চন্দন বলল, “কিকিরাকে আমি সে-কথা বলেছিলাম। উনি বললেন, হাতে হাত রাখা, পায়ে পা ছোঁয়ানো সবই ঠিক কিন্তু ওরই মধ্যে একটা ভেলকি আছে।”
“ভেলকি আছে বললেই তো চলবে না, তার প্রমাণ কী?”
“কোনো প্রমাণ নেই, মানে আমরা কাল ধরতে পারিনি। ওইভাবে ঘুটঘুঁটে অন্ধকারে বসিয়ে আত্মা নামালে লোকে সমস্ত ব্যাপারটায় এত অবাক হয়ে যায় যে, ভেতরে ভেতরে কী হচ্ছে খেয়াল করে না। মেয়েটা যদি কোনো চালাকি করে থাকে আমরা ধরতে পারিনি।”
“কোনো চালাকি করেনি,” তারাপদ বলল।
চন্দন একটু চুপ করে থেকে বলল, “ঠিক আছে। আজ যদি আবার ওই মেয়েটা আসে আমিও তক্কে তক্কে থাকব।”
“থাকিস।”
চন্দন বেশ বুঝতে পারল, তারাপদ তার মা-বাবার আত্মা আসার ব্যাপারটা বিশ্বাস করে নিয়েছে প্রায়। না, বন্ধুর সে দোষ ধরছে না। মানুষের এই দুর্বলতায় দোষ ধরা যায় না। কিকিরাও বলেছেন, ভুজঙ্গ তারাপদর দুর্বল জায়গায় ঘা মারছে, এই ঘা দিয়েই সে তারাপদকে বশ করবে, তাকে নিজের মুঠোয় এনে ফেলবে। চন্দন যে কেমন করে বন্ধুকে ভুজঙ্গর হাত থেকে বাঁচাবে বুঝতে পারছে না। কিকিরা বলেছেন, আপনি স্যার এখন থেকে আরও সজাগ থাকবেন, আরও নজর রাখবেন সব ব্যাপারে।
.
চন্দন আজ খুব সতর্ক থাকবে। আজ সে দেখবার চেষ্টা করবে কেমন করে আত্মা আসে, কেমন করে ঘন্টা বাজে। কিকিরা তাকে একটা জিনিস দিয়েছেন। ছোট্ট জিনিস, লুকিয়ে রাখা যায়। চন্দন আজ যখন ওপরের ওই ভুতুড়ে ঘরে যাবে–তখন জিনিসটা লুকিয়ে নিয়ে যাবে কাপড়ের মধ্যে। চন্দনের ইচ্ছে ছিল, ইনজেকশনের উঁচটা লুকিয়ে নিয়ে যাবার। যদি সে দেখত, বা তার সন্দেহ হত, আত্মার নাম করে আশেপাশে কেউ ঘোরাঘুরি করছে, তবে একবার উঁচটা ফুটিয়ে দিত গায়ে। আত্মা হলে নিশ্চয় ছুঁচ ফুটত না, বাতাসে কি আর ছুঁচ ফোটে? কিন্তু কোনো মানুষ হলে, সে যেমনই মানুষ হোক, আচমকা উঁচ ফুটলে উঃ করে উঠত। আর তখনই ব্যাপারটা জানা যেত। বোঝা যেত, ভুজঙ্গ আত্মা নামায় না মানুষ নামায়।
চন্দন বিছানায় শুয়ে এইসব ভাবতে লাগল, আর তারাপদ বসল দাড়ি কামাতে।
দাড়ি কামাতে কামাতে তারাপদ বলল, “চাঁদু, সাধুমামার সঙ্গে আজ আমার কথা হয়েছে।”
চন্দন তাকাল।
তারাপদ বলল, “সাধুমামাকে আমি দু-চারটে কথা জিজ্ঞেস করেছি–এমন সময় মৃত্যুঞ্জয়কে দেখতে পেলাম। বেশি কথা হল না। সাধুমামা কথা বলতে পারে–কিন্তু কেমন জড়িয়ে-জড়িয়ে। খুব কষ্ট হয়। সাধুমামা আমায় বলল, ভুজঙ্গ আমায় এইখানে আটকে রাখতে চায়। কেন বল তো?”
চন্দন বলল, “কিকিরাও তাই বললেন।”
“কিন্তু কেন?”
“ভুজঙ্গ মারা যাবার পর তুই আর-এক ভুজঙ্গ হয়ে থাকবি বলে।”
“আমি কেন ভুজঙ্গ হয়ে থাকব?”
“ভুজঙ্গই তোকে সে কথা বলবে। আমি কেমন করে জানব!”
.
সন্ধেবেলায় আবার সেই আত্মা-নামানোর ঘরে তারাপদরা এসে বসল। তেমনই অন্ধকার ঘর, মিটমিটে আলো জ্বলছে গুটি দুই, সেই একই ভাবে টেবিল-চেয়ার সাজানো, বাড়তির মধ্যে একটা নিচু ধরনের টেবিল ভুজঙ্গর কাছাকাছি রাখা, তার ওপর দু-একটা জিনিস; গোল বয়ামের মতন দেখতে।
তারাপদরা বসে থাকল তো বসেই থাকল। ঘরের সেই অন্ধকারে চোখ যেন নরম হয়ে আসছিল। গন্ধও আজ চমৎকার লাগছিল, কেমন একটা আবেশ আসছিল। হঠাৎ চন্দন উঠে পড়ে তারাপদকে তার চেয়ারে আসতে বলল । তারাপদ কিছু বুঝল না। কিন্তু চেয়ার বদল করল।
চন্দন ঘরের চারপাশ খুঁটিয়ে দেখবার চেষ্টা করতে লগল । পর পর তিন দিন এই ঘরে এল তারা। এখন খানিকটা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। প্রথম দিনের মতন অতটা গা ছমছম করে না। চন্দন দেখল, এই ঘরের বাইরে মন একরকম থাকে কিন্তু ঘরটায় ঢুকলেই ধীরে ধীরে কেমন যেন অন্যরকম হয়ে যায় । সেই বেড়ালটাকেও চন্দন দেখল। চোখের মণি দুটো জ্বলছে।
আরও খানিকটা পরে ভুজঙ্গভূষণ এলেন। তাঁর মাথার ওপরকার চোরা লাল আলো জ্বলে উঠল। ঘরের অন্য বাতি দুটো নিবে গেল সঙ্গে-সঙ্গে। ভুজঙ্গভূষণের একই বেশ : রক্তগৈরিক বসন, মুখের ওপর সেই মুখোশ, গলায় বিশাল রুদ্রাক্ষমালা। তিনি এসে বসার পর সেই কালকের মতন স্তোত্র পাঠ হল। গ্রামোফোন রেকর্ডে যে-ভাবে গান হয়, সেইভাবেই । এই ঘরের কোথাও এই গান-বাজাবার ব্যবস্থা আছে। ভেতর থেকে কেউ বাজায়, বন্ধ করে। যে বাজায় সে-ই বোধ হয় ঘরের আলো জ্বালায় । চন্দন আজ সমস্ত কিছু লক্ষ করতে লাগল।
স্তোত্রপাঠ শেষ হবার পর একেবারে স্তব্ধ সব। সেই স্তব্ধতা ভেঙে ভুজঙ্গভূষণ গম্ভীর স্বরে সংস্কৃতে কী-যে মন্ত্রপাঠ করলেন। তারপর তারাপদকে বললেন, “তারাপদ, তুমি কি তোমার মা বাবাকে আজ আবার ডাকতে চাও?”
তারাপদ সঙ্গে-সঙ্গে জবাব দিল, “হ্যাঁ।”
একটু থেমে ভুজঙ্গভূষণ বললেন, “কাল তুমি–” তোমরা যা করেছ তাতে বড় ক্ষতি হয়েছে। ওই মেয়েটি–যার মধ্যে তোমার মা-বাবার আত্মা এসেছিলেন–আচমকা তোমরা তার হাত থেকে হাত উঠিয়ে নেবার পর সে এক রকম অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। অনেকক্ষণ পরে তার জ্ঞান আসে। খুব দুর্বল হয়ে পড়েছিল। মিডিয়ামদের স্নায়ু হল সূক্ষ্ম তারের মতন–একটুতেই গোলমাল হয়ে যায়।”
তারাপদ লজ্জা পেল। বলল, “আমি নিজেকে সামলাতে পারিনি।”
“তোমার মা বাবার আত্মাও কষ্ট পেয়েছেন। তোমরা এখনকার মানুষ, তোমাদের বোঝার সাধ্য নেই এইভাবে আত্মাদের আসতে-যেতে কত কষ্ট হয়। ডাকলেই কি তাঁরা আসেন? না–না। অনেক সময় হাজার বার ডাকলেও আসেন না। আবার যখন আসেন, তখন তাঁরা নিজেরা না চলে যাওয়া পর্যন্ত বিদায় দিতে নেই, এতে তাঁদের আরও কষ্ট হয়। কাল তোমরা তাঁদের কষ্ট দিয়েছ। আজ তাঁরা আবার আসবেন কিনা আমি বলতে পারছি না।”
