বুড়ো ডিরেক্টর খনখনে গলায় জিজ্ঞেস করল, এই মেয়ে, বল দেখি আমার স্ত্রী কী করে?
মেয়েটি বুড়ো ডিরেক্টরের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনার স্ত্রী নেই। দুই বছর আগে মারা গেছেন।
বড় ছেলের নাম কী?
ক্লাড। একজন শিল্পী।
একজন মহিলা ডিরেক্টর জিজ্ঞেস করল, পরের মহাকাশ ফ্লাইট কবে আছে?
মঙ্গলবার। দুপুর তিনটা চৌত্রিশ মিনিট।
এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খবর কী?
তাতিস্কার প্রেসিডেন্টকে এই মাত্র গুলি করে মেরে ফেলেছে।
মেরে ফেলেছে নাকি? সত্যি?
হ্যাঁ সত্যি।
মধ্যবয়স্ক একজন বলল, পাইয়ের এক হাজার চারশত পঁচানব্বইতম সংখ্যাটি কী?
চার। তারপর এক নয় সাত তিন পাঁচ।
মানুষটি বিস্ময়ে শিস দেয়ার মতো একটা শব্দ করল, অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, তুমি কেমন করে এটা করছ?
মেয়েটা হাসার ভঙ্গি করে বলল, আমি কিছুই করছি না। আমি শুধু আপনাদের প্রশ্নটার উত্তর কী হতে পারে সেটা চিন্তা করছি এবং সাথে সাথে উত্তরটা জেনে যাচ্ছি। কীভাবে হচ্ছে সেটা আমি জানি কারণ সেটা আমাকে বলা হয়েছে, কিন্তু ব্যাপারটা যখন ঘটছে আমি বুঝতেও পারছি না। এটা করা হচ্ছে আমার অজান্তে।
অবিশ্বাস্য। অতি উৎসাহী একজন ডিরেক্টর হাততালি দিয়ে বলল, অবিশ্বাস্য!
লানা জিজ্ঞেস করল, আপনারা কি লিনাকে আরো কিছু জিজ্ঞেস করতে চান?
ডিরেক্টরদের কয়েকজন মাথা নেড়ে বলল, না। আর কিছু জিজ্ঞেস করার নেই।
লানা ত্রিনাকে বিদায় দিয়ে ম্যানেজিং ডিরেক্টরকে জিজ্ঞেস করল, আপনারা কি আর কিছু জানতে চান?
ম্যানেজিং ডিরেক্টর বলল, না। আপাতত কিছু জানতে চাই না। তুমি বস। সে ডিরেক্টরদের দিকে তাকিয়ে বলল, আমরা এই মাসের শেষ থেকে এই যন্ত্রটি বাজারজাত করব। আমরা এর নাম দিয়েছি প্যারামন। প্যারামনকে নিয়ে চমৎকার কিছু বিজ্ঞাপন তৈরি করা হয়েছে আমি সেগুলোও আপনাদের দেখাব। আমার ধারণা প্রথম এক বছরে আমরা এক বিলিয়ন প্যারামন বিক্রি করতে পারব।
উপস্থিত ডিরেক্টররা আবার শিস দেয়ার মতো একটা শব্দ করল। ম্যানেজিং ডিরেক্টর বলল, এই হিসেবটি অত্যন্ত সতর্ক হিসেব। প্রকৃত সংখ্যাটি আরো অনেক বেশি হওয়ার কথা। আমার ধারণা আগামী পাঁচ বছরে পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষ এটা তাদের মাথায়। লাগিয়ে নেবে। আমরা সারা পৃথিবীতে একটা অসাধারণ বিপ্লব দেখার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছি।
বৃদ্ধ ডিরেক্টর লানার দিকে তাকিয়ে বলল, এই মেয়ে। তুমি এরকম একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার করেছ, তোমার নিশ্চয়ই খুব গর্ব হচ্ছে?
লানা মাথা নেড়ে বলল, না।
বৃদ্ধ ডিরেক্টর অবাক হয়ে বলল, কেন না?
আমি আমার যন্ত্রের এই মডেলটি নিয়ে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। প্রফেসর গ্রাউসের অনেক বয়স হয়েছে একটা ক্লিনিকে আছেন। কাউকে চিনতে পারেন না। আমি আমার যন্ত্রটির কথা তাকে বলেছি। তখন তিনি
লানা থেমে গেল। বৃদ্ধ ডিরেক্টর বলল, তখন তিনি কী?
লানা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, প্রফেসর গ্রাউস খপ করে আমার হাত ধরে বললেন, না-না-না। তুমি এটা কিছুতেই বাজারজাত কোরো না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেন? প্রফেসর গ্রাউস বিড়বিড় করে বললেন, তা হলে মানুষ এই যন্ত্রটার ওপর নির্ভরশীল হয়ে যাবে। নিজের মস্তিষ্ক ব্যবহার করবে না। মানুষের সৃজনশীলতা নষ্ট হয়ে যাবে। আমি বললাম, আমরা তো এখনো বাইরের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছি এখন কি আমাদের সৃজনশীলতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে? প্রফেসর গ্রাউস বললেন, এখন বাইরের নেটওয়ার্ক আমাদের সাহায্যকারী। তোমার যন্ত্র ব্যবহার করা হলে মূল মস্তিষ্ক হয়ে যাবে সাহায্যকারী আর নেটওয়ার্কটাই হবে আমাদের মূল মস্তিষ্ক।
লানা একটু থেমে বলল, আমি বাসায় ফিরে এসে বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করেছি। চিন্তা করে দেখেছি প্রফেসর গ্রাউস আসলে ঠিকই বলেছেন। এই প্যারামন আমাদের মস্তিষ্ককে ধীরে ধীরে অকেজো করে দেবে–আমরা নেটওয়ার্কের ওপর এত নির্ভরশীল হয়ে যাব যে নিজের মস্তিষ্ক আর ব্যবহার করব না।
বৃদ্ধ ডিরেক্টর সরু চোখে লানার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি কী বলতে চাইছ?
আমি প্যারামন বাজারজাত করতে চাই না।
ম্যানেজিং ডিরেক্টর হা হা করে হেসে বলল, এটা বাজারজাত করা হবে কি হবে না সেটা তোমার সিদ্ধান্ত নয় লানা। সেটা কোম্পানির সিদ্ধান্ত। তুমি কোম্পানির গবেষক হিসেবে তোমার কাজ করেছ। আমরা কোম্পানির ডিরেক্টর হিসেবে আমাদের কাজ করব।
লানা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, কিন্তু আমি তবু আপনাদের কাছে কাতর গলায়। অনুরোধ করতে চাই, প্যারামন বাজারজাত করবেন না। এটা বিজ্ঞানের একটা ছোট আবিষ্কার হিসেবে থাকুক। ল্যাবরেটরিতে এর প্রভাব নিয়ে গবেষণা হোক, কিন্তু পুরো মানবজাতিকে টার্গেট করে প্যারামনকে বাজারজাত করবেন না। দোহাই আপনাদের।
মধ্যবয়স্ক একজন ডিরেক্টর লানার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি একজন বুড়ো প্রফেসরের কথায় পুরো বিষয়টাকে নেতিবাচক হিসেবে দেখতে শুরু করেছ। আমরা এতজন ডিরেক্টর এটাকে মোটেও নেতিবাচক হিসেবে দেখছি না। আমরা মনে করি প্যারামন আমাদের মানসিক জগতে একটা যুগান্তকারী বিপ্লব বয়ে আনবে। আমরা সাধারণ মানুষও অসাধারণ মানুষ হয়ে উঠব।
লানা বলল, মানুষ বিবর্তনের মধ্য দিয়ে অসাধারণ হয়ে উঠুক। আমি কৃত্রিমভাবে জোর করে তাদের অসাধারণ হতে দিতে চাই না।
