”যেমন তুই এখন করছিস। এর থেকে মেয়েরাও তো জোরে বল করে।”
ঝাঁ করে রক্ত ছুটে এল আনন্দের মাথায়। বটে! চোয়াল চেপে সে বোলিং মার্কে ফিরে এল। কোচ যা বলে বলুক, একটা বল অন্তত সুইং টুইং সিকেয় তুলে জোরে, ভীষণ জোরে দেবে।
বলটা এত জোরে আসবে এবং গুডলেংথ থেকে আচমকা লাফিয়ে উঠবে, তরুণ কল্পনা করেনি। ফরোয়ার্ড খেলতে গিয়ে থমকে যায় আর ব্যাট তুলে মুখ আড়াল করার আগেই বলটা কপাল ঘষড়ে নেটের উপর দিয়ে বেরিয়ে গেল।
আনন্দ তো দেখেনি। ডেলিভারি দিয়েই তার চোখ থেকে সব দৃশ্য মুছে অন্ধকার হয়ে যায়। ফুসফুসে সেই মুহূর্তে যেন একটা ছুরি গেঁথে গেল। ফলো থ্রুর সঙ্গেই সে বুক চেপে বসে পড়ে। তার সারা বুকটা থেকে যেন দৈত্যাকার একটা মুঠো এখন কচলে কচলে বাতাস বার করছে। যখন সে মুখ তুলল, তখন নেট থেকে তরুণকে ওরা ধরে বার করে আনছে। সাদা জামায় টপটপ রক্ত পড়ছে।
চোখ বন্ধ করল আনন্দ। একী হল? রক্ত কেন তরুণের মুখে? খুন করলাম নাকি, তরুণ কি মরে যাবে? কেঁপে উঠল ওর বুক। অতি ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে সে বোবাচোখে তাকিয়ে রইল তরুণকে ঘিরে ধরা জটলার দিকে। ফাস্ট—এইড বক্স দেখা যাচ্ছে ভিড়ের মধ্যে।
”খুব বেঁচে গেছে। যদি সোজা মুখে লাগত তা হলে—”
”কপাল ছুঁয়ে বেরিয়ে গেছে বলেই আর কিছু হল না। বলটা গুড লেংথ থেকে লাফিয়ে উঠেছিল। বড্ড বাজে পিচ।”
”এই পিচে এত জোরে বল করতে দেওয়া উচিত হয়নি কোচের।”
”কোচ তো ওকে আস্তেই বল করতে বলেছিল, আমি নিজে শুনেছি।”
”কিছু হয়নি, সামান্যই কেটেছে।” কোচ উবু হয়ে পিচ দেখছিলেন, এবার এগিয়ে এসে আনন্দের কাঁধে হাত রাখলেন। ফিকে হাসল আনন্দ।
”পিচটা ভাল করে রোল করা নেই। এই সব পার্কে শুধু জল দিয়ে যা হোক করে রোলার টেনে কি পিচ তৈরি হয়? কত তরিবত, মেহনত, সময় লাগে পিচ তৈরিতে।”
”বলটা আমি জোরে দিয়েছিলাম।”
”আস্তে বলও কি লাফায় না?” কোচ প্রায় ধমকে উঠলেন। ”তুমি কি ভেবেছ তোমার জন্যই তরুণের লেগেছে? মোটেই না। বোলারের কাজ বল করা, ব্যাটসম্যানের কাজ বলটা খেলা। খেলতে পারেনি ও। বল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়াও খেলার একটা অংশ। ওর লাগার জন্য দায়ী তারাই যারা পিচ তৈরি করেছে। বলটা না লাফিয়ে গড়িয়েও তো যেতে পারত! তখনও কি তুমি এতটা দুঃখ পেতে? লেগেছে তো লেগেছে, খেলতে গেলে অমন একটু—আধটু লাগেই—তুমি মনখারাপ করছ কেন?”
”যদি মারাত্মক কিছু হয়?”
”হতে পারে। সব খেলাতেই ভয় আছে, ঝুঁকি আছে। তাই বলে কি পৃথিবীতে খেলা বন্ধ হয়ে গেছে? তবে এই ইনজুরিটা কোচিংয়ের ক্ষতি করল। মনে ভয় ঢুকে গেলে—কী ব্যাপার?”
ছেলেটি ইতস্তত করে বলল, ‘প্র্যাকটিস কি আর হবে?”
”নিশ্চয় হবে। চলো, সবাই মিলে রোলারটা টেনে আনি। পিচটা রোল করে আবার শুরু হবে।”
কোচ যাবার জন্য এগিয়েও ফিরে এলেন। ”ফাস্টবোলারের একমাত্র দুঃখ, স্টাম্প ওড়াতে না পারলে। এই দুঃখ যে দেবে তাকেই মেরে হটিয়ে দেবে ক্রিজ থেকে।”
রোলারটা থাকে পার্কের এককোণে। কয়েকজন সেটা আনতে গেল। আনন্দ কিছুটা ভয় এবং সংকোচ নিয়ে এগিয়ে এল কপালে—ব্যান্ডেজ—বাঁধা তরুণের কাছে। কিছু বলার আগেই তরুণ ওর দিকে কটমটে চোখে তাকিয়ে বলল, ”নেক্সট টাইম, তোর ওই বলকে টেনিস ক্লাবের কোর্টে হুক করে পাঠাব।”
শোনামাত্র আনন্দর মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল। ওর ভয় হচ্ছিল, তরুণ হয়তো ভাববে, তার কপাল ইচ্ছে করেই ফাটিয়েছে। হয়তো চিরকাল একটা রাগ বিদ্বেষ মনে পুষে রাখবে। কিন্তু এখন সে বুঝল ভয় করার কিছু নেই। হুক করতে না পারার অক্ষমতায় তরুণ নিজের উপর ক্ষেপে গেছে। মাথা কাত করে কথাটা মেনে নিয়ে সে হাত বাড়িয়ে দিল তরুণের দিকে। এতক্ষণ যে অস্বস্তিটা তাকে কুরে খাচ্ছিল সেটা বন্ধ হল।
”আমার কোনও দোষ নেই।”
”ঠিক আছে।”
তারপর আনন্দ ছুটে গেল রোলার টানায় হাত লাগাতে। তরুণ তার উপর রাগ করেনি, এটা জানার পর, মন থেকে ভার নেমে গেছে। সে সর্বশক্তি রোলারে প্রয়োগ করেই বুঝল ভুল করেছে। বুকে চাপ পড়ে এমন কাজ কিছুতেই নয়। সে হাত নামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
একটি ছেলে বলল, ”হল কী তোর? আজ অনেকবার দেখেছি বল করার পর হাঁপানি রুগির মতো নিশ্বাস নিচ্ছিলি।”
”কদিন ধরেই বল করলে নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়!”
”ডাক্তার দেখা।”
ছেলেটি চলে যাবার পর, আনন্দ বিষণ্ণ বোধ করল। ডাক্তার দেখানোই উচিত। হয়তো এমন কোনও গোলমাল যেজন্য আমার আর খেলা উচিত নয়। নিশ্চয় কোনও অসুখ হয়েছে। মেজদা ছাড়া আর কাউকে বলা যাবে না ডাক্তার দেখাবার কথাটা। আনন্দ বার বার ভাবল এবং বিষণ্ণ হতে লাগল। হয়তো আর সে খেলতে পারবে না। ডাক্তার নিশ্চয় তাকে খেলা ছেড়ে দিতে বলবে। শ্বাসকষ্ট যখন, নিশ্চয় তা হলে ফুসফুস অথবা হার্টের ব্যাপার। খেলা তো এই দুটো জিনিসের উপর ভর করেই। ফাস্ট বোলিং গায়ের জোর আর দম ছাড়া সম্ভব নয়। তা হলে কি আমি আর খেলতে পারব না? কিংবা হয়তো সেরে যাব কিছুদিন চিকিৎসার পর। কিংবা ডাক্তার যদি বলে, খেলতে পারো কিন্তু ছোটাছুটির খেলা নয়। কিন্তু পৃথিবীতে এমন কোন খেলা আছে যাতে ছোটাছুটি করতে না হয়। লুডো, ক্যারম, তাস। ননসেন্স, তার থেকে মরে যাওয়াও ভাল। হ্যাঁ, মরে যাওয়া অনেক ভাল এই বুকের যন্ত্রণার থেকে।
