সেই কথা শুনে তারা হা হা করে হাসত। হেসে হেসে বলত, কে বলেছে আমি অনেক বড় কিছু হই নি। আমি আসলে অনেক বড় কিছু হয়েছি!
কেউই এ কথাগুলোর অর্থ ঠিক করে বুঝত না–কিন্তু সবাই অনুভব করত কথাগুলো সত্যি। অনেক বড় না হয়েও মানুষ কেমন করে অনেক বড় হয় সেটা নিয়ে সবাই একটু ভাবনায় পড়ে যেত।
কেমন করে এটা হল কেউই জানে না। অনেকে অনুমান করে সেই শৈশবে রিকির সাথে রক্ত শপথ করার সাথে এর একটা সম্পর্ক আছে। কী নিয়ে সেই রক্ত শপথ করা হয়েছিল সেটি কেউ কখনো জানতে পারে নি!
প্যারামন
অধ্যাপক গ্রাউস চতুর্মাত্রিক জগতের দ্বিঘাত সমীকরণটির সমাধান বের করতে করতে হঠাৎ করে থেমে গেলেন, তিনি মাথা ঘুরিয়ে তার ছাত্রছাত্রীদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা, তোমরা বলতে পারবে মানুষ পৃথিবীর অন্য জীবিত প্রাণী থেকে কোন দিক দিয়ে ভিন্ন?
চতুর্মাত্রিক জগতের দ্বিঘাত সমীকরণের সাথে এই প্রশ্নটির কোনো সম্পর্ক নেই কিন্তু তার ছাত্রছাত্রীরা সেটা নিয়ে মোটেও অবাক হল না। আপনভুলো এই বৃদ্ধ অধ্যাপক ক্লাসে পড়াতে পড়াতে মাঝে মাঝেই এরকম আনমনা হয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছুতে চলে যান। সেই ভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে করতে প্রায় সময়েই ক্লাসের সময় পার হয়ে যায়- আপনভুলোলা অধ্যাপকের সেটাও মনে থাকে না।
অধ্যাপক গ্রাউসের প্রশ্ন শুনে ছাত্রছাত্রীরা তাদের চেয়ারে নড়েচড়ে বসল। সামনের দিকে বসে থাকা চটুল ধরনের ছাত্রীটি বলল, চেহারা। অবশ্যই চেহারা। অন্য সব প্রাণীদের থেকে মানুষ দেখতে ভালো।
অধ্যাপক গ্রাউস হাসিমুখে বললেন, চেহারাটা আপেক্ষিক। আমাদের সবার চেহারা যদি বানরের মতো হত তা হলে সেটাকেই আমাদের ভালো মনে হত।
দার্শনিক ধরনের একজন বলল, একজন মানুষ যদি ভালো হয় তা হলে তার চেহারা খারাপ হলেও তাকে দেখতে ভালো লাগে।
অনেকেই তার কথায় সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়তে থাকে এবং আলোচনাটা মানুষের ভালোমন্দের দিকে ঘুরে যাবার উপক্রম হয়। প্রফেসর গ্রাউস আবার সবাইকে থামালেন, বললেন, আমি জানতে চাইছি-মানুষ কেমন করে অন্য প্রাণীদের থেকে ভিন্ন।
পিছনের দিকে বসে থাকা একজন বলল, ভাষা! মানুষের ভাষা আছে অন্য কোনো প্রাণীর ভাষা নেই।
প্রফেসর গ্রাউস মাথা নাড়লেন, বললেন, হ্যাঁ। তুমি এটা ঠিকই বলেছ। অন্যান্য প্রাণীদের কারো কারো খুব সহজ কিছু তথ্য আদান প্রদানের ব্যবস্থা আছে-কিন্তু মানুষের মতো কারো নেই। মানুষের ভাষা অত্যন্ত উঁচু মানের।
মাঝামাঝি বসে থাকা একজন ছাত্রী বলল, পশুপ্রাণীর ভাষা খুব সহজ তথ্য বিনিময়ের জন্যে ব্যবহার হয়-নিরাপত্তার জন্যে বংশবিস্তারের জন্যে।
এবারে অনেকেই পশুপাখির তথ্য বিনিময় নিয়ে কথা বলতে শুরু করে এবং আলোচনাটা আবার অন্য দিকে ঘুরে যাবার উপক্রম হয়। প্রফেসর গ্রাউস সবাইকে থামালেন, বললেন, আমি পশুপাখির ভাষা নিয়ে আলোচনায় যেতে চাই না আমি জানতে চাই মানুষ কোন দিক দিয়ে পশুপাখি থেকে ভিন্ন। অন্য জীবিত প্রাণী থেকে ভিন্ন।
কঠোর চেহারার একজন বলল, অন্য সকল জীবিত প্রাণী থেকে মানুষ অনেক বেশি নিষ্ঠুর। অন্য জীবিত প্রাণী কোনো প্রয়োজন না হলে একে অন্যকে হত্যা করে না, মানুষ প্রয়োজন ছাড়াও হত্যা করে। নিষ্ঠুরতা দেখায়। পশুতে পশুতে কখনো যুদ্ধ হয় না-মানুষে মানুষে যুদ্ধ হয়।
প্রফেসর গ্রাউস কঠোর চেহারার এই তরুণের কঠিন কথাগুলো শুনে কিছুক্ষণের জন্যে আনমনা হয়ে গেলেন। একটা নিঃশ্বাস ফেললেন এবং বললেন, তোমার কথার মাঝে খানিকটা সত্যতা আছে কিন্তু আমার মনে হয় তুমি মানুষকে একটু বেশি কঠোরভাবে বিচার করছ। মূল মানবগোষ্ঠী নিষ্ঠুর নয়–তার একটা বিচ্ছিন্ন অংশ নিষ্ঠুর। আমার ধারণা সেই মানুষগুলোকে বিশ্লেষণ করলে তার কারণটি বের হয়ে যাবে।
কঠোর চেহারার তরুণটি প্রতিবাদ করে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তার পাশে বসে থাকা কালো চুলের মেয়েটি তাকে বাধা দিয়ে বলল, প্রাণীদের সবাই বেঁচে থাকে তাদের সহজাত প্রবৃত্তি দিয়ে। মানুষ সহজাত প্রবৃত্তির ওপর নির্ভর করে না-মানুষ বেঁচে থাকার জন্যে তাদের শিখে থাকা জ্ঞানের ওপর নির্ভর করে।
প্রফেসর গ্রাউস সম্মতির ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন, বললেন, তুমি ঠিকই বলেছ। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় মানুষের ভেতরে তার সহজাত প্রবৃত্তি কতটুকু রয়ে গেছে সেটা পরীক্ষা করে দেখতে পারলে মন্দ হত না!
কালো চুলের মেয়েটি বলল, সেটি কেমন করে দেখা যাবে?
প্রফেসর গ্রাউস বললেন, সেটি দেখার সহজ কোনো উপায় নেই। আমরা মানুষের যে সমাজে বাস করি সেই সমাজ কখনোই একজনকে শুধু সহজাত প্রবৃত্তির ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকার মতো কাজে ঠেলে দেবে না।
প্রফেসর গ্রাউস অন্যমনস্কভাবে টেবিলে তার আঙুল দিয়ে শব্দ করছিলেন, তখন অস্থির ধরনের ছটফটে একজন তরুণী বলল, প্রফেসর গ্রাউস। আপনি কীভাবে একজন মানুষকে অন্য জীবিত প্রাণী থেকে আলাদা করেন?
আমি?
ছটফটে তরুণীটি মাথা নাড়ল, হ্যাঁ। আপনি।
প্রফেসর গ্রাউস হাসার ভঙ্গি করে বললেন, আমি চতুর্মাত্রিক জগতের গণিত পড়াই, এই বিষয়গুলো সম্পর্কে খুব ভালো জানি না। তোমাদের থেকে এই বিষয়গুলো সম্পর্কে বেশি জানি বলে মনে হয় না। তবে আমার ধারণা–
