“কে বলল আমি অন্ধ নয়?” ললিতনারায়ণ বেপরোয়াভাবে বললেন।
কিকিরা বললেন, “আপনি যে অন্ধ নন সেটা আজ স্পষ্ট হল। আরও যদি শুনতে চান–তা হলে বলব, আমি দূরবীন তাগ করে আগেই একদিন দেখেছি, আপনি আপনার মহলে ছাদে দাঁড়িয়ে কোনো চিঠি বা কাগজ পড়ছিলেন। তখনই আমার সন্দেহ হয়েছিল। আজ তা প্রমাণিত হল। আপনি যথেষ্ট চালাক। সন্দেহ এড়াবার জন্যে আগে থেকেই অন্ধ সেজেছেন।”
কিকিরা চেয়ার সরিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।
.
ঘরের মধ্যে এক অদ্ভুত অবস্থা। দীপনারায়ণ চমকে উঠেছিলেন। তারাপদ আর চন্দন কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে। ইন্দর যেন কোনো ভূত দেখেছে সামনে। শশধর কাঁপছিল।
দীপনারায়ণ রিভলভারটা তুলে নিলেন।
কেউ কোনো কথা বলছিল না।
ললিতনারায়ণ চোখের গগলস খুলে ফেললেন। বয়স হলেও তাঁর চেহারা। এখনও মজবুত। চোখ দুটি তীব্র দেখাল। বললে, “জয়কে কেউ খুন করেনি। সে অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছে।”
কিকিরা বললেন, “খুনের প্রমাণ আছে।”
“কী প্রমাণ?”
“দীপনারায়ণবাবু, ছোরার বাক্সটা একবার দেবেন?”
দীপনারায়ণ চেয়ারের তলায় ছোরার বাক্স রেখেছিলেন। সতর্ক চোখ রেখে বাঁ হাতে বাক্সটা তুলে দিলেন। চাবিও!
কিকিরা বাক্সটা নিলেন। চাবি খুলে ছোরার বাঁটটা বার করলেন। বললেন, “এর ফলাটা কে খুলে নিয়েছে ললিতনারায়ণবাবু?”
“ছোরার বাঁটটা আপনি চুরি করেও আবার সিন্দুকে রেখে এলেন কেন?”
ললিতনারায়ণ চুপ। দু হাতে মুখ ঢাকলেন। অনেকক্ষণ পরে বললেন, “ছোরাটা আমার ঘরে যে কদিন ছিল–আমি ঘুমোতে পারতাম না সারা রাত। ভয় করত। দুঃস্বপ্ন দেখতাম। জয় আমার পাশে-পাশে যেন ঘুরে বেড়াত। তা ছাড়া ইন্দর আমায় শাসাচ্ছিল। বলছিল, ছোরাটা তাকে দিয়ে দিতে। বিক্রি করে সে আমায় অর্ধেক টাকা দেবে। আমি ওকে বিশ্বাস করতাম না। ছোরার বাঁটটা পেলে ও পালাবে। কোনো উপায় না দেখে, মাথা ঠিক রাখতে–পেরে-বাক্সটা আবার দীপনারায়ণের সিন্দুকে রেখে আসি চুরি করে। আমার পাপ আমি স্বীকার করে নিচ্ছি।”
ললিতনারায়ণের দু চোখের তলা দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন মানুষটা।
১.৩ ঘোড়া সাহেবের কুঠি
০১.
তারাপদ অফিস থেকে মেসে ফিরতেই বটুকবাবুর সঙ্গে দেখা। বটুক বললেন, “ওহে, তোমার সেই ম্যাজিশিয়ান কিকিরা এসেছিলেন। আবার আসবেন। বলে গেছেন, তুমি যেন মেসেই থাকো।”
সামান্য অবাক হল তারাপদ। আজ সপ্তাহ দুই হল, কিকিরা কলকাতা-ছাড়া। দু-দুটো রবিবার তারাপদ আর চন্দন অভ্যেসমতন কিকিরার বাড়ি গিয়েছে, গিয়ে ফিরে এসেছে। কিকিরার দেখা পায়নি। কিকিরার বাড়ি গিয়েছে, গিয়ে ফিরে এসেছে। কিকিরার দেখা পায়নি। সর্বজ্ঞ বগলাচন্দ্রও কিছু বলতে পারল না। বরং মনে হল, বগলা খানিকটা চটেই রয়েছে কিকিরার ওপর। সংসারের যা কিছু বগলাই করবে–চণ্ডীপাঠ থেকে জুতো পালিশ, আর বগলাকে বিন্দুমাত্র কিছু না জানিয়ে একটা লোক বেপাত্তা হয়ে বসে থাকবে–এ কেমন কথা! বগলার কি ভাবনাচিন্তা হয় না! যাবার সময় বগলার হাতে কিছু টাকাপত্তর খুঁজে দিয়ে কিকিরা নাকি বলে গেছেন : “বন্ধুর বাড়ি যাচ্ছি। সাবধানে থাকবি। তারা আর চাঁদু এলে বলবি, দিন সাত-আট পরে ফিরব।”
সেই সাত-আট দিন পনেরো-ষোলো দিনের মাথায় গিয়ে ঠেকল। যাক্, কিকিরা ফিরে এসেছেন, নিশ্চিন্ত হওয়া গেল।
নিজের ঘরে গিয়ে তারাপদ জামা-প্যান্ট ছাড়ল। ছেড়ে সাবেকি লুঙ্গি জড়াল; তারপর সাবান আর গামছা নিয়ে নিচে নেমে গেল স্নান সারতে। আজ তার মন বেশ হালকা। একটা দিন আর, পরশু থেকে পুজোর ছুটি শুরু। আজই মাইনে পেয়ে গিয়েছে। অফিস-টফিসে কাজ করার সময় ছুটিছাটা পাওয়া যে কত আনন্দের, তারাপদর আগে জানা ছিল না। এখন জানছে। অবশ্য এ-সবই কিকিরার দয়ায়। কিকিরা বেছে-বেছে নিজে তদ্বির করে তারাপদকে এই চাকরিটা জুটিয়ে দিয়েছেন। বেসরকারি চাকরি, কিন্তু ভাল। ছোট অফিস। কোনো গোলমাল নেই। যাও, খাতা খুলে কলম ধরে হিসেবপত্র মেলাও, চা-সিগারেট খাও, ছুটি হলে বাড়ি ফিরে এসো ভালই লাগছে তারাপদর। সে স্বপ্নেও ভাবেনি, মাস গেলে শ’ ছয়েক টাকার মতন তার পকেটে আসবে! চাকরি পাবার প্রথম দিকে ভেবেছিল, টাকা যখন আসছে হাতে, তখন বটুকবাবুর মেস ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাবে। কিন্তু যাওয়া হল না। এতকাল থাকতে-থাকতে কেমন মায়া পড়ে গিয়েছে বটুকবাবুর মেসের ওপর, নিজের ওই হতকুৎসিত ঘরের ওপরেও। এক সময় বটুকের টাকার তাগাদায় তারাপদ কেঁচো হয়ে থাকত, এখন বটুককেই কেঁচো করে রেখেছে! না না, বটুকবাবু মানুষ খারাপ নয়, কথাবাতার ধরনটাই যা খরখরে। বটুকবাবু যদি মন্দ হতেন, তারাপদ কি তার দুর্দিনে টিকে থাকতে পারত। এই মেসে! না, তারাপদ নেমকহারামি করতে পারবে না বটুকবাবুর সঙ্গে। বটুকের জয় হোক।
নিচের শ্যাওলা-পড়া কলতলা থেকে স্নান সেরে “বটুকের জয় হোক” গাইতে গাইতে তারাপদ তার ঘরে ফিরে এল। ফিরে এসে মুখ মুছে চুল আঁচড়াচ্ছে, দরজায় পায়ের শব্দ শুনল। মুখ না ফিরিয়েই তারাপদ বলল, “আসুন, কিকিরা মশাই! কোথায় যাওয়া হয়েছিল, স্যার?
কোনো সাড়াশব্দ কানে এল না।
ঘুরে দাঁড়াল তারাপদ। দরজার সামনে বটুকবাবু দাঁড়িয়ে! হাসল তারাপদ। ও, আপনি! টাকা চাইতে এসেছেন?”
