অবমানব?
হ্যাঁ।
এখন পৃথিবীতে কী হবে?
নৈরাজ্য এবং বিশৃঙ্খলা। প্রথম কয়েক বছর রাজত্ব করবে অস্ত্রধারীরা। রোগ শোক অনাহারে বেশিরভাগ মানুষ মরে যাবে। মানুষজন তখন ছোট ছোট এলাকায় ভাগ হয়ে যাবে। নূতন নেতৃত্ব সৃষ্টি হবে-যার গায়ে জোর বেশি সে হবে নেতা। তারপর সম্পূর্ণ নূতন একটি সমাজ ব্যবস্থা তৈরি হবে। অবমানবের নূতন এক ধরনের সমাজ। আফ্রিকার জঙ্গলের গরিলাদের সমাজের মতো কিংবা বোনিওর ওরাং ওটানের সমাজের মতো কিংবা–
থামুন! রাষ্ট্রপ্রধান চিৎকার করে বললেন, আপনি থামুন।
প্রফেসর তাকিতা দুর্বলভাবে বললেন, আমি থামছি মহামান্য রাষ্ট্রপ্রধান। কিন্তু বাইরের পৃথিবী থেমে নেই। তাকিয়ে দেখুন। তারা কিন্তু এর মাঝে পিছনের দিকে যাত্রা শুরু করে দিয়েছে।
রাষ্ট্রপ্রধান জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন, দূরে আগুনের লেলিহান শিখা, কালো ধোঁয়া এবং মানুষের চিৎকার। ধীরে ধীরে এদিকে এগিয়ে আসছে।
***
গাছের বাকলের ছোট পোশাক পরা দুজন কিশোর-কিশোরী গাছের আড়ালে লুকিয়ে আছে। তাদের সুস্থ-সবল দেহ থেকে যেন জীবনের আভা ফুটে বের হচ্ছে। কিশোরটির হাতে একটা ধনুক, মেয়েটি ছোট একটা পাতায় কোনো একটা গাছের আঠা ধরে রেখেছে। ছেলেটি তার নিজ হাতে তৈরি তীরে গাছের আঠাটি লাগিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, কী মনে হয়? কাজ করবে?
কিশোরীটি মাথা নেড়ে বলল, আমি অনেক খুঁজে বের করেছি। একশবার কাজ করবে।
কিশোরটি তার ধনুকে তীর লাগিয়ে দূরে ঘাস খেতে থাকা হরিণটির দিকে তাক করল। তীর দিয়ে শরীর অবশ করিয়ে দেয়ার এই নূতন গাছের আঠাটি তারা পরীক্ষা করছে, সত্যি সত্যি এটা কাজ করবে কি না সেটা তারা এখনো জানে না। নূতন কিছু করার মাঝে সব সময়ই থাকে নূতন এক ধরনের উত্তেজনা। দুজনে গভীর আগ্রহ নিয়ে হরিণটির দিকে তাকিয়ে থাকে।
আমাজান অরণ্যের গভীরে পৃথিবীর মানুষের চোখের আড়ালে থেকে যাওয়া এই আদিবাসী মানুষেরা তখনো জানত না, পুরো পৃথিবীতে নূতন করে সভ্যতা গড়ে তোলার দায়িত্বটি তাদেরকেই নিতে হবে।
মস্তিষ্ক নামে সৃষ্টিজগতের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটির তারা কখনো অবমাননা করে নি।
মহাকাশযান টাইটুন
কন্ট্রোল প্যানেলের ওপর ঝুঁকে বসেছিল মহাকাশযান টাইটুনের কমিউনিকেশন অফিসার রাটুল। ক্যাপ্টেন রন তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, কোনো সমস্যা রাটুল?
না-ঠিক সমস্যা নয়। তবে
রাটুল বাক্যটা শেষ না করে থেমে গেল।
তবে কী?
যোগাযোগ এন্টেনাতে একটা সিগন্যাল আসছে।
কার সিগন্যাল?
সেইটাই বুঝতে পারছি না।
বুঝতে পারছ না মানে? এবারে ক্যাপ্টেন রন প্রথমবারের মতো কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে গেল। জিজ্ঞেস করল, কী বুঝতে পারছ না?
ডপলার শিফট দেখে মনে হচ্ছে আরেকটা মহাকাশযান এদিকে আসছে। কিন্তু সিগন্যালটা বুঝতে পারছি না। কোনো মাথামুণ্ডু নেই।
সম্ভবত এনক্রিপ্টেড। গোপনীয়তার জন্যে অনেক সময় করে।
উঁহু। কমিউনিকেশন অফিসার রাটুল বলল, আমি আমাদের মেগা প্রসেসর দিয়ে বিশ্লেষণ করেছি, তথ্যটাই দুর্বোধ্য।
দুর্বোধ্য?
হ্যাঁ। আমি শেষ পর্যন্ত সুপার কম্পিউটারে দিয়েছি, দেখি কিছু বের করতে পারে কি না।
ঠিক আছে। যদি কিছু জানতে পার আমাকে জানিও।
জানাব। নিশ্চয়ই জানাব।
ক্যাপ্টেন রন মহাকাশযান টাইটুনের যাত্রাপথ নির্দিষ্ট করার কাজে ব্যস্ত হয়ে কিছুক্ষণের জন্যে দুর্বোধ্য সিগন্যালের কথা ভুলে গিয়েছিল কিন্তু কমিউনিকেশন অফিসার রাটুল একটু পরেই আবার তাকে সেটা মনে করিয়ে দিল। সে এসে উত্তেজিত গলায় বলল, ক্যাপ্টেন রন, সুপার কম্পিউটারের বিশ্লেষণ শেষ হয়েছে।
শেষ হয়েছে?
হ্যাঁ।
কী আছে সিগন্যালে?
একটা বিপদগ্রস্ত মহাকাশযান সাহায্যের জন্যে সিগন্যাল পাঠাচ্ছে।
ও। ক্যাপ্টেন রন ভুরু কুঁচকে বলল, সাহায্যের জন্যে সিগন্যাল দুর্বোধ্যভাবে কেন পাঠাচ্ছে? সহজ কোডিংয়ে কেন পাঠাচ্ছে না?
আসলে মহাকাশযানটা সহজ কোডিংয়েই পাঠাচ্ছে আমাদের কাছে দুর্বোধ্য মনে হচ্ছে।
ক্যাপ্টেন রন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কমিউনিকেশন অফিসার রনের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি কী বলতে চাইছ?
এটা আমাদের কোনো মহাকাশযান নয়। এটা মহাজাগতিক কোনো প্রাণীর মহাকাশযান।
ক্যাপ্টেন রন চমকে উঠে বলল, কী বলছ তুমি?
আমি ঠিকই বলছি ক্যাপ্টেন। আপনি এলেই দেখতে পারবেন। সুপার কম্পিউটারের প্রথমবার অর্থ বের করতে সময় লেগেছে। এখন আর সময় লাগছে না। আমরা কি তার সাহায্যের আবেদনে সাড়া দেব?
দাঁড়াও আমি নিজে একবার দেখে নিই।
ক্যাপ্টেন রনের সাথে সাথে মহাকাশযানের অন্য কুরাও যোগাযোগ মডিউলের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। দূরের মহাকাশযান থেকে যে সিগন্যালটি পাঠানো হয়েছে সেটা এরকম :
বাঁচাও আমাদের বাঁচাও। বিধ্বস্ত শক্তি ক্ষেপণ কেন্দ্র।
নিঃশেষিত রসদ। ধ্বংসের মুখোমুখি মহাকাশযান।
বাঁচাও আমাদের বাঁচাও।
ক্যাপ্টেন রন সাহায্যবার্তার দিকে তাকিয়ে বলল, তোমরা কেমন করে বুঝতে পারলে এটা মহাজাগতিক প্রাণীর সিগন্যাল।
পৃথিবীর কোনো মহাকাশযান থেকে এই সিগন্যাল পাঠালে আমাদের বিশ্লেষণ করতে কোনো সময় লাগত না। এটা আমাদের সিগন্যাল না।
এটা যেদিক থেকে আসছে সেদিকে আগে কখনো আমাদের কোনো মহাকাশযান গিয়েছে?
না যায় নি।
এই মহাকাশযানটা এখন আমাদের কাছ থেকে কত দূরে আছে?
