকে তাকিয়ে রইল।
***
অ্যালার্মের শব্দ শুনে গভীর রাতে ফায়ার ব্রিগেডের চিফ মিশি ঘুম থেকে উঠে বসে। শহরের কোথাও আগুন লেগেছে। মিশি জানালার কাছে এসে পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকায়, শহরের দক্ষিণ দিকে আগুনের লাল আভা, মাঝে মাঝে আগুনের শিখাঁটিও দেখা যাচ্ছে। বছরের এই সময়টা শুকনো সময়, প্রতি বছরই বেশ কয়েকটা ছোটখাটো এবং অন্তত একটা বড় অগ্নিকাণ্ড হয়। মনে হচ্ছে এটা এ বছরের বড় অগ্নিকাণ্ড-মিশি আগুনের লাল আভাটির দিকে তাকিয়ে একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলল। দক্ষিণের ইউনিটগুলোকে এখনই চালু করে আগুনের কাছে পাঠাতে হবে।
মিশি ইউনিটগুলোর জরুরি সংকেতটি ব্যবহার করতে গিয়ে হঠাৎ করে আবিষ্কার করে যে জরুরি সংকেতটি মনে করতে পারছে না। কয়েকবার চেষ্টা করেও মনে করতে না পেরে মিশি হঠাৎ করে এক ধরনের আতঙ্ক অনুভব করে। তার কী হয়েছে? কেন সে এই অতি সাধারণ সংকেতটি মনে করতে পারছে না? মিশি তার ডেপুটির যোগাযোগ সংকেতটিও মনে করতে পারল না। কী আশ্চর্য!
মিশির স্ত্রী ঘুম থেকে উঠে ঘুম ঘুম চোখে মিশির দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি মাঝরাতে ঘরের মাঝখানে এভাবে দাঁড়িয়ে আছ কেন?
দক্ষিণে আগুন লেগেছে। কিন্তু কিন্তু—
কিন্তু কী?
আমি ইউনিটের জরুরি সংকেত মনে করতে পারছি না।
মনে করতে পারছ না? কী বলছ তুমি?
হ্যাঁ। ডেপুটির নাম্বারও মনে করতে পারছি না। নিরাপত্তা বাহিনী কেন্দ্রীয় যোগাযোগ-কিছুই মনে করতে পারছি না।
মিশির স্ত্রী ভীত চোখে বলল, কী বলছ তুমি? কী হয়েছে তোমার?
জানি না। আমি কিছুই মনে করতে পারছি না।
মিশির স্ত্রী স্বামীর হাত ধরে বলল, দাঁড়াও দাঁড়াও–তুমি আগেই এত ঘাবড়ে যেও। আমি ডাক্তারের সাথে কথা বলি।
এক মুহূর্ত পর মিশির স্ত্রী শূন্য দৃষ্টিতে মিশির দিকে তাকিয়ে বলল, কী আশ্চর্য! আমিও কিছু মনে করতে পারছি না।
সত্যি?
হ্যাঁ সত্যি। মিশির স্ত্রী বলল, শুধু ডাক্তারের নম্বর নয় কারো নম্বর মনে করতে পারছি না।
মিশি কাছাকাছি একটা চেয়ারে ধপ করে বসে বলল, তার মানে বুঝতে পারছ?
কী?
নেটওয়ার্ক ফেল করেছে।
নেটওয়ার্ক ফেল করেছে! মিশির স্ত্রী আতঙ্কিত গলায় চিৎকার করে উঠল, কী বলছ তুমি?
হ্যাঁ। তা না হলে এতক্ষণে ওই আগুন নিভিয়ে দেয়ার কাজ শুরু হয়ে যেত।
কী হবে এখন?
মিশি কিছু বলার আগেই হঠাৎ করে ঘরের আলো নিভে গেল। মিশির স্ত্রী একটা চাপা আর্তনাদ করে মিশিকে আঁকড়ে ধরল। জানালা দিয়ে আগুনের লাল আভা ঘরের দেয়ালে বিচিত্র প্রায় অলৌকিক এক ধরনের আলো ছায়া তৈরি করেছে। সেদিকে তাকিয়ে থেকে মিশি চাপা গলায় বলল, আমাদের পৃথিবী মনে হয় এভাবেই ধ্বংস হয়ে যাবে।
বাইরে তখন অসংখ্য অসহায় মানুষের কোলাহল শোনা যেতে থাকে।
***
রাষ্ট্রপ্রধান শুকনো মুখে বিজ্ঞান আকাদেমির প্রধান প্রফেসর তাকিতাকে জিজ্ঞেস করলেন, এখন কী হবে প্রফেসর তাকিতা?
প্রফেসর তাকিতা মাথা নেড়ে বললেন, আমি জানি না।
রাষ্ট্রপ্রধান ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে বললেন, আপনি আমাদের বিজ্ঞান আকাদেমির প্রধান; আপনি বলতে পারেন না যে আমি জানি না।
পারি মহামান্য রাষ্ট্রপতি। প্রফেসর তাকিতা শুকনো গলায় বললেন, আমি বিজ্ঞান আকাদেমির প্রধান কারণ নেটওয়ার্কের বিজ্ঞান বিষয়ের সকল তথ্যে আমার অধিকার ছিল সবচেয়ে বেশি। এখন নেটওয়ার্ক নেই এখন আমার ভেতরে আর আপনার রান্নাঘরের বাবুর্চির ভেতরে খুব একটা পার্থক্য নেই। প্রফেসর তাকিতা তার হাতের কাগজটা রাষ্ট্রপ্রধানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, এই দেখেন আমি বেশ কিছুক্ষণ থেকে চার অঙ্কের একটা সংখ্যার বর্গমূল বের করার চেষ্টা করছি। পারছি না। আমার মস্তিষ্ক নেটওয়ার্কের সাহায্য নিতে নিতে এত অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল যে এখন আমি এই তুচ্ছ সমস্যাটাও নিজে সমাধান করতে পারছি না।
তার মানে কী?
তার মানে হচ্ছে যদি নেটওয়ার্ক আবার চালু না করা যায় তা হলে মানব সভ্যতার সমাপ্তি এখানেই।
রাষ্ট্রপ্রধান আতঙ্কিত গলায় বললেন, নেটওয়ার্ক আবার চালু করা না যায়-মানে কী? কেন এটা চালু করা যাবে না?
বিজ্ঞান আকাদেমির প্রধান তাকিতা তার চেয়ারটিতে হেলান দিয়ে বসে বললেন, নেটওয়ার্কটি কীভাবে আবার চালু করা যাবে সেই তথ্যটি আমাদের দিতে পারে শুধু এই নেটওয়ার্কটি। বলতে পারেন এটা এক ধরনের হেঁয়ালির মতো-নেটওয়ার্কটি চালু থাকলেই আমরা নেটওয়ার্ক চালু করতে পারব। এখন নেটওয়ার্ক চালু নেই তাই নেটওয়ার্কটি আবার কীভাবে চালু করা যাবে আমরা জানি না।
তার মানে এই নেটওয়ার্ক আর চালু হবে না?
না। এটা চালু করার মতো বুদ্ধিমত্তা আমাদের নেই। আমরা আমাদের মাথায় প্যারামন লাগিয়ে নিজের মস্তিষ্ক ব্যবহার করতে ভুলে গেছি। শুধু তাই নয় আমরা গত কয়েক প্রজন্ম প্যারামন লাগিয়ে পার করেছি– আমাদের মস্তিষ্কে নিউরনের সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। সিনান্স সংযোগ বলতে গেলে নেই। আমরা এখন আর সত্যিকার মানুষ নই মহামান্য রাষ্ট্রপ্রধান, আমরা এখন হচ্ছি অবমানব।
