সবচেয়ে বয়স্ক ডিরেক্টর খনখনে গলায় বলল, তুমি তো দেখি এক ধরনের হেঁয়ালি ভরা কথা বলছ। কী মডেল কীসের মডেল কিছুই তো বুঝতে পারলাম না।
ম্যানেজিং ডিরেক্টর হাসি হাসি মুখে বলল, সেটা আপনাদের জানানোর জন্যে আজকে এখানে লানা এসেছে। ম্যানেজিং ডিরেক্টর লানার দিকে তাকিয়ে বলল, লানা। তুমি বল।
লানা উঠে দাঁড়িয়ে হলোগ্রাফিক প্রজেক্টরটা চালু করে বলল, আমি তখন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। আমাদের গণিতের একজন প্রফেসর ছিলেন, তার নাম প্রফেসর গ্রাউস। একদিন ক্লাসে আমাদের জিজ্ঞেস করলেন মানুষের মাঝে অন্য প্রাণীর পার্থক্য কোথায় আমরা সেটা জানি কি না। আমরা সবাই আমাদের মতো করে উত্তর দেবার চেষ্টা করেছিলাম-প্রফেসর গ্রাউস সেগুলো পুরোপুরি মানতে রাজি নন। তিনি বলেছিলেন মানুষের সাথে অন্য প্রাণীর পার্থক্য তার মস্তিষ্কের ব্যাপ্তিতে। অন্য সব প্রাণীর মস্তিষ্ক তার করোটিতে। মানুষের মস্তিষ্কের একটা অংশ তার করোটিতে বাকিটুকু বাইরের জগতে, নেটওয়ার্কে।
উপস্থিত ডিরেক্টরদের সবাই নিজেদের ভেতরে মৃদুস্বরে কথা বলতে শুরু করে। লানা বলল, আপনারা কেউ কি অস্বীকার করতে পারবেন, বাইরের নেটওয়ার্কের তথ্য ছাড়া আমরা কেউ এক মুহূর্ত বেঁচে থাকতে পারি না। এখন কয়টা বাজে? আজ কোথায় যেতে হবে? কীভাবে যেতে হবে? কী খাব? কী করব? কার সাথে কথা বলব? শরীর কি ভালো আছে? তালো না থাকলে কেন ভালো নেই? কোথায় জানাব? কীভাবে চিকিৎসা করাব? এরকম সব প্রশ্নের উত্তরের জন্যে আমাদের নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করতে হয়। লানা এক নিঃশ্বাসে অনেকগুলো কথা বলে একটু থেমে যোগ করল, আজকে যদি আপনাদের বলা হয় নেটওয়ার্কের সাহায্য না নিয়ে আপনাদের একটা দিন কাটাতে হবে–সারা পৃথিবীর একজন মানুষও সেটি পারবে না।
ডিরেক্টরদের বেশিরভাগই নিজের অজান্তেই মাথা নাড়ে। লানা তাদের দিকে তাকিয়ে বলল, আমরা ক্রমাগত তথ্যটুকু নেই নেটওয়ার্ক থেকে, সেগুলো বিশ্লেষণ করাই নেটওয়ার্ককে দিয়ে, সেগুলো ব্যবহার করি নেটওয়ার্ককে দিয়ে কিন্তু সেটা করতে হয় কোনো এক ধরনের ইন্টারফেসিং মডিউল দিয়ে। সেটা চোখ দিয়ে দেখতে হয় কান দিয়ে শুনতে হয়, হাত দিয়ে স্পর্শ করতে হয়। আমি তখন নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম যদি আমাদের জীবন পৃথিবীর নেটওয়ার্কের সাথে এত ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত হয়ে থাকে যে এটা আসলে মস্তিষ্কের একটা অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয় তা হলে কেন আমরা সত্যি সত্যি নেটওয়ার্ককে মস্তিষ্কের অংশ তৈরি করে ফেলি না?
বয়স্ক ডিরেক্টর খনখনে গলায় জিজ্ঞেস করল, তুমি কী বলতে চাইছ? কীভাবে নেটওয়ার্ককে মস্তিষ্কের অংশ করে ফেলবে?
লানা ভিডিও প্রজেক্টরে স্পর্শ করতেই পেছনের ত্রিমাত্রিক একটা যন্ত্রের ছবি ভেসে উঠল এবং সেটা ধীরে ধীরে ঘুরতে থাকে। লানা হাত দিয়ে সেটাকে স্পর্শ করে বলল, এই যন্ত্রটা দিয়ে। আপনাদের এটা বড় করে দেখানো হয়েছে। আসলে এটা খুবই ঘোট, মাথার চামড়ার নিচে ঠিক করোটির উপর বায়ো গ্লু দিয়ে আটকে দেয়া যায়। পুরো অপারেশন শেষ করতে সময় নেয় দশ মিনিট, মাথার চামড়ার ক্ষত সারতে সময় নেয় চব্বিশ ঘণ্টা। যন্ত্রটি চালু হয় এক সপ্তাহ পরে খুব ধীরে ধীরে। কয়েক সপ্তাহ পর যখন এটা পুরোপুরি চালু হয়ে যায় তখন মানুষের মস্তিষ্ক সরাসরি নেটওয়ার্কের সাথে যোগাযোগ করতে পারে।
বৃদ্ধ ডিরেক্টর আবার তার খনখনে গলায় বলল, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না তুমি কী বলছ!
লানা বলল, আমি একটা উদাহরণ দিই। মনে করুন আপনার মাথায় আমরা এই যন্ত্রটা লাগিয়েছি। কাজেই আপনি এখন সরাসরি নেটওয়ার্কের সাথে যোগাযোগ করতে পারবেন- আপনার মস্তিষ্ক যেটা করবে আপনি সেটা জানতেও পারবেন না। ধরা যাক আপনি আপনার স্ত্রীর সাথে যোগাযোগ করবেন কিন্তু তার ভিডি ফোনের নম্বর মনে করতে পারছেন না। আগে আপনাকে ইন্টারফেস খুলে নেটওয়ার্ক থেকে নম্বরটি নিতে হত। এখন আপনি বুঝতেও পারবেন না কিন্তু আপনার মস্তিষ্ক নেটওয়ার্ক থেকে নম্বরটি নিয়ে আসবে আপনি দেখবেন হঠাৎ করে নম্বরটি আপনি জেনে গেছেন!
তুলনামূলকভাবে কম বয়সী একজন ডিরেক্টর অবিশ্বাসের গলায় বলল, আমি এটা বিশ্বাস করি না।
লানা বলল, বিশ্বাস করার কথা নয়। কিন্তু এটা সত্যি। আমরা ফিল্ড টেস্ট করেছি। কয়েক হাজার মানুষের ওপরে পরীক্ষা করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরীক্ষা করতে দিয়েছে?
না, প্রথমে দেয় নাই।
তা হলে?
আমরা দরিদ্র দেশে গিয়ে সেই দেশের মানুষকে দিয়ে পরীক্ষা করেছি। পরীক্ষার ফলাফল দেখার পর আমাদের শেষ পর্যন্ত এই দেশে পরীক্ষার অনুমতি দিয়েছে। আমরা তখন আমাদের দেশেও তার ফিল্ড টেস্ট করেছি।
কী দেখেছ?
সেটা আমি নিজে না বলে সরাসরি দেখাতে চাই। মাথায় এই যন্ত্রটি বসানো হয়েছে এরকম একজন মেয়েকে আমি আপনাদের সামনে আনব। আপনারা তার সাথে কথা বলুন।
লানা ইঙ্গিত করতেই দরজা খুলে সোনালি চুলের একটা মোল-সতের বছরের মেয়ে ঘরে এসে ঢুকল, লানা হাত নেড়ে ডাকল, ত্রিনা, এদিকে এস।
ত্রিনা নামের মেয়েটা লানার কাছে এগিয়ে আসে। লানা মেয়েটার পিঠে হাত রেখে বলল, এ হচ্ছে ত্রিনা। ঠিক ছয় সপ্তাহ আগে তার মাথায় এই যন্ত্রটা বসানো হয়েছে। আমরা তাকে অভ্যস্ত হওয়ার জন্যে দুই সপ্তাহ সময় দিয়েছি। এখন তার মস্তিষ্ক সব সময়েই নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত। আপনারা তাকে যেভাবে খুশি প্রশ্ন করতে পারেন।
