দুই দলের খেলোয়াড়রা যখন চা খাচ্ছে তন্ময় হঠাৎ সকলকে শুনিয়েই আমাকে বলল, ”ব্যাট আমার চাই না, কিন্তু সেঞ্চুরিটা হতে দিলেন না কেন?”
”তার মানে?” আমি বললাম, ”কে তোমার সেঞ্চুরি হতে দেয়নি?”
”আপনি। ইচ্ছে করে রানআউট করালেন, অতি সহজ রান ছিল। কিন্তু একটা ব্যাট দেবার ভয়ে এই নীচতা আপনি করলেন।”
তন্ময় এরপর অকথ্য ভাষায় কয়েকটা কথা বলল, যাতে রূপোলির ছেলেরাও না শোনার ভাণ করতে বাধ্য হল। অপমানে মুখ কালো করে আমি আর ননীদা চুপ করে রইলাম। চিতু ফিসফিস করে কানের কাছে বলল, ”কী রে, ননীদাকে যে ঘোল করে ছেড়ে দিল। ছেলেটাকে সামনের বছরই রূপোলিতে নিয়ে নেব।”
আমি তখন জ্বলছি। জবাব দিলাম না।
৭
পরের ম্যাচ স্টার স্পোর্টিং—এর সঙ্গে। হাটখোলার ক্যাপ্টেন ভবানী। পুরী যাওয়া বন্ধ করেছে ভবানী এই জন্য। আমি মাঠে এসেছি দর্শক হিসেবে। বলা বাহুল্য, একটা চেয়ারে মিনুকে দেখতে পেলাম। তন্ময়কে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে তার অভব্যতার জন্য।
পরশুদিন রাতে ননীদা আমার বাড়িতে এসে অনুরোধ করেন, ”মতি, এই ম্যাচটায় তুমি বসে যাও।”
”কেন?” সবিস্ময়ে প্রশ্ন করি।
”টাকার দরকার। ব্যাটটা কিনে দেব তন্ময়কে। নয়তো সি সি এইচ—এর মান থাকবে না। ভবানী বলেছে সে একশো টাকা দেবে যদি সামনের ম্যাচে ক্যাপ্টেনসি করতে দেওয়া হয়! তুমি তো বোঝই কী ভাবে ক্লাব—”
ননীদা অসহায়ভাবে থেমে গেলেন। আমি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যাই। তারপর কৌতূহল চাপতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলাম, ”আগের দুটো ব্যাটের জন্য একশো টাকা তন্ময়কে কী ভাবে দিলেন?” ননীদা প্রশ্নটা এড়িয়ে যাচ্ছিলেন অন্য কথা তুলে। চেপে ধরতে বলে ফেললেন, ”তোমার বউদির একজোড়া কানপাশা ছিল, বিক্রি করলাম।” নিঃসন্তান ননীদার স্ত্রী বছর দশেক আগে মারা গেছেন।
ভবানী যথারীতি হাঁকডাক করে দারুণ ব্যস্তভাবে টেন্ট আর মাঠ করছে। মাঝে মাঝে মিনুর কাছে এসে দাঁড়াচ্ছে।
”কী যে করব ভেবে পাচ্ছি না। ওয়ান ডাউন রাজেন বলছে সিক্স ডাউন খেলবে।”
”কেন?” মিনু বলল।
”ভয় পেয়েছে। স্টারের একটা ফাস্ট বোলার আছে, দারুণ পেস।”
”তা হলে তুমি নামো ওয়ান ডাউন।”
”আমি?” ভবানী একটু যেন ঘাবড়ে গেল। ”আমি তো রেগুলার সিক্স ডাউন নামি।”
”আজ তা হলে ওঠো।”
”ইন—কেস যদি কোল্যাপস করে তা হলে কে আটকাবে? ভেরি ইমপরট্যান্ট এটা, তুমি ঠিক বুঝবে না, কতবার এরকম হয়েছে, শেষে আমি গিয়ে ঠেকাই।” বলতে বলতে ভবানীর খেয়াল হয়, আমি ওদের কথা শুনতে পাচ্ছি। চুপ করে গেল সে।
ভবানী ওয়ান ডাউনেই নামল এবং হাটখোলা পনেরো মিনিটেই পাঁচ উইকেটে ১১ রান হল। ভবানী তার মধ্যে এক রান করে নট আউট। স্টারের ফাস্ট বোলারটি একাই উইকেট পাঁচটি নিল। কিন্তু ভবানী সত্যিই আজ পরাক্রান্ত, দুর্ভেদ্য। একবারও কোনও সুযোগ দেয়নি, যেমন বল তেমন খেলছে। সত্যিই অধিনায়কোচিত খেলা। ছয় উইকেটে ১৮, ভবানী তখনও এক রানে দাঁড়িয়ে। মাঝে মাঝে ক্রিজ থেকে আমাদের দিকে তাকাচ্ছে। মিনু তার রুমালটা তখন নাড়ায়, তাই দেখে ভবানী দ্বিগুণ উদ্যমে লড়াই শুরু করে।
সাত উইকেটে ৩২ হল। ভবানী তিন রান করেছে। মিনু এই সময় প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, ”আমরা কি হেরে যাব?”
স্কোরবোর্ড দেখে আমারও মুখ শুকিয়ে এল। বললাম, ”ক্রিকেটে কিছুই বলা যায় না। হয়তো ভবানী এখন একটা সেঞ্চুরি করে ফেলতে পারে।”
”ও কিন্তু দারুণ খেলছে!” মিনু বলল।
”অসাধারণ! কী অথরিটি নিয়ে স্ট্রোক দিচ্ছে, মনেই হচ্ছে না সাতটা উইকেট পড়েছে।” আমি যথাসাধ্য ভবানীর প্রশংসা করলাম।
কথা শেষ করেছি আর ভবানী একটা ছয় মারল। আমরা হইহই করে উঠলাম, মিনু রুমাল নাড়ল। এরপর ভবানীর উপর যেন দৈব ভর করল। পরের তিন ওভারে সে ৫২ রানে পৌঁছল। হাটখোলার সাত উইকেটে ৮৬। পরের দু’ওভারে ভবানী করল আরও ২৯ রান, অর্থাৎ ৮১ হল। এরপর দুটো উইকেট পড়ল ১২ রান যোগ করে। এখন হাটখোলার ৯ উইকেটে ১২৭ রান। শেষ ব্যাটসম্যান নামতেই মিনু উৎকণ্ঠিত স্বরে বলল, ”ওর কি সেঞ্চুরি হবে না?”
বললাম, ”ক্রিকেটে কিছুই বলা যায় না।”
এবং শেষ পর্যন্ত হল না। ভবানী তার ৯৭ রানের মাথায় তাড়াহুড়ো করে রান নিতে যাওয়ায় এগারো নম্বর রান আউট হয়ে গেল। মিনু রুমালে চোখ মুছতে শুরু করল।
ভবানী ফিরে এসে দার্শনিকের মতো বলল, ”ক্রিকেট আর জীবন একই রকম।”
মিনু বলল, ”পরের বার ঠিক সেঞ্চুরি হবে, আমি বলছি হবে। যদি না হয় তো—”
.
পরের ম্যাচ সত্যসন্ধির সঙ্গে। ভবানী প্রথম বলেই বোলড হয়ে গেল। এবারও আমি মাঠের বাইরে দর্শক। মিনু চোখে রুমাল চেপে ধরেছে। ভবানী ফিরে এসে বলল, ”ক্রিকেটের সঙ্গে জীবনের কতটুকুই বা সম্পর্ক!”
দুটি ম্যাচেই সি সি এইচ হেরে গেছে। ভবানী জানিয়েছে, আর সে অধিনায়ক হতে চায় না, প্রয়োজনও নেই। পরের ম্যাচ পাইকপাড়া স্পোর্টিংয়ের সঙ্গে। ভবানী পুরী চলে গেছে, তন্ময় আর আসে না, টিমের আরও দু’জন পরীক্ষার জন্য খেলতে আসে না। দুটো বাচ্চচা ছেলে ওদের বদলে খেলল এবং হারতে হারতে আমরা ড্র করলাম।
এখন আমরা লিগ টেবিলের মাঝামাঝি কয়েকটা ক্লাবের সঙ্গে সমান পয়েন্ট। উপরের প্রথম তিনটি ক্লাবের পয়েন্টও সমান—সমান। তার মধ্যে রূপোলিও আছে। ওদের সঙ্গে সি সি এইচ—এর তফাত মাত্র দুই পয়েন্টের। লড়তে পারলে আমরা এখনও চ্যাম্পিয়ন হতে পারি।
