”গীতা কে?”
”দেখিসনি? সকালে এই মাঠে মেয়েদের ট্রেনিং করায়, নিজেও করে।”
”লেডি সোবার্স।”
”কী বললি?”
”কিছু নয়। আপনাদের পাড়ায় থাকে?”
”পাশের বাড়িতে। অ্যাত্তোটুকু থেকে দেখছি গীতাকে। বিয়ের আগে দারুণ অ্যাথলিট ছিল। বেঙ্গল রিপ্রেজেন্ট করেছে ন্যাশনাল গেমসে। এশিয়ান গেমসের জন্য ট্রায়াল ক্যাম্পেও একবার গেছল। বিয়ে হল, তারপর বাঙালি—ঘরে যা হয়, বউয়ের অ্যাথলেটিকস চালিয়ে যাওয়াতে শ্বশুরবাড়ি রাজি হল না। স্বামী অ্যাকসিডেন্টে মারা যেতে বিধবা হয়ে বাপের বাড়ি এসেও বছরখানেক প্রায় কিছু করেনি। হঠাৎ মাঠে কানে এল, স্টেট ব্যাঙ্ক নাকি অ্যাথলিট রিক্রুট করবে। তাই ওকে বললুম, প্র্যাকটিস শুরু কর, চাকরি হয়ে যেতে পারে। টোটো করে লটারির টিকিট বেচে কদ্দিন চালাবি। চিরকাল তো ভাইয়েরা বসিয়ে রেখে খাওয়াবে না, আর অন্যের হাততোলা হয়ে থাকতে হলে দাসীবাঁদির মতো থাকতে হবে। তার থেকে বরং বয়স থাকতে থাকতে যদি কাজটাজ জোগাড় করে নিতে পারে, লেখাপড়াও শেখেনি তেমন, স্কুল—ফাইনাল ফেল। দৌড়ের বয়স পেরিয়ে গেছে, আর হবে না, তবে গায়ের জোরের ব্যাপারগুলো তো হতে পারে। তা ছাড়া, পাড়ার বাচ্চচা বাচ্চচা মেয়েগুলোকে নিয়ে যদি ওকে দিয়ে একটা ক্লাব হয়। ইচ্ছে আছে ভলি আর কবাডিও শুরু করব।”
কথা বলতে বলতে টেবিল গুছিয়ে, জানলা বন্ধ করে ডগুদা আলোর সুইচের দিকে হাত বাড়াল।
আনন্দ বেরিয়ে এসে বাড়ির দিকে হাঁটছে। ইতিমধ্যে কেউ তার খোঁজ করলে, তুমুলকাণ্ডের মুখে পড়তে হবে। একটু জোরেই সে পা চালাল।
”আনন্দ শোনো।”
ফটক ঘেঁষে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে। আনন্দ প্রথমে ভয় পেয়ে গেছল আচমকা ডাক শুনে।
”কী বলল ডগুদা আমার সম্পর্কে?”
”তোমার সম্পর্কে কোনও কথা তো হয়নি।”
”হয়েছে, আমি জানি। সবাই কৌতূহলী হয়। আমার পা, আমার হাঁটা দেখে হয়। তুমিও হয়েছ।”
আনন্দ চুপ করে রইল। বাড়ির মধ্য থেকে হাঁকডাক আসছে না। বিপিনদা এখনও হয়তো ফেরেনি।
”না, ওসবে আমার কৌতূহল নেই। তবে যতবারই দেখেছি, তুমি একটা না একটা কিছু দিচ্ছ—হয় বল ফিরিয়ে দিচ্ছ, মাঠ থেকে ইট তুলে ফেলে দিচ্ছ, বই এনে দিচ্ছ, কেন?”
”ভাল লাগে।”
”ব্যস, এই!”
”হ্যাঁ। আমার পক্ষে এর বেশি কিছু করা কি সম্ভব?”
”কেন, সেদিন যে বললে, খেলি! কী খেল, কোথায় খেল? এসো না আমার ঘরে, গল্প করব। একতলার একদম পিছন দিকে নিরিবিলি ঘরটা।”
আনন্দ হাত ধরল অমলের। আস্তে হাতটা ছাড়িয়ে নিল ও।
”আমি কারুর বাড়ি যাই না।”
”এলে কিন্তু ভাল লাগত। দিনরাত একা একটা ঘরে বন্দির মতো বাস করছি। হার্টের অসুখ, আমার হাঁটা পর্যন্ত বারণ। এখন লুকিয়ে বেরিয়েছি, জানতে পারলে ভীষণ বকুনি খেতে হবে।”
”কে বকবে, মা?”
আনন্দ হেসে উঠল।
”মা নেই।”
”ওহ। আমারও নিজেরও মা নেই। তার জন্য আমার অবশ্য কোনও দুঃখ নেই। এই মা আমাকে ছোট থেকে নিজের ছেলের মতো ভালোবেসেছে। আমার জন্য আজও কষ্ট করছে।”
”শুনলুম ডগুদার কাছে।”
”তা হলে আমাকে নিয়ে কথা হয়েছে।”
”শুধু এইটুকুই।”
”আমার খুব অস্বস্তি হয় যখন কেউ আড়ালে আমার সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসা করে। কেন যে হয় জানি না। লোকে আমাকে দেখে আড়ালে হাসে। একা থাকতেই ভালবাসি।”
”আর আমি সঙ্গ পাবার জন্য ছটফট করছি।”
”দুজনের ব্যাপারটা দুরকম। আমার চেহারা, এই খোঁড়া পা, আর তোমার হার্ট। তুমি বল করো, আর আমি কুড়োই।”
”আমার খেলা চিরতরে বারণ হয়ে গেছে। আমার যা অসুখ তা সেরে ওঠার নয়। কিন্তু তুমি তো খেল। কী খেলা বললে না তো।”
উত্তর শোনার আগেই আনন্দ দেখল বীরা দত্ত রোড থেকে বিপিনদা মাঠের দিকে এগোচ্ছে। হাতে ইস্ত্রি—করানো কাপড়ের পাঁজা।
”আমি পালাই।”
আনন্দ ছুটে বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ল।
.
গভীর রাতে একবার তার ঘুম ভেঙেছিল। তখন হঠাৎ আপনা থেকেই তার মনে হয়, পাখিটা এইবার হয়তো ডাকবে। সে অপেক্ষা করে। দোতলা থেকে ক্ষীণভাবে সেতারে আলাপের শব্দ আসছে। মেজদা টেপরেকর্ডার চালাচ্ছে। নিখিল ব্যানার্জির বেহাগ। বড়দা কানাডা থেকে পাঠিয়েছে রেকর্ডারটা। নিজের নিশ্বাস ছাড়া আনন্দ আর কিছু এখন শুনতে চায় না। হৃৎপিণ্ডটা ধকধক করে যাচ্ছে আর ক্রমশ একটা ভয় তাকে আচ্ছন্ন করে দিচ্ছে। এই ধকধকানিটা বন্ধ হয়ে গেলেই সে মরে যাবে। ওটা বন্ধ হবার নোটিশ জারি হয়ে গেছে। কেউ না বললেও সে সকলের হাবভাব থেকে বুঝতে পারছে, গুরুতর কিছু একটা হয়েছে। এই শব্দটা সচল রাখার জন্য তাকে সাবধানে, কম নড়াচড়া করে বন্দি জীবন কাটাতে হচ্ছে। কী দারুণ, ভয়ঙ্কর আর মিষ্টি এই হার্টের শব্দ। প্রাণভরে এমন করে সে আগে কখনও শোনেনি। মেঝেয় শোয়া হাবুব মা’র নাকডাকার শব্দ শুনতে শুনতে তারপর কখন যেন সে আবার ঘুমিয়ে পড়ে।
সকালে জানলা থেকেই আনন্দ দেখল মেয়েদের দৌড় শেখা। ওদের সঙ্গে হাফপ্যান্ট পরে লেডি সোবার্সও দৌড়চ্ছে। শট ছাড়া দেখতে পেল না। সেজন্য বাইরের রকে যাওয়া দরকার।
অরুণ প্রতিদিনের মতো দেখতে এল আনন্দকে।
”মেজদা, আর এভাবে থাকতে পারব না। আমি ভাল হয়ে গেছি।”
”কী করে বুঝলি?”
”কেন, এই তো দিব্যি চলাফেরা করছি, বুকে কোনও কষ্ট হচ্ছে না।”
”দিব্যি আছিস বিশ্রাম নেওয়ার জন্য। ঘোরাঘুরি করলে দিব্যি থাকতিস না। আচ্ছা, দিনে একবার ফটকের কাছে যাবার পারমিশান দিলাম।”
