ননীদার ইচ্ছা নয় চ্যাম্পিয়ানশিপ লড়াইয়ে। ফার্স্ট ডিভিশনে উঠলে তো ক্লাবের খরচ বেড়ে যাবে। এখনই আমরা পাঁউরুটি আর আলুর দম দিয়ে লাঞ্চ শুরু করেছি। প্লেয়াররা রীতিমতো অসন্তুষ্ট। আমি কিন্তু চ্যাম্পিয়ানশিপ ফাইট করারই পক্ষে। ফার্স্ট ডিভিশনে যে করেই হোক একবার উঠতেই হবে। পরের বছরই নয় নেমে যাব, তবু তো বলতে পারব, আমার অধিনায়কত্বে সি সি এইচ একবার ফার্স্ট ডিভিশনে উঠেছিল। প্লেয়ারদের ক’দিন ধরেই তাতাচ্ছি ফার্স্ট ডিভিশনে খেলার ইজ্জতের লোভ দেখিয়ে।
ক’দিন ধরে ননীদা মাঠে আসছেন না। একটা ম্যাচ খেলা হয়ে গেল ননীদার উপস্থিতি ছাড়াই। আমরা জিতলাম শুধু ফিল্ডিং—এর জোরে। বেলেঘাটা স্পোর্টিং—এর কাছে আচমকা রূপোলি সঙ্ঘ এক উইকেটে হেরে আমাদের সমান হয়ে গেল। হঠাৎ আমার তন্ময়কে মনে পড়ল। এই সময় ও যদি থাকত, তা হলে বাকি ম্যাচ ক’টা বোধ হয় জিততে পারব, এইরকম একটা ধারণা আমার মনে উঁকি দিতে লাগল। ভাবলাম ননীদাকে বলি, যদি দরকার হয় তন্ময়কে বাকি ক’টা ম্যাচ খেলবার জন্য ডেকে আনি। কিল খেয়ে অনেক সময় কিল চুরি করতেই হয়। তা ছাড়া, অপরাধী তো আমিই। ওকে ইচ্ছে করে রান আউট করে দেওয়ার পর থেকেই আমার মনে খচখচ করে একটা কাঁটা বিঁধছে। সেটা উপড়ে না ফেলা পর্যন্ত স্বস্তি পাব না।
বলামাত্র ননীদা তেলে—বেগুনে হয়ে উঠলেন।
”তোমার লজ্জা করে না, মতি? যেভাবে, যে ভাষায় বাইরের টিমের সামনে আমাদের অপমান করেছে, তারপরও তুমি ওকে আনতে চাও? কী আছে ওর খেলায়, য়্যাঁ? কী আছে? নেমেই দুমদাম ব্যাট চালায়, বরাতজোরে ব্যাটে—বলে হয়ে গেছে তাই রান পেয়েছে। একটু বুদ্ধিমান বোলারের পাল্লায় পড়লে তিন বলে ওকে তুলে নিয়ে যাবে। ক্রিকেট অত সোজা ব্যাপার নয়, এটা ফুটবল নয় যে গোল খেলেও গোল শোধ দেওয়ার সুযোগ পাবে। প্রত্যেকটা বলের ওপর ব্যাটসম্যানের বাঁচা—মরা নির্ভর করে, একটা ভুল করেছ কি তোমার মৃত্যু ঘটে যাবে। কী ভীষণ ডিসিপ্লিনড হতে হয়, কী দারুণ কনসেনট্রেশন দরকার হয় বড় ব্যাটসম্যান হতে গেলে। তোমার ওই তন্ময়ের মধ্যে তা কি আছে?”
আমি চুপ করে ননীদার উত্তেজিত মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। এই লোকটিই, মাসখানেক আগে যার ব্যাটিং দেখে উচ্ছ্বসিত হতেন, আজ তাকে ব্যাটসম্যান বলতে রাজি নন! ননীদা একদৃষ্টে মাটির দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, ”খেলাটাই বড় কথা, টাকাই সব কিছু নয়।”
”কিন্তু ননীদা, টাকা অত্যন্ত দরকারি জিনিস। প্লেয়ারের বেঁচে থাকার জন্য এটা প্রথমেই দরকার। এখানে টাকা না পেলে তন্ময় ফুটবলে চলে যাবে। ছেলেটা ফুটবলও ভাল খেলে।”
”তাই খেলুক। যে ক্রিকেট ভালবাসে সে অন্য খেলা খেলবে কেন?”
আমি চুপ করে রইলাম।
বাড়িতে ফিরে দেখি তন্ময় আমার জন্য অপেক্ষা করছে। প্রথমেই বলল, ”মতিদা, আমি খেলব।”
অবাক হয়ে গেলাম। বললাম, ”হঠাৎ যে!”
ও ইতস্তত করল কিছু বলার জন্য। মাথা নামিয়ে রইল। আমি আবার বললাম, ”খেলবে, সে তো ভাল কথা, কিন্তু আর আসবে না বলে আবার নিজে থেকেই এসে খেলতে চাইছ, ব্যাপার কী?”
তন্ময় বলল, ”আমার একটা চাকরি পাবার সম্ভাবনা আছে ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ব্যাঙ্কে। ওরা ক্রিকেট টিম করে লিগে সামনের বছর খেলবে। প্রায় তিনশো টাকা মাইনে। ক্রিকেট সেক্রেটারি আর ডেপুটি ম্যানেজার আমার খেলা দেখতে চায়।”
”চাকরি দেবে তো? অনেক সময় দেব বলে খেলিয়ে নিয়ে আর চাকরি দেয় না।”
”তা জানি না। তবে যদি দেয়, একটা চান্স নিয়ে তো দেখি। ওদের ফুটবল টিম অফিস লিগে খেলে। সেখানেও আমাকে খেলাতে পারবে। চাকরি সত্যিই আমার দরকার। সংসার প্রায় অচল হয়ে এসেছে।”
”তা হলে সামনের রোববার খেলো। একটা ক্রুশিয়াল ম্যাচ রয়েছে কসবা ভ্রাতৃসঙ্ঘের সঙ্গে। যদি জিততে পারি তা হলে ফ্রেন্ডস স্পোর্টিং আর আমরা সমান পয়েন্ট হয়ে লিগ—টেবলের টপে চলে যাব। রূপোলি তা হলে দু’পয়েন্ট পিছিয়ে যাবে আমাদের থেকে।” বলতে বলতে আমার হাসি পেল। রূপোলি সঙ্ঘ আমাদের পিছনে থাকবে এটাই বড় কথা, লিগ চ্যাম্পিয়ান হই বা না হই—এই মনোভাব দেখছি আমার মধ্যেও বদ্ধমূল হয়ে গেছে।
তন্ময় বলল, ”ননীদা কোনও আপত্তি করবেন না তো?”
”করে যদি তো কী হবে? আমি ক্যাপ্টেন, আমি যাকে খেলাব সেই খেলবে। কেউ আপত্তি করলেও শুনব না।”
৮
ননীদা কিন্তু আপত্তি করলেন না তন্ময়কে দেখে। রবিবার আমাদের মাঠেই ভ্রাতৃসঙ্ঘের সঙ্গে খেলা। সাতজন মাত্র আমাদের প্লেয়ার হাজির হয়েছে। শুকনো মুখে আমি আর ননীদা তাঁবুর মধ্যে যাচ্ছি আর ফিরে আসছি। খেলার কুড়ি মিনিট মাত্র তখন বাকি। এমন সময় তন্ময় এসে পৌঁছল। ননীদা কপাল এবং ভ্রূ কুঁচকে আমার দিকে তাকালেন।
বললাম, ”তন্ময় আজ খেলবে।”
”আমি তো জানতাম না! টিমে তো ওর নাম দেখছি না?”
”আপনাকে বলতে ভুলে গেছি আজ তন্ময় খেলছে। টিমের কাউকে বসিয়ে দিয়ে ওকে খেলালেই হবে।” আসলে আমি ইচ্ছে করেই আগে বলিনি। ননীদা যদি বাগড়া দেন এই ভয়ে।
”টিমে যে আছে তাকে বিনা দোষে বসানো উচিত নয়।” এই বলে ননীদা আবার তাঁবু থেকে বেরিয়ে গেলেন। কিন্তু তন্ময়কে না খেলিয়ে উপায় ছিল না। চারজন খেলোয়াড় আর এলই না। লিগের শেষ দিকে এইরকমই অবস্থা হয় আমাদের ক্লাবে।
