রবিবার সকালে অমিয়া পুলে গেল না। মেয়েরা চীৎকার করতে করতে যখন ঘরে ঢুকল, সে তখন একমনে চিঠি লিখছিল। মুখ না তুলেই বলল, ”হিয়ার তাহলে চারটে গোল্ড হল।’
”অমিয়াদি, দারুণ ব্যাপার, অঞ্জু একটুর জন্য ব্রোঞ্জ মিস করল।”
”অমিয়াদি, যোশিকে বিট করতে পারবে না?”
”অমিয়াদি, সবাই বলছে এখন তোমার ওপরই চ্যামপিয়নশিপ নির্ভর করছে। বাংলা—মহারাষ্ট্র এখন সমান পয়েন্ট।”
কোনির চটির স্ট্র্যাপ ছিঁড়ে গেছে। সে তখন একটা সেফটিপিন দিয়ে সেটাকে ব্যবহারযোগ্য করার চেষ্টায় ব্যস্ত। এইসব উত্তেজনা তাকে স্পর্শ করছে না।
অমিয়া লেখা বন্ধ করে বলল, ”চেষ্টা করব।”
জাতীয় সাঁতারের আজ শেষদিন। সন্ধ্যায় ছটি মাত্র অনুষ্ঠান। প্রথমটিই মেয়েদের ১০০ মিটার ফ্রি স্টাইল ফাইনাল। আটজন প্রতিযোগীর মাঝের লেনগুলিতে রমা, অমিয়া, হিয়া। আজ গ্যালারী উপচে পড়ছে। কোনি খালি পায়ে বসে। সেফটিপিনে চটিটাকে চলার যোগ্য করা যায়নি।
অমিয়া বন্দুকের শব্দের আগেই জলে পড়ল। দ্বিতীয়বার ফলস—স্টার্ট নিল মহারাষ্ট্রের সাধনা দেশপান্ডে এবং হিয়া। এরপর একসঙ্গেই আটজন জলে পড়ল বন্দুকের শব্দে। তিরিশ মিটারে দেখা গেল দুজন এগিয়েছে বাকিদের থেকে—রমা ও অমিয়া। তারপরেই প্রচণ্ডভাবে নিজেকে বিস্ফোরিত করে অমিয়া পিছনে ফেলল রমাকে। টার্ন নিয়েই সে রমার থেকে এক মিটার এগিয়ে গেছে। রমার কিছুটা পিছনে হিয়া, তার পাশেই সাধনা। হরিচরণ চীৎকার করতে করতে কুঁজো হয়ে পড়েছে।
একটা অস্ফুট কাতরানি শোনা গেল। অমিয়া জলে ভাসছে আর ছটফট করছে পেট চেপে ধরে। মুখটা যন্ত্রণায় বিকৃত।
”ক্র্যাম্প, ক্র্যাম্প ধরেছে।”
জলে লাফিয়ে পড়ল দুজন। ছুটে গেল বাংলার অফিসিয়ালরা। হরিচরণ কপালে হাত দিয়ে বসল। রমা যোশি তখন ফিনিশিং বোর্ড ছুঁয়েছে। তার পিছনে হিয়া এবং সাধনা।
মহারাষ্ট্র তিন পয়েন্ট এগিয়েছে। শেষ ইভেন্ট ৪×১০০ মিটার রীলেতে। সোনা জিতে ১০ পয়েন্ট আনতে না পারলে বাংলার চ্যামপিয়ন হওয়া সম্ভব নয়। এখন হিয়া ও রমা দুজনেরই চারটি সোনা। পয়েন্টে দুজনেই সমান হয়ে ব্যক্তিগত সোনা পাওয়ায় কে এগিয়ে যাবে, সেটাও নির্ভর করছে এই ইভেন্টের উপর।
আর আধ ঘণ্টার মধ্যেই চ্যাম্পিয়নশিপের শেষ অনুষ্ঠান মেয়েদের ৪×১০০ রীলে শুরু হবে। ছেলেদের ফাইনাল এইমাত্র শেষ হল।
অমিয়া মেডিক্যাল রুমের টেবলে শুয়ে। ঘরের বাইরে ধীরেন ঘোষ বিষণ্ণকণ্ঠে বলল, ”এত কাছে এসে ভরাডুবি হল। বাংলা তাহলে চ্যামপিয়নশিপটা পেল না, ভাগ্য, ভাগ্য!”
হরিচরণ থমথমে মুখে বলল, ”অমিয়া তো নামতে পারবে না, তাহলে রীলে টিমটা কি হবে? আর ক’মিনিট মাত্র সময় রয়েছে। হিয়া, পুষ্পিতা, বেলা…ফোর্থ মেয়ে কী হবে?”
”রিজার্ভে আছে অঞ্জু আর—” ধীরেন ঘোষ থেমে গেল। হরিচরণ একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে।
প্রণবেন্দু এবং আরো তিন—চারজন ব্যস্ত উত্তেজিত হয়ে হাজির হল।
”একি, আপনারা এখানে দাঁড়িয়ে! রীলে টিমের কি হবে, আর যে সময় নেই।” প্রণবেন্দু বলল।
”সেইটেই তো ভাবছি।”
”ভাবাভাবির কিছু নেই, কনকচাঁপা পালকে নামান, অমিয়ার জায়গায়।” একজন রুক্ষ স্বরে বলল।
”কিন্তু—”
”কিন্তু—ফিন্তু কিছু নেই ধীরেনদা। বেঙ্গলের এখনো একটা আউটসাইড চান্স আছে ওকে নামালে। অঞ্জু একদমই পারবে না।”
”আপনারা বসে বসে ভাবুন তাহলে, আমরাই ব্যবস্থা করছি।”
প্রণবেন্দু প্রায় ছুটেই চলে গেল। ধীরেন ঘোষ একদৃষ্টে সেদিকে তাকিয়ে থেকে তারপর আচমকা ঘুম ভাঙ্গা মানুষের মতো অনুসরণ করল প্রণবেন্দুকে। হরিচরণ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল।
কোনি যথারীতি গ্যালারিতে বসে। বাংলার মেয়েরা শুকনো মুখে অনিশ্চিত স্বরে নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করছে। পুরুষদের মেডলি রীলে ফাইনাল এবার শুরু হবে। প্রতিযোগীরা স্টার্টিং প্ল্যাটফর্মে আসছে।
”কোনি, কোনি!”
হাত নেড়ে প্রণবেন্দু এবং আরো কয়েকজন ডাকছে। কোনি বুঝতে পারল না, তাকেই ওরা ডাকল কিনা।
”কোনি তাড়াতাড়ি, কুইক।”
অবাক হয়ে কোনি তখনো বসে। ধীরেন ঘোষ হাত নাড়ছে তার দিকে। ”কোনি, আর সময় নেই, তোমায় নামতে হবে রীলেতে অমিয়াদির জায়গায়।” হিয়া গ্যালারীতে উঠে এসে ওর হাত ধরল।
শিরশির করে উঠল কোনির শরীর।
”আমি!”
”হ্যাঁ, হ্যাঁ তুমি। কস্ট্যুম পরে নাও।”
”না, আমি নামব না।” কোনি হাত সরিয়ে নিল।
”বেঙ্গল চ্যামপিয়ন হতে পারবে না।”
”তুমি বেঙ্গলকে ভালবাস না?”
”না, বাসি না।” কোনি মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকাল। বুকের থেকে উঠে আসা একদলা অভিমান ওর কণ্ঠে আটকে গেল। ”ভালবাসতে হয় তুমি বাসো। আমি গরীব, আমাকে দেখতে খারাপ, লেখাপড়া জানি না, কত কথা শুনলুম। কেউ আমার সঙ্গে কথা বলে না। জোচ্চচুরি করে আমাকে বসিয়ে রেখে এখন ঠেকায় পড়ে এসেছ আমার কাছে—”
হিয়া ঝুঁকে কোনির দুটো কাঁধ ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে দাঁত চেপে চাপাস্বরে বলল, ”আমি নিজের জন্য আসিনি। বেঙ্গলের হয়েই তোমাকে ডাকতে এসেছি।”
”না। এসেছ নিজের জন্য। তুমি নিজের জন্য আর একটা গোল্ড চাও, রমা যোশিকে—” কোনি থেমে গেল।
চড় মারার জন্য হিয়ার হাতটা উঠেছে। কোনিও হাত তুলেছে। ছোরার মতো চারটে চোখের প্রচণ্ড সংঘর্ষ স্ফুলিঙ্গ ছিটকে পড়ল। ধীরস্বরে হিয়া বলল ”কোনি তুমি আনস্পোরটিং।”
