ডগুদার বয়স বোঝা যায় না। চল্লিশ থেকে ষাটের মধ্যে যে কোনও একটা বয়স ধরে নেওয়া যেতে পারে। বিয়ে করেনি। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়েছে কি না বোঝা যায় না কথাবার্তায়। মাথায় টাক, ছোটখাটো রোগাটে চেহারা। ভাইদের সংসারের এককোণে পড়ে আছে। বাড়ির বাইরের দিকের ঘরটায় থাকে। ময়দানে ঘেরা মাঠের গেট—কিপার। দৈনিক সাতটাকা মাইনে। বছরে পাঁচমাস মাত্র এই চাকরি। বাকি সাতমাস চলে টিউশনি করে। কয়েকটা বাচ্চচা ছেলেকে পড়িয়ে মাসে আশি টাকা পায়। আর আছে আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের জন্য বেগারখাটা। তারই অন্যতম, এই অবৈতনিক লাইব্রেরিয়ানের কাজ।
পঁয়ত্রিশ বছরের এই লাইব্রেরিতে গত বছর দশেক বই কেনা হয়নি। তার আগে কেনা আর চেয়েচিন্তে আনা হাজার খানেক পুরনো বই নিয়েই ডগুদা চালিয়ে যাচ্ছে। মেম্বারদের চাঁদা থেকে মাসে গোটা পঁচিশ টাকা পাওয়া যায়। ইলেকট্রিক বিলের বাকি টাকা জমে গেলে ডগুদা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে সেক্রেটারি অনাদিপ্রসাদের কাছে। কিছুক্ষণ ধরে চড়াগলায় বলে যায়—”পাড়াটা মরে গেল, এলাকাটা মরে গেল। কী ছিল আর কী হয়েছে! ছেলেরা বই পড়ে না, খেলাধুলো ব্যায়াম করে না। আপনারাও এসব দেখবেন না। নতুন বই কেনা দরকার, খেলার জিনিস টিনিস কিনে ছেলেদের সংগঠিত (ডগুদা ঘেরামাঠ কর্মচারী ইউনিয়নের সদস্য) করে একটা খেলার ক্লাব দরকার। প্রেসিডেন্ট তো মাঠটাকে নিজের কায়েমি স্বার্থে ব্যবহার করছে, তার তো উদ্দেশ্য মাঠটায় যাতে খেলাধুলো না হয়। বুঝি না ভেবেছেন? আমি ঠোঁটকাটা মানুষ, যা বুঝেছি তাই বলেছি। এসব আমি হতে দেব না, আপনি মেম্বারদের ডেকে সভা করুন, আমি বক্তব্য রাখব, আবেদন জানাব।”
কোনওবারই সভা ডাকা হয়নি, সুতরাং আবেদনও জানান হয়নি। তবে লাইব্রেরির ইলেকট্রিক বাতি জ্বলা বন্ধ হয়নি। অনাদিপ্রসাদ বিল মিটিয়ে দেন।
ডগুদা মাথা নিচু করে ইস্যু করা বইয়ের নাম খাতায় লিখছে। অপেক্ষমাণ মেম্বারের হাতে বইটা দেবার সময় মুখ তুলেই দেখল আনন্দকে।
”কী রে, তোর নাকি অসুখ? স্কুলে যাওয়া বন্ধ?”
”কে বলল?”
”তোদের ক্লাসের শিবনাথ। হয়েছে কী?”
”বুকে একটা ব্যথা, রেস্ট নিলেই সেরে যাবে।” ইতস্তত করে আনন্দ বলল, ”ডগুদা, খেলার বই কিছু আছে আর?”
”আর! মানে? ছিল নাকি কোনওকালে যে আর থাকবে?”
আনন্দ চোখ বোলাল ডগুদার পিছনে পর পর দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে থাকা বইয়ের র্যাকগুলোর দিকে। ছাদ থেকে শিকে ঝোলানো তক্তায় রয়েছে পুরনো বাঁধানো পত্রিকা। মেঝেয় পড়ে আছে উইয়ে খাওয়া কিছু বই। ওগুলো ওজনদরে বিক্রি হবে।
”একটা বই তো ছিল, ব্র্যাডম্যানের আর্ট অফ ক্রিকেট। উইয়ে খেয়েছে বলে—”
আনন্দ থেমে গেল। বই পালটাতে এসেছে বটতলার মাইতিদের বাড়ির চাকর।
”মা জিজ্ঞাসা করতে বলল, নেতাজিকে নিয়ে কী একটা বই বেরিয়েছে, সেটা দিতে।”
”এখনও কেনা হয়নি।”
”তা হলে নিমাই—”
”ইস্যু হয়ে গেছে।”
”তা হলে মোটা একটা বই দিন। একটা গপ্পো থাকবে।”
ডগুদা মুখ পিছনে ফিরিয়ে কাকে যেন বলল, ”একটা মোটা উপন্যাস দে তো রে। তিন নম্বর র্যাকটা দ্যাখ।”
ডগুদা এরপর আনন্দকে উদ্দেশ করে বলল, ”লাইব্রেরি বলবি এটাকে? ওই যে বাঁধানো লেখাটা, পড় তো।”
আনন্দ এগিয়ে গেল দরজার পাশে ঝোলানো লেখাটা পড়তে। ধুলো আর বৃষ্টির জলে বহুবছর আগে তুলি দিয়ে লেখা রবীন্দ্রনাথের উদ্ধৃতি ঝাপসা হয়ে গেচে।
”এখানে ভাষা চুপ করিয়া আছে, প্রবাহ স্থির হইয়া আছে…পড়তে পারছি না ডগুদা, জেবড়ে গেছে…”
”দেবতাত্মা হবে।”
”দেবতাত্মার অমর আলোক কালো অক্ষরের শৃঙ্খলে কাগজের … পড়তে পারছি না।”
”কাগজের হাহাকারে।”
”বাঁধা পড়িয়া আছে।”
”তারপরের প্যারা?”
”শঙ্খের মধ্যে যেমন সমুদ্রের শব্দ শুনা যায়, তেমনই এই লাইব্রেরির মধ্যে কি… ধুয়ে গেছে।”
”সমুদ্রের।”
”সমুদ্রের উত্থান—পতনের শব্দ শুনিতেছ?”
”এবার বল এখানে কী শুনতে, কী দেখতে পাচ্ছিস? সমুদ্রের শব্দ? দেবতা আর অমর আলোক?”
”কথাটা দেবতাত্মা নয়, মানবাত্মা।”
চমকে আনন্দ ঘুরে দাঁড়াল। সামান্য বাদামি ঝাঁকড়া চুল, পাখির ঠোঁটের মতো নাকের ডগাটা বাঁকা। হাতে একটা বই। সেইরকম চুপিসারে র্যাকগুলোর পিছন থেকে এসে দাঁড়িয়েছে ডগুদার পাশে।
”কথাটা হচ্ছে—এখানে ভাষা চুপ করিয়া আছে, প্রবাহ স্থির হইয়া আছে, মানবাত্মার অমর আলোক কালো অক্ষরের শৃঙ্খলে কাগজের…হাহাকারে নয় কারাগারে, বাঁধা পড়িয়া আছে। শঙ্খের মধ্যে যেমন সমুদ্রের শব্দ শুনা যায়, তেমনই এই লাইব্রেরির মধ্যে কি হৃদয়ের… সমুদ্রের নয়, উত্থান—পতনের শব্দ শুনিতেছ?”
আনন্দ অবাক হয়ে তাকিয়ে শুনছিল ওর কণ্ঠস্বর। যেন সরোদ বাজাচ্ছে গলা দিয়ে। ক্ষীণ শ্রদ্ধা জমে উঠল তার মনে। ডগুদা বিব্রত মুখে খাতায় বইয়ের নাম লিখতে লিখতে বলল, ”সময় হয়ে গেছে, এবার কিন্তু বন্ধ করব।”
দুলতে দুলতে ও বেরিয়ে গেল। হাতে একটা পাতলা বই। দরজার কাছে গিয়ে একবার ফিরে তাকিয়েছিল আনন্দর দিকে। চোখাচোখি হতেই হেসেছিল, আনন্দও।
”ও কে ডগুদা?”
”অমল। ওকে আমি অ্যাসিস্ট্যান্ট লাইব্রেরিয়ান করেছি। ভীষণ পড়ে। দেখলি তো কী রকম ভুলটা ধরিয়ে দিল।”
”অমল, পদবি কী?”
”গীতার ছেলে, মানে সতাতো ছেলে, ওর স্বামীর আগের পক্ষের। গীতা যখন বিধবা হয়ে ভাইদের কাছে এল তখন ওকেও সঙ্গে আনে। কেউ দেখার নেই, খাওয়াবার নেই। ওকে ফেলে আসতে পারেনি গীতা, বড় ভাল মেয়ে। ভাইরা অবশ্য মোটেই খুশি নয়। অমলকে, গীতাকেও ওরা উৎপাত বলে মনে করে। বেচারার পা—টা, ওইরকমই আজীবন থেকে যাবে।”
