ওপর থেকে হঠাৎ নীলের গলার স্বর শুনে সবাই ওপরে তাকাল-গ্লাইডারটা খুব ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসছে-গাছের ডালে লেগে যেন গ্লাইডারের পাখাগুলো ভেঙে না যায় সে জন্য তারা পাহাড়ের ঢালটা বেছে নিয়েছে। খুব ধীরে ধীরে অতিকায় একটা পাখির মতো গ্লাইডারটা নেমে এল।
সবাই চিৎকার করতে করতে গ্লাইডারের কাছে ছুটে যেতে থাকে। গলা ফাটিয়ে সবাই বলতে থাকে, এবারে আমি! এবারে আমি! এবারে আমি!
.
হ্রদের তীরে একটা মোটা গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে সবাই দুপুরের খাবার সেরে নিল। প্রতিদিন খাওয়াটা তাদের জন্যে একটা মস্ত বিড়ম্বনা কিন্তু আজ তারা সবাই কাড়াকাড়ি করে খেল। পানির বোতলে মুখ লাগিয়ে ঢকঢক করে পানি খেয়ে একজন গা এলিয়ে বালিতে শুয়ে পড়ে বলল, আমি আর বাড়িতে যাব না! আমি এখানেই থেকে যাব।
তার দেখাদেখি আরো কয়েকজন বালিতে শুয়ে পড়ে বলে, আমরাও যাব না!
রিকি হেসে বলল, ঠিক আছে যেও না। থেকে যাও।
মাতিষা বলল, কিন্তু আমি ভেলায় উঠতে চাই। হ্রদের নিচে রহস্য নগরী দেখতে চাই।
হ্যাঁ, চল। রিকি বলল, আগে ভেলাটাকে ঠেলে পানিতে নামাতে হবে।
হ্রদের তীরে ঝোঁপঝাড়ে লুকিয়ে রাখা ভেলাটাকে টেনে বের করে সবাই মিলে সেটাকে ঠেলে ঠেলে পানিতে নামিয়ে নেয়। তারপর অকারণেই চিৎকার করতে করতে সবাই সেই ভেলার ওপর উঠে বসে। রিকি ধাক্কা দিয়ে ভেলাকে পানির গভীরে নিয়ে বুকে ভর দিয়ে ওপরে উঠে এল।
লাল চুলের মেয়েটি হ্রদের স্বচ্ছ পানিতে দিয়ে বলল, দেখেছ পানিটা কী চমৎকার। একেবারেই ঠাণ্ডা নয়!
রিকি মাথা নাড়ল, বলল, ওপরের পানি ঠাণ্ডা নয়। নিচে দেখ কী ঠাণ্ডা। একেবারে মাছের পেটের মতন।
সত্যি?
হ্যাঁ। চল আগে হ্রদের মাঝামাঝি যাই, নিচে যেখানে ঘরবাড়ি আছে সেখানে আমরা পানিতে নামব। দেখবে কী সুন্দর মনে হয় এক্ষুনি বুঝি কোনো ঘরের জানালায় একটা মৎস্যকন্যা এসে দাঁড়াবে!
কিয়া হিহি করে হাসতে হাসতে বলল, ইস! সত্যি সত্যি যদি একটা মৎস্যকন্যা পাওয়া যেত। তা হলে কী মজাই না হত। তাই না?
মাতিষা হ্রদের পানি হাতে নিয়ে নিজের মুখে ঝাপটা দিতে দিতে বলল, সেটা আর কঠিন কী? আমরা বাসায় না গিয়ে এইখানে পানিতে থাকি তা হলেই তো আমরা মৎস্যকন্যা। হয়ে যাব?
নীল বলল, মৎস্যকন্যা হওয়া এত সোজা নয়। মৎস্যকন্যাদের অর্ধেক হয় মাছের মতো!
মাতিষা বলল, কে বলেছে তোমাকে? অর্ধেক মাছের মতো না হলেও মৎস্যকন্যা হওয়া যায়। যে মাছের সাথে থাকে সেই হচ্ছে মৎস্যকন্যা!
ঠিক তখন একটা শুশুক তাদের পাশে তুশ করে ভেসে উঠে আবার পানির নিচে ডুবে গেল। পানির ঝাপটায় সবাই ভিজে গিয়ে চমকে ওঠে। রিকি বলল, এটা হচ্ছে শুশুক। আমি যখনই ভেলা নিয়ে আসি তখন আমার চারপাশে খেলা করে!
সত্যি?
হ্যাঁ। আমি একদিন এটার সাথে বন্ধুত্ব করব। তখন সে আমাকে পানির নিচে নিয়ে যাবে।
মাতিষা বলল, আমিও যাব! আমিও যাব!
ঠিক আছে, আগে বন্ধুত্ব করে নিই। এখনো শুকটা আমার বেশি কাছে আসে না, একটু দূরে দূরে থাকে।
কথা বলতে বলতে সবাই ভেলাটাকে ভাসিয়ে হ্রদের আরো গভীরে নিয়ে আসে। নিচে ডুবে যাওয়া বাড়িগুলো আবছা আবছা দেখা যায়। শ্যাওলা ঢাকা সবুজ বাসাগুলোর মাঝে এক ধরনের রহস্য লুকিয়ে আছে। বাচ্চাগুলো পালা করে নিচে নেমে দেখার চেষ্টা করে। চোখে গগলস নেই বলে পরিষ্কার দেখা যায় না-পানির ভেতর আবছা একটা রহস্যপুরীর মতো মনে হয়।
পানিতে অনেকক্ষণ ঝাপাঝাপি করে তারা যখন একবার ভেলার ওপর উঠে আসে তখন হঠাৎ করে দূরে হেলিকপ্টারের শব্দ শুনতে পায়। নীল হেলিকপ্টারগুলোর দিকে তাকিয়ে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, হেলিকপ্টার।
কিয়া নীলকে একটা ছোট ধাক্কা দিয়ে বলল, হেলিকপ্টার দেখে এত অবাক হচ্ছ কেন? তুমি আগে কখনো হেলিকপ্টার দেখ নি?
দেখব না কেন, দেখেছি। কিন্তু এই হেলিকপ্টারগুলোর একটা ব্যাপার আছে!
কী ব্যাপার?
এগুলো আমাদের খুঁজতে বের হয়েছে। মনে হয় আমাদের দেখে ফেলেছে। দেখছ এগুলো এদিকে আসছে।
সবাই আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে এবং সত্যি সত্যি হেলিকপ্টারগুলো হ্রদের ওপর দিয়ে তাদের দিকে উড়ে উড়ে আসতে থাকে।
লন একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ধরা পড়ে গেছি।
নীল গম্ভীর গলায় বলল, তোমরা সবাই এদিকে এস। তাড়াতাড়ি।
মাতিষা বলল, কেন নীল?
কিছুক্ষণের মাঝেই আমাদের সবাইকে ধরে নিয়ে যাবে। ধরে নেয়ার আগে আমি একটা জিনিস করতে চাই।
কী জিনিস?
রক্ত শপথ!
রক্ত শপথ?
হ্যাঁ, রক্ত শপথ?
কী নিয়ে রক্ত শপথ?
নীল গম্ভীর মুখে বলল, আমরা আজকে বুঝতে পেরেছি আমাদের জীবনটাতে আসলে ভুল হয়েছে। বড় মানুষেরা আমাদের নিয়ে অনেক বড় বড় অন্যায় করে। আমরা রক্ত শপথ করব যে যখন আমরা বড় হব তখন আমরা অন্যায় করব না।
সবাই গম্ভীর হয়ে বলল, করব না।
আমরা রিকির মতন হব।
রিকির মতন হব।
মাতিষা বলল, হেলিকপ্টার চলে আসছে। তাড়াতাড়ি রক্ত শপথ শুরু কর।
নীল বলল, এই যে ছোট চাকুটা দিয়ে সবাই আঙুলের ডগা থেকে এক ফোঁটা রক্ত বের করে এই শ্যাওলার ওপর রাখ। তারপর সবাই হাতে হাত ধরে বল-
ভেলাটার ওপর হেলিকপ্টারগুলো ঘুরপাক খেতে থাকে। হেলিকপ্টারে বসে থাকা ন্যাশনাল সিকিউরিটির একজন বড় কর্মকর্তা অবাক হয়ে দেখল বাচ্চাগুলো একে অপরের হাত ধরে চোখ বন্ধ করে কিছু একটা বলছে। কী বলছে সে শুনতে পেল না কিন্তু কথাগুলো নিশ্চয়ই খুব গুরুত্বপূর্ণ-তাদের চোখ-মুখ দেখেই সেটা বোঝা যাচ্ছে!
