অমিয়া সকলের আগেই ট্যাক্সি করে একা ক্যামপে ফিরে আসে। শনিবার সকালে হিয়ার দুটি হিট, মেডলি এবং ব্যাক স্ট্রোকের। সব মেয়ের চোখ এখন হিয়ার দিকে। গম্ভীর হয়ে গেছে সে। ধীরেন ঘোষ আজ আর বক্তৃতা দিল না। মাথা নেড়ে বলল, ”অমিয়ার মতো ভেটারেনের কাছ থেকে এমন ব্যাডলি জাজড রেস কেউ আশা করেনি। আমরা চার পয়েন্টে পিছিয়ে পড়লুম।”
”হরিচরণদা যদি অমিয়াদিকে একটু বলেও দিত!” বেলা ক্ষীণস্বরে বলল।
”যাকগে যা হবার হয়েছে। এখন অনেক কিছু হিয়ার উপর নির্ভর করছে। কাল সকাল দুটো হিট, রাতে মেডলির ফাইনাল। তোমরা ওকে কনসেনট্রেট করতে দাও।”
ধীরেন ঘোষ চলে যাবার পর সবাই হিয়ার দিকে তাকাল, একমাত্র কোনি ছাড়া।
হিয়া শনিবার সকালের দুটো হিট থেকে অনায়াসেই ফাইনালে উঠল। ব্যাক স্ট্রোকে রমা যোশি নেই। কিন্তু মেডলির দ্বিতীয় হিট থেকে রমা ফাইনালে উঠল হিয়ার সময়কে দুই সেকেন্ড ম্লান করে। ঘোষণায় রমার সময় শোনা মাত্র হিয়া পুল ছেড়ে চলে গেল বাবা—মার সঙ্গে।
মেয়েরা ফিসফাস কথা বলছে। খাটে উপুড় হয়ে রেডিওয় হিন্দি গান শুনছে হিয়া। গত চারদিন কোনির সঙ্গে কারুর বাক্যালাপই হয়নি। অমিয়া কখনো বিছানায় শুচ্ছে, উঠে এসে জানলায় দাঁড়াচ্ছে, টেবলের এটা ওটা নাড়ছে। প্রণতি ভাদুড়ি তার খাটে শুয়ে কমিকস পড়ছে।
”অমিয়াদি শুয়ে পড়ো।”
অমিয়া বিরক্তমুখে বেলার দিকে তাকিয়ে আবার মুখ ফিরিয়ে নিল। ”ভীষণ মাথা ধরেছে। তখন থেকে রেডিওটা জ্বালাচ্ছে। হিয়া, ওটা বন্ধ করো।”
হিয়া রেডিও বন্ধ করার উদ্যোগ দেখাল না।
”বলছি, রেডিও বন্ধ করো।”
হিয়া একটু জোর করে দিল রেডিওর শব্দ। অমিয়া চীৎকার করে উঠল, ”বন্ধ করবে কি করবে না, আমার ভাল লাগছে না।”
”রেডিও শুনতে আমার ভাল লাগছে।” হিয়া শুকনো গলায় বলল, ”আপনি চেঁচাবেন না।”
কি ঔদ্ধত্য! অমিয়া অবাক হয়ে ঘরের সকলের মুখের দিকে তাকাতে লাগল। কেউই তার দিকে তাকিয়ে নেই, এমনকি বেলাও গভীর মনোযোগে রহস্য কাহিনী পাঠে ব্যস্ত। এতদিন বাংলার মেয়ে সাঁতারু মহলে সে সম্রাজ্ঞীর মতো বিরাজ করছে। এই মুহূর্তে সে বুঝল তার মাথা কেটে মুকুট তুলে নিয়েছে হিয়া। এবার ওকে মধ্যমণি করেই ওরা ঘুরবে ওদের প্রশংসা, মনোযোগ এবার থেকে পাবে হিয়া। তার দিন ফুরিয়ে গেছে। বিছানায় এসে বসল অমিয়া। দিন কি সত্যিই ফুরিয়ে গেছে! কাল আছে ১০০ মিটার ফ্রি স্টাইল, ৪×১০০ রিলে। দেখা যাক সত্যিই ফুরিয়ে গেছি কিনা, অমিয়া ভাবল, কাল আমাকে দেখাতেই হবে।
কিছু পরে প্রণতি ভাদুড়ি উঠে এসে রেডিওটা বন্ধ করে দিল। হিয়া ঘুমিয়ে পড়েছে।
.
সন্ধ্যায় পুলের হাজার হাজার ওয়াটের আলোয় স্টার্টিং ব্লকের উপর হিয়ার লাল কস্ট্যুম একটি স্থির শিখার মতো অপেক্ষা করছে। তার পাশে রমা যোশি, তার পাশে গুজরাটের আমি পটেল। স্টার্টারের বন্দুকের শব্দের সঙ্গে সঙ্গে দপ করে জ্বলে উঠল হিয়া।
বাটারফ্লাইয়ে রমার তুল্য ভারতে কেউ নেই। প্রায় দশ মিটারে সে হিয়াকে পিছনে ফেলে গেল। শুশুকের মতো ঢেউ খেলানো গতিতে। বোর্ড ছুঁয়েই ব্যাক স্ট্রোক। হঠাৎ গ্যালারী উদগ্রীব হয়ে উঠল। হিয়া এবার ব্যবধান কমাচ্ছে।
”গো হিয়া, গো।”
”কান অন রমা।”
গ্যালারী তোলপাড় হতে শুরু করল পুলের জলের মতোই। ব্যাক স্ট্রোকের শেষে রমা তখনো প্রায় চার মিটার এগিয়ে। এবার ব্রেস্ট স্ট্রোক এবং হিয়া জানে এইবারই তাকে বড় ব্যবধান তৈরী করতে হবে। এরপরই ফ্রি স্টাইল এবং রমার সঙ্গে এখানে সে পারবে না।
প্রচণ্ডভাবে হিয়ার দুটো হাতের সঙ্গে তাল দিয়ে পা দুটো জলে ধাক্কা দিতে শুরু করল। রমার সঙ্গে পাশাপাশি এসে গেল পুলের মাঝামাঝি এবং এই প্রথম সে রমাকে ছাড়িয়ে গেল। পাশে মুখ ফিরিয়ে হিয়াকে দেখতে দেখতে রমাও জোর বাড়াল।
গ্যালারীতে প্রলাপ চীৎকার শুরু হয়েছে। বাংলার মেয়েরা একসঙ্গে তীক্ষ্ন কণ্ঠে চীৎকার করে যাচ্ছে ‘হিয়া হিয়া।’ শুধু অমিয়া ক্লান্ত ভঙ্গিতে অনুত্তোজিত বসে কোনির পাশে, মুখে পাতলা একটা হাসি নিয়ে। আপন মনেই সে বলল, ”হিয়া জিতবে।”
এবং হিয়া জিতল।
ফ্রি স্টাইল শুরু করেছিল হিয়া চার মিটার এগিয়ে থেকে। সেই ব্যবধান থেকে রমা অর্ধেকটা কেড়ে নিল সাঁতার শেষের তিরিশ মিটার বাকি থাকতেই। এবার শুরু হয় দুজনের মধ্যে বাঁচা—মরার লড়াই। ইনচি—ইনচি করে রমা এগিয়ে আসতে থাকে। ফিনিশিং বোর্ডে টাইম কীপাররা ঘড়ি হাতে ঝুঁকে অপেক্ষা করছে। গ্যালারীতে লোকেরা সরে আসছে ফিনিশ দেখার জন্য।
হিয়ার হাত বোর্ড ছোঁয়ার আধ সেকেন্ডের মধ্যেই রমার হাত পৌঁছল।
”বলেছিলুম।” অমিয়া আবার আপন মনে বলল।
কে জিতেছে জানার জন্য ঘোষণা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হল এবং মেয়েরা যখন হিয়াকে জড়িয়ে ধরে নিজেদের চোখের জল তার গালে মাখিয়ে দিচ্ছিল, তখন একমাত্র কোনিই দেখতে পেল, অমিয়ার চোখের কোণে জল।
বাংলা এখনো দু’ পয়েন্ট পিছিয়ে। হিয়া ও রমার সোনা তিনটি করে। ধীরেন ঘোষ উত্তেজিত হয়ে রাত্রে খাবার আগে মেয়েদের বলে গেল, ”কাল সকালে আর একটা গোল্ড পাচ্ছে হিয়া! বেঙ্গল এগিয়ে যাবে।”
”ধীরেনদা, ভুলে যাবেন না, তারপরও দুটো ফ্রি স্টাইল ইভেন্ট আছে।” অমিয়া ভাত নাড়াচাড়া করতে করতে আনমনে বলল, ”রমা যোশি ইন্ডিয়া রেকর্ড হোল্ড করছে।”
