বিনয়ভূষণ অবাক হয়ে বললেন, “কই, এরকম তো আগে শুনিনি। জুভেনাইল কোর্ট বলে একটা কী আছে শুনেছি। তা সে তো অন্য ব্যাপার।”
“কত কী আছে পাঁজামশাই, আমরা কি সব জানি? না, খোঁজ রাখি!”
মাথা নাড়লেন বিনয়ভূষণ। “আপনি বলতে চাইছেন ব্যাগটা সেখান থেকে পেয়েছেন?”
“আজ্ঞে, যথার্থ।”
“আমার জিনিসটা কই? সেই খাম–?”
“ফোটোর কথা বলছেন!” কিকিরা বললেন, “কী বলি আপনাকে বলুন তো! যে-বেটা ব্যাগ মেরে পালিয়েছিল সেই রাস্কেলটা ব্যাগের মধ্যে টাকা-পয়সা যা ছিল-পকেটে পুরে বাকি যা কাগজপত্র ছিল ছিঁড়ে দলা করে পাকিয়ে আঁস্তাকুড়ে ফেলে দিয়েছে।” কিকিরার বলার ধরনে ইতস্তত ভাব, একটু যেন কুণ্ঠা, সেভাবে গোছানো নয় কথাগুলো। এ-সবই তাঁর ইচ্ছাকৃত।
বিনয়ভূষণ কেমন বিহ্বল, হতবাক। মুখে কথা নেই। শেষে বললেন, “ফেলে দিয়েছে, আঁস্তাকুড়ে?”
“আজ্ঞে, চোরের আর কাগজপত্র কী কাজে লাগবে! টাকা যা পেয়েছে–নিয়েছে। কাগজ তো সোনাদানা ঘড়ি আংটি নয় যে, বাজারে বেচা যাবে! ফেলে দিয়েছে।”
সেই লোকটি আবার ঘরে এল। হাতে শ্বেতপাথরের বড় থালা। তিনটি গ্লাস, গ্লাসে শরবত। কাঁচের গ্লাস নয়, জার্মান সিলভারের গ্লাস। অল্প কারুকার্য গ্লাসের গায়ে।
শরবত এগিয়ে দিয়ে চলে গেল লোকটি।
বিনয়ভূষণকে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ মনে হচ্ছিল। তবু সৌজন্য দেখিয়ে কিকিরাদের শরবত খেতে বললেন।
তারাপদ অস্বস্তি বোধ করছিল। কিকিরা হয়তো ভুল করেছেন। এভাবে জড়িয়ে পড়া উচিত হয়নি তাঁর।
জহরও চুপ।
বিনয়ভূষণ হঠাৎ বললেন, কিকিরাকেই, “আপনি কি আমাকে একটা ঘেঁড়া পুরনো ব্যাগ দেখাতে এসেছেন! এর কোনও দরকার ছিল না।” বলে জহরের দিকে তাকালেন। মনে হল জহরের ওপর অত্যন্ত বিরক্ত হয়েছেন।
কিকিরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শেষে বিনীতভাবে বললেন, “আপনি অসন্তুষ্ট হয়েছেন। হওয়ারই কথা। কিন্তু আমি ঠিক ব্যাগ দেখাতে আসিনি। …একটা কথা আপনাকে বলে নিই। কিছু মনে করবেন না। অন্যের ব্যাপারে আমার অকারণ মাথা গলাবার অভ্যেস নেই। এখানে ব্যাপারটা অন্যরকম হয়ে গেল। পতাকীকে আমি অনেককাল ধরে চিনি। সে ভাল মানুষ, নিরীহ, গরিব। জহর সবই জানে।” শরবত খেলেন সামান্য কিকিরা। ঘরের চারপাশ তাকালেন একবার, তারপর বিনয়ভূষণকে বললেন, “সেদিন আমি নিজের চোখে যতটুকু দেখেছি তাতে মনে হয়েছে, মামুলি পকেটমারের কাজ ওটা নয়। পতাকীকে ট্রাম থেকে ফেলে দেওয়া, আর ওই ব্যাগ নিয়ে পালানোর একটা মতলব আগেই করা হয়েছিল। আমি যা করছি পতাকীর জন্যে করছি। অবশ্য জহরের জন্যেও খানিকটা।”
বিনয়ভূষণ আরও বিরক্ত হলেন। “কী বলছেন আপনি! ওই পতাকীকে কে ট্রাম থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিতে চাইবে! কেন? কাউকে চলন্ত গাড়ি থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেওয়া বিরাট অফেন্স। ও তো মারা যেতেও পারত।”
“আপনি ঠিকই বলেছেন। একাজ কে করল?”
“কে করল? মানে?”
“আপনি অনুমান করতে পারেন না?”
বিনয়ভূষণ থতমত খেয়ে গেলেন। “আমি! কী বলছেন মশাই, আমি কেমন করে অনুমান করব।”
কিকিরা বললেন, “কাউকে সন্দেহ হয় না!”
“কাজের কথা বলুন। না হয় আমায় ছেড়ে দিন। আমি বুড়ো লোক– এখন আমার বিশ্রামের সময়!”
কিকিরা সামান্য হাসলেন। “আপনার মায়ের ফোটো আমার কাছে আছে। যদিও সেটা ছেঁড়াফাটা, চটকানো৷ চিনে নিতে অসুবিধে হয়।”
“আপনার কাছে আমার মায়ের ফোটো আছে!” বিনয়ভূষণ যেন উঠে বসার মতন পিঠ সোজা করলেন। উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন।
“আপনার ব্যস্ত হওয়ার দরকার নেই, যা পাওয়ার আপনি পাবেন। তার আগে আপনি বলুন, আপনার মায়ের, বৃদ্ধা বিধবা মায়ের যে ফোটো আপনি প্রায় বছরদুয়েক আগে তুলিয়েছিলেন জহরকে দিয়ে, এতদিন পরে হঠাৎ সেটার জন্যে এত উতলা হয়ে উঠলেন কেন? কেন ওই ফোটো থেকে আরও বড় সাইজের একটা ছবি তৈরি করে দিতে বললেন?”
বিনয়ভূষণ কিকিরাকে দেখছিলেন একদৃষ্টে। প্রথমে তাঁর চোখমুখ দেখে মনে হল, অজানা অচেনা বাইরের একটা লোকের এই ধৃষ্টতায় তিনি অত্যন্ত বিরক্ত ও বিস্মিত। কী যেন বলতেও যাচ্ছিলেন, কিন্তু নিজেকে সংযত করলেন।
কিকিরা শান্তভাবে বললেন, “আপনি আমাকে ভুল বুঝবেন না।”
বিনয়ভূষণ কিছুক্ষণ কোনও কথা বললেন না। শেষে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন, “এসব আমার ব্যক্তিগত কথা। আমার মা…”
কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে কিকিরা বললেন, “আপনার মায়ের কথা আমরা কিছু কিছু জানি।”
“জানেন? কেমন করে?” বিনয়ভূষণ যেন বিশ্বাস করছিলেন না।
“খোঁজ নিয়েছি। উনি বীরভূমের ডুমুরগ্রামের জমিদার পরিবারের মেয়ে। কলকাতায় তাঁর বিবাহ হয়। এই বাড়ি তাঁর শ্বশুর বংশের, মানে এখন আপনার পৈতৃক বাড়ি।”
বিনয়ভূষণ মাথা নাড়লেন। “হ্যাঁ। ..সঠিক খবরই জোগাড় করেছেন।”
“আরও দু-একটা খবর বলতে পারি। এই বাড়ি ছাড়া কলকাতায় ও আশেপাশে যেসব সম্পত্তি আপনাদের এককালে ছিল এখন তা দেনার দায়ে হাতছাড়া। অবস্থা আপনাদের…”
“কী হবে শুনে! আমি নিজেই বলছি, এখন আমি ভিখিরি। অপচয় আর অহংকার আমার বাবার মাথায় ভুতের মতন চেপে বসেছিল। সেইসঙ্গে দুর্ভাগ্য। যাতে হাত দিয়েছেন ব্যর্থ হয়েছেন, টাকা-পয়সা জলে পড়েছে। …তা এসবই আমি আমার মন্দভাগ্য বলে মেনে নিয়েছি। …শুধু শেষ বয়েসে একটা জিনিস পারিনি।…শুনবেন সেকথা?”
