আনন্দ বিষণ্ণ চোখে চারধারে তাকাল। সবাই কিছু না কিছু করছে। মানুষ চলছে রাস্তায়, গাড়ি চলছে রাস্তায়, মাঠে ফুটবল খেলছে ক’টা ছেলে, ক্রিকেট বল লোফালুফি করছে নেটের পাশে তিনজন। আকাশে উড়ছে চিল। কেউ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই। চলছে, উড়ছে, নড়ছে। কেউ লক্ষ করল না কিটব্যাগ হাতে তার চলে যাওয়াটা। সবাই ব্যস্ত রোলার টানায়।
টেনিস ক্লাবের পাশ দিয়ে যাবার সময় আনন্দ সামান্য ইতস্তত করল। প্র্যাকটিস চলছে তিনটি কোর্টেই। আজ যেন ছেলেমেয়েদের সংখ্যাটি বেশি। ঢুকে পড়ল এবং বেঞ্চে বসল এক মহিলার পাশে। আনন্দর মনে হল, ওঁর ছেলে বা মেয়ে ট্রেনিংয়ে রয়েছে।
গতকাল আনন্দ যাকে কোচ ভেবেছিল, সেই লোকটি হলুদ বুশশার্ট ও কালো ট্রাউজার্স পরে ক্লাসের অফিসঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে গল্প করছিল। এবার কোর্টের কাছে এল। আনন্দর পাশের মহিলাটিকে দেখে হেসে বলল, ”ভালই করছে, খুব তাড়াতাড়ি পিক—আপ করছে ফাইনার পয়েন্টগুলো। ইনটেলিজেন্ট গার্ল।”
”বাড়িতে তো দিনরাত শুধু বিলি, ইভন, মার্গারেট, ক্রিস এইসব নামই জপছে। কী করি বলুন তো?”
”করুক না।”
”ওর বাবা টেবল টেনিসের ভক্ত। এককালে খেলতেন তো। তিনি আবার ওয়াই—এম—সি—এতেও বুলুকে ভর্তি করিয়ে দিয়েছেন। বাপের সঙ্গে কী সব চিনে—জাপানি বলাবলি হয়, আমার আবার মনে থাকে না। কী যে করি, বুলুকে যে কোন খেলাটা ধরাব ভেবে পাচ্ছি না।”
লোকটি হেসে কোর্টের ওধারে চলে গেল। আনন্দ বেঞ্চে হেলান দিয়ে ভাবল, এর মেয়ে নিজেই জানে না কী খেলা ভালবাসে। বাবা—মা জোর করে প্লেয়ার বানাচ্ছে। হয়তো মেয়েটার ইচ্ছে নাচ শেখার। সে পা ছড়িয়ে অলসভাবে তাকিয়ে দেখতে লাগল প্র্যাকটিস। একবার সে এদিক—ওদিক কাকে যেন খুঁজলও। মুচকি হাসি ঠোঁটে এসে মিলিয়ে গেল।
”র্যাকেটের মাথাটাকে মনে করবে তোমারই হাতের অংশ—হাতটা যেন লম্বা হয়ে গেছে। যখন এটা অনুভব করবে, র্যাকেট কন্ট্রোল অনেক সহজ হয়ে আসবে।”
আনন্দ একটু ঝুঁকে একাগ্র হয়ে লোকটির কথা শুনতে শুনতে ঘাড় নাড়ল। ঠিক। শরীর আর খেলার জিনিসটা এক করে ফেলতে হবে। মেজদা মাঝে মাঝে ক্রিকেট ব্যাটটা জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকে। কিন্তু লিগের খেলায় ওর স্কোর বাষট্টির বেশি ওঠেনি। কীসের যেন অভাব আছে মেজদার মধ্যে। পঞ্চাশ পেরোলেই নার্ভাস হয়ে যায়। অথচ সবাই বলে ওর টেকনিক নাকি সাউন্ড। শুধুই টেকনিক নয় আরও কিছু দরকার হয়। নার্ভ, সাহস।
”স্ট্রোক তিনরকমের, সার্ভিস, গ্রাউন্ড স্ট্রোক আর ভলি। সব স্ট্রোকেই তিনটি জিনিস রয়েছে, বল মারার জন্য র্যাকেটটা শরীরের একধারে টেনে আনা, তারপর র্যাকেটটা সামনে চালানো, সবশেষে বল মারার পর বলের পথ ধরে শরীরের ঝোঁকে র্যাকেটটা এগিয়ে যাওয়া।”
”ঠিক ক্রিকেটের মতো, ব্যাকলিফট, মারের পর ফলো থ্রু।”
চমকে পিছনে তাকাল আনন্দ। ভ্রূকুটি করল। ছ্যাঁত করে উঠেছিল বুকটা, কখন যে চুপিসারে পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। একটা পায়ের উপর ভর দিয়েই হাঁটা, অন্তত ঘষড়ানির শব্দও তো হবে! আশ্চর্য, কী নিঃশব্দ ভূতের মতো।
আনন্দ অস্ফুটে বলল, ”সব খেলাতেই তাই।”
”ক্রিকেট, হকি, টেবল টেনিস, ব্যাডমিন্টন, সব খেলাতেই এক নিয়ম।”
আনন্দর ইচ্ছা হল বলে, তুমি কি সব খেলা খেলে দেখেছ? একটা পা—এর তো ওই অবস্থা।
কিন্তু কিছু না বলে যথেষ্ট রকমের তাচ্ছিল্য দেখাতে ভ্রু তুলে সে মুখটা ফিরিয়ে নিল। বাঁ ধারের কোর্টে ফোরহ্যান্ডে বল পেটাপেটি শুরু হয়েছে বেসলাইন থেকে।
”আমি অবশ্য খেলিনি, তবে লক্ষ করেছি।”
মনের কথা বুঝে নিতে পারে দেখছি! কান দুটো একটু গরম হয়ে উঠল আনন্দর। ও যা ভেবেছে আমি তা ভাবিনি, এটা এখনি বুঝিয়ে দিতে হবে।
”এসব বোঝার জন্য খেলার দরকার হয় নাকি?”
”খেললে আরও ভাল বোঝা যায়। তবে মনের মধ্যে নাড়াচাড়া করালেও বোঝা যায়।”
ওরে বাব্বা, এ যে দেখছি মন টন নিয়ে খেলার কথা বলে।
আনন্দ মুখ ফিরিয়ে পিটপিট চোখে তাকাল ওর দিকে। সোজা তাকিয়ে আছে বেঞ্চের পিঠটা দুহাতে আঁকড়ে। আনন্দ আজ ভাল করে লক্ষ করল ওকে। চাহনিতে কোনও ভাব নেই। চাপা গাল দুটোর মাঝখানে খাড়া নাক, ডগাটা পাখির ঠোঁটের মতো বাঁকা। ঈষৎ বাদামি চুল, মনে হয় মাস ছয়েক ছাঁটেনি, বছর দুয়েক তেল দেয়নি, দিন দশেক চিরুনি। কনুই থেকে শিরাগুলো কবজি পর্যন্ত রুগ্ন হাত দুটোকে বেঁধে রেখেছে।
ওর চোখে বিব্রত ভাব ফুটে উঠছে। আনন্দর মনে হল, ওকে এভাবে লক্ষ করাটা যেন পছন্দ করছে না। তাই সে ওর পায়ের দিকে তাকাল ইচ্ছে করেই।
”পোলিওয়।”
মুখ ঘুরিয়ে আনন্দ এবার অন্যদিক থেকে আসা কথায় কান দিল।
”ফোরহ্যান্ডটাকে মনে করবে যেন এক বালতি জল ছুড়ছ। বাঁ হাতে হাতল ধরে ডান হাতটা বালতির নীচে। বাঁ পা আর বাঁ কাঁধটা এগিয়ে দিয়ে পাশে ঘুরে দাঁড়িয়ে বালতিটা পিছনে নিয়ে তারপর হুশ করে ছুড়ে দেবে। বালতিটা এগিয়ে যাবে শরীর থেকে। ঠিক সেইভাবেই ফোরহ্যান্ড মারবে। বালতির তলার হাতটাই তোমার র্যাকেট—ধরা হাত।
”কখনও ড্রাইভ করেছ?” আনন্দ পালটা প্রশ্ন করল।
”বইয়ে ছবি দেখেছি।”
”কার ছবি?”
”আর্ট অব ক্রিকেটে, ব্র্যাডম্যানের।”
আনন্দ ঘুরে বসল। মেজদা গত বছর তার বন্ধুর কাছ থেকে বইটা দুদিনের জন্য চেয়ে এনেছিল। যতক্ষণ বাড়িতে থাকত বইটায় ডুবে যেত। অফিসেও নিয়ে যেত। আনন্দ একবার শুধু পাতা ওলটাবার সুযোগ পায় মেজদা যখন সকালে কলঘরে গেছল, তার মুশকিল ইংরেজি অক্ষরগুলোকে নিয়ে, অধিকাংশেরই মানে সে জানে না।
