ধারণাটা কী না বলে প্রফেসর গ্রাউস চুপ করে অনেকটা আপনমনে চিন্তা করতে থাকেন। ছাত্রছাত্রীরা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে এবং প্রফেসর গ্রাউস একটা বড় নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, আমার ধারণা মানুষ একমাত্র প্রাণী যে তার জ্ঞানটুকু মস্তিষ্কের বাইরেও রাখতে পারে।
প্রফেসর গ্রাউস ঠিক কী বলছেন বুঝতে না পেরে বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীই একটু ভুরু কুঁচকে তাকাল। প্রফেসর গ্রাউস বললেন, অন্য সব প্রাণীর বুদ্ধিমত্তাই থাকে তাদের মস্তিষ্কে। আমাদের বেলায় সেটা সত্যি নয়। আমরা যখন কিছু একটা জানি সেটা বইপত্রে লিখে রাখতে পারি। যার মস্তিষ্কে সেই জ্ঞানটুকু নেই সে বই থেকে সেটা শিখে নিতে পারে। কাজেই বলা যেতে পারে মানুষের কার্যকর মস্তিষ্ক শুধু তার মাথার করোটির মাঝে নেই সেটা বইপত্র লাইব্রেরি জার্নালে ছড়িয়ে আছে। একটি বানর এক গাছের ডাল থেকে অন্য গাছের। ডালে লাফ দেবার সময় তার নিজের মস্তিষ্কের ভেতরের তথ্য কিংবা জ্ঞানের ওপর নির্ভর করে। মানুষকে একটা ডাল থেকে অন্য ডালে লাফ দিতে হলে সে সেটা নিয়ে পড়াশোনা করতে পারে। নিউটনের সূত্র পড়ে সে ইচ্ছে করলে নিজের নিরাপত্তার জন্যে লাফ নাও দিতে পারে।
ধারালো চেহারার লাল চুলের একটা মেয়ে হাত তুলে জিজ্ঞেস করল, অধ্যাপক গ্রাউস-এই ব্যাপারটা আপাতদৃষ্টিতে অনেক ভালো মনে হয়। আপনি কি মনে করেন এর মাঝে কোনো বিপদ লুকিয়ে থাকতে পারে?
অধ্যাপক গ্রাউস মাথা নেড়ে বললেন, আমি খুবই খুশি হয়েছি যে তুমি এই প্রশ্নটা করেছ। আমি তোমাকে এই প্রশ্নটা করি, দেখি তুমি কী উত্তর দাও।
মেয়েটি ভুরু কুঁচকে কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করে বলল, আমি তো কোনো বিপদ লুকিয়ে থাকতে দেখছি না। আমাদের আগের প্রজন্ম আমাদের বয়সে যেটুকু জানত আমরা সেই একই বয়সে তাদের থেকে অনেক বেশি জানি। আমাদের আগের প্রজন্মের যেটুকু বিশ্লেষণী ক্ষমতা ছিল আমাদের বিশ্লেষণী ক্ষমতা তার থেকে অনেক বেশি। সারা পৃথিবী জোড়া নেটওয়ার্কে যে তথ্য আছে আমরা চোখের পলকে সেটা পেতে পারি, বিশ্লেষণ করতে পরি, আমাদের কাজে ব্যবহার করতে পারি। প্রফেসর গ্রাউস আমি এর মাঝে কোনো বিপদ দেখতে পাই না।
প্রফেসর গ্রাউস একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, আমি পাই।
ছাত্রছাত্রীদের অনেকেই এবারে সোজা হয়ে বসল, বসে তারা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে প্রফেসর গ্রাউসের দিকে তাকাল তার কথা শোনার জন্যে। প্রফেসর গ্রাউস নিচু গলায় বললেন, আমরা যদি ধরে নিই আমাদের মস্তিষ্ক দুই ভাগে বিভক্ত এক ভাগ আমাদের মাথার ভেতরে দ্বিতীয় ভাগ হচ্ছে পৃথিবীর লাইব্রেরি, জার্নাল কিংবা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নেটওয়ার্ক, তা হলে আমরা দেখব যতই দিন যাচ্ছে আমরা মস্তিষ্কের দ্বিতীয় ভাগ অর্থাৎ বাইরের অংশটুকুতে লাইব্রেরি, জার্নাল কিংবা নেটওয়ার্কে অনেক বেশি নির্ভর করতে শুরু করেছি। বাইরের জগৎ থেকে তথ্য নেয়া কিংবা সেই তথ্য বিশ্লেষণ করা যতই সহজ হয়ে যাচ্ছে দশ বিলিয়ন নিউরনের আমাদের এই মস্তিষ্কটাকে ততই আমরা কম করে ব্যবহার করছি।
প্রফেসর গ্রাউস একটু থামতেই ধারালো চেহারার মেয়েটি বলল, কিন্তু আমরা যদি এই . পদ্ধতিতেই আগের চাইতে বেশি সৃষ্টিশীল হতে পারি তা হলে কি সমস্যা আছে?
প্রফেসর গ্রাউস মাথা নাড়লেন, বললেন, না নেই। কিন্তু
প্রফেসর গ্রাউস আবার থেমে গেলেন এবং তার ছাত্রছাত্রীরা ধৈর্য ধরে তার কথা শোনার জন্যে অপেক্ষা করতে থাকে। প্রফেসর গ্রাউস বললেন, এখন পর্যন্ত বুদ্ধিমত্তাটুকু আমাদের মস্তিকে, বাইরের জগতে আছে তথ্য। বাইরের জগতে যেটুকু বুদ্ধিমত্তা আছে সেটা তুচ্ছ। কিন্তু এই তুচ্ছ বুদ্ধিমত্তা যদি কোনোভাবে বিকশিত হয়ে উঠে আমাদেরকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে আমরা খুবই অসহায় হয়ে পড়ব।
ধারালো চেহারার লাল চুলের মেয়েটি তার জ্বলজ্বলে চোখে বলল, সেটা কি কখনো হতে পারে?
প্রফেসর গ্রাউস মাথা নাড়লেন, বললেন, আমি জানি না।
***
নিউলাইট কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর উপস্থিত সব ডিরেক্টরদের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি আজ আপনাদের একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেবার জন্যে ডেকেছি।
ডিরেক্টরদের সবাই বয়স্ক, ম্যানেজিং ডিরেক্টরের কথায় নড়েচড়ে এক কোনায় বসে থাকা লাল চুলের মেয়েটির দিকে তাকাল। মেয়েদের বয়স সব সময় অনুমান করা যায় না, এই মেয়েটিরও বয়স অনুমান করা সম্ভব নয়–ত্রিশ থেকে পঞ্চাশের ভেতর যে কোনো একটা বয়স হতে পারে। এই মেয়েটি ডিরেক্টরদের কেউ নয়, কোম্পানির একজন সাধারণ গবেষক, ম্যানেজিং ডিরেক্টর যে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি দেবে তার সাথে এই মেয়েটির নিশ্চয়ই একটা ভূমিকা আছে।
ম্যানেজিং ডিরেক্টর হাত তুলে মেয়েটিকে দেখিয়ে বলল, গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি দেবার আগে আমি আপনাদের সাথে আমাদের গবেষক লানার পরিচয় করিয়ে দিই।
লানা তার জায়গায় বসে মুখে একটা হাসি ফুটিয়ে হাত নাড়ল। ম্যানেজিং ডিরেক্টর বলল, আজ থেকে সাত বছর আগে লানা আমার কাছে গবেষণার একটি বিষয় নিয়ে এসেছিল। আমার কাছে কখনো কোনো গবেষক সরাসরি আসে না। কিন্তু লানা এসেছিল তার কারণ তার ডিপার্টমেন্ট তার গবেষণার প্রস্তাবটি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছিল।
ম্যানেজিং ডিরেক্টর একটু হেসে বলল, আমারও সেই প্রস্তাবটি সরাসরি নাকচ করে দেয়া উচিত ছিল, কারণ প্রস্তাবটি ছিল অত্যন্ত উদ্ভট, আজগুবি এবং বিপজ্জনক। ঠিক কী কারণে জানি না আমি সেই উদ্ভট আজগুবি আর বিপজ্জনক প্রস্তাবটি অনুমোদন করে দিয়েছিলাম। লানা অত্যন্ত মেধাবী এবং পরিশ্রমী গবেষক, গবেষণা কাজের নেতৃত্ব দিতেও তার কোনো তুলনা নেই। চার বছরের মাথায় সে প্রথম প্রটোপাইপ তৈরি করেছে। ছয় বছরে ফিল্ড টেস্ট শেষ করেছে এবং এই সপ্তম বছরে তার একটা বাণিজ্যিক মডেল তৈরি হয়েছে। আমরা বাণিজ্যিক মডেলটি বাজারে ছাড়ার জন্যে প্রস্তুত এবং আজকে আপনাদের সবাইকে ডেকেছি তার ঘোষণাটি দেয়ার জন্যে।
