১৭.
নীল একটা চেয়ারে বসেছে, সামনে আরো দুটো চেয়ার, তার একটাতে বসেছে রন। অন্যটাতে নিহা। নীল বেশ চেষ্টা করে মুখে একটা নির্লিপ্ত ভাব ধরে রেখেছে।
রন কঠিন গলায় বলল, নীল, তুমি এখন বল ঠিক কী হয়েছে।
কিছু হয় নি বাবা।
রন একটু উত্তেজিত হয়ে বলল, কিছু হয় নি মানে? তোমরা স্কুলের সব ছেলেমেয়ে পালিয়ে চলে গেলে, সারা দিন যতসব ভয়ংকর কাজ করে বেড়াচ্ছ। ন্যাশনাল সিকিউরিটি ব্যবহার করে তোমাদের খুঁজে আনতে হয়েছে আর তুমি বলছ কিছুই হয় নি?
তোমরা এত ব্যস্ত হলে কেন? আমরা সবাই তো ফিরে আসতাম।
কিন্তু তোমরা পালিয়ে গেলে কেন?
আমরা যেখানে গিয়েছিলাম, যার কাছে গিয়েছিলাম তোমরা কি আমাদের তার কাছে যেতে দিতে?
রন একটু থতমত খেয়ে বলল, আমাদের কাছে কি সেটা জিজ্ঞেস করে দেখেছ?
নীল এবারে খুক করে হেসে ফেলল। রন কঠিন গলায় জিজ্ঞেস করল, তুমি হাসছ কেন?
আমরা যে ছেলেটার কাছে গিয়েছিলাম তার নাম রিকি! রিকিকে ভাঁওতাবাজি করে আমাদের কাছে এনেছিল। কেন এনেছিল জান?
নিহা একটু অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসে বলল, কেন?
আমাদের দেখানোর জন্যে আমরা কত বুদ্ধিমান, সে কত বোকা! আমরা কী দেখেছি জান?
কী দেখেছ?
ঠিক উল্টোটা। আমরা কত বোকা আর রিকি কত বুদ্ধিমান।
নিহা আর রন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। নিহা ইতস্তত করে বলল, এটা হতে পারে না। তোমরা সবাই জিনেটিক ইঞ্জিনিয়ারদের দিয়ে ডিজাইন করা ছেলেমেয়ে। তোমাদের ভেতরে নানা ধরনের প্রতিভার জিন আছে।
নীল আবার খুক করে হেসে ফেলল। নিহা একটু থতমত খেয়ে বলল, তুমি হাসছ কেন?
তোমার কথা শুনে।
আমার কোন কথাটি শুনে তোমার হাসি পাচ্ছে?
এই যে বলছ আমাদের ভেতরে প্রতিভার জিন আছে!
নিহা একটু অবাক হয়ে বলল, এটা কি একটা হাসির কথা?
হ্যাঁ। নীল হাসি চেপে বলল, তোমরা জোর করে আমার ভেতরে ছবি আঁকার জিন ঢুকিয়ে দিয়েছ। কিন্তু মা, আমার ছবি আঁকতে ভালো লাগে না। আমি কখনো ছবি আঁকব না–তা হলে? এই জিন দিয়ে আমি কী করব?
নিহাকে কেমন যেন অসহায় দেখায়, সে কয়েকবার চেষ্টা করে বলল, তা হলে তুমি কী করবে ঠিক করেছ?
পুরোটা ঠিক করি নি। একটু একটু ঠিক করেছি।
রন এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল, এবারে কঠিন গলায় বলল, একটু একটু কী করবে ঠিক করেছ?
নীল হঠাৎ মুখ কঠিন করে বলল, সেটা বলা যাবে না।
কেন বলা যাবে না।
আমরা সবাই রক্ত শপথ করেছি।
কী করেছ?
রক্ত শপথ।
সেটা কী?
সবাই আঙুল কেটে রক্ত বের করে একটু শ্যাওলার ওপর লাগিয়ে শপথ করেছি। সেটা হচ্ছে রক্ত শপথ।
নিহা ছোট একটা আর্তচিৎকার করে বলল, হাত কেটে রক্ত বের করেছ? যদি ইনফেকশন হয়?
নীল তার মায়ের কথার কোনো উত্তর দিল না। রন থমথমে গলায় বলল, রক্ত শপথ ছাড়া আর কী কী করেছ?
আরো অনেক কিছু করেছি। কিন্তু সেগুলো শুনলে তোমরা ভয় পাবে, না হয় রাগ হবে, না হয় মন খারাপ করবে। কাজেই তোমাদের শুনাতে চাই না।
নিহা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, বাবা নীল। আমরা তোমার জন্যে এত কিছু করেছি আর তুমি এমন কাজ করছ যেটা শুনে আমরা ভয় পাব, রাগ হব না হয় মন খারাপ করব?
নীল তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, মা সে জন্যে কিন্তু আমি দায়ী না।
কে দায়ী? আমরা?
হ্যাঁ মা। তোমরা। বড় মানুষেরা আসলে ছোট বাচ্চাদের বুঝতে পারে না। তোমরা অনেক ভুল কাজ কর।
রন হঠাৎ করে রেগে উঠে বলল, আমার এই পুঁচকে ছেলের কাছে শুনতে হবে আমি তাদের ঠিক করে মানুষ করি না? আমি ভুল করি?
নীল তার বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, বাবা, আমরা আসলে পুঁচকে ছেলে না। তোমরাও সেটা জান। তোমরা আমাদের জিনোম পাল্টে দিয়ে আমাদের বড় মানুষ করে ফেলেছ। আমরা বড় মানুষের মতো কথা বলি, বড় মানুষের মতো চিন্তা করি। তোমরা কী কর কী ভাব আমরা সব বুঝতে পারি। আমরা এত ছোট বয়সে বড় মানুষ হতে চাই না। তোমরা আমাদের ছোট থাকতে দাও নি, জোর করে বড় মানুষ করেছ। উরুর কোম্পানি থেকে সার্টিফিকেট এনেছ।
নিহা নীলকে থামানোর চেষ্টা করে বলল, কিন্তু নীল-
নীলের চোখে হঠাৎ পানি এসে যায়। সে ভাঙা গলায় বলল, মা! আমরা সবাই ছোট বাচ্চা থাকতে চাই। জন্মের পরের দিনই আমরা বড় মানুষ হতে চাই নাই। তোমরা জোর করে আমাদের বড় মানুষ বানিয়ে দিও না।
রন এবং নিহা পাথরের মতো মুখ করে তাদের আশি পয়েন্টের বাচ্চার দিকে তাকিয়ে রইল।
১৮.
প্রতিভাবান বাচ্চাদের বিশেষ স্কুলের বাচ্চারা তাদের কোম্পানির দেয়া সিমুলেশন অনুযায়ী বড় হচ্ছিল। হঠাৎ করেই তাদের মাঝে বড় একটা বিচ্যুতি হল। তারা আর কেউই সেই সিমুলেশনের মাঝে আবদ্ধ রইল না। তাদের সবারই নিজের একটা জগৎ তৈরি হল যার সাথে কোম্পানির দেয়া সার্টিফিকেটের কোনো মিল নেই।
পৃথিবীর সবচেয়ে প্রতিভাবান এই শিশুগুলোর কেউই খুব বিখ্যাত হয়ে বড় হল না। তারা সবাই বড় হল খুব সাধারণ মানুষ হিসেবে। কেউ সমাজকর্মী, কেউ স্কুলের শিক্ষক, কেউ খুব একজন সাধারণ ডাক্তার। এই বাচ্চাগুলোর ভেতর একটা মিল ছিল। তারা সবাই ছিল হাসি-খুশি এবং আনন্দময়। তারা ছিল পরিশ্রমী, উৎসাহী আর উদ্যোগী। সাধারণ মানুষের জন্যে ছিল তাদের বুক ভরা ভালবাসা। যারাই তাদের কাছাকাছি এসেছিল তারাই কখনো না কখনো তাদের বলেছে, তুমি ইচ্ছে করলে অনেক বড় কিছু হতে পারবে!
