”যাত্রীর কে যেন কাল অফিস লিগে আপনার খেলা দেখতে গিয়েছিল। তার সঙ্গেই আলোচনা করছিল প্রতাপ ভাদুড়ি। আপনি অনুপমকে নাজেহাল করেছেন শুনে বলল, কমল তো শুনছি রিটায়ার করে গেছে। ওকে কিছু টাকা বেনিফিট হিসাবে দেব ভাবছি, অনেক বছর যাত্রীতে খেলে গেছে তো।”
”কত টাকা দেবে কিছু বলেছে?”
”না।”
”শোভাবাজারের পরের ম্যাচেই আমি খেলছি।”
”তা হলে রিটায়ার করেননি!”
কমল জবাব না দিয়ে হনহনিয়ে এগিয়ে গেল বিস্মিত সাংবাদিককে ভিড়ের মধ্যে ফেলে রেখে।
শোভাবাজার টেন্টে ঢোকার মুখেই কমলের সঙ্গে দেখা হল সত্য আর বলাইয়ের।
”কাল আপনি এলেন না কমলদা? খেলা আরম্ভ হবার পাঁচ মিনিট আগে পর্যন্ত সরোজদা আপনার জন্য অপেক্ষা করেছে।”
”অফিস আটকে দিল।” কমল অপ্রতিভ হয়ে বলল। ”খেললি কেমন তোরা?”
বলাই হেসে বলল, ”আর খেলা! আপনার জায়গায় স্বপনকে নামানো হয়েছিল। তিনটে গোল ওই খাওয়াল।”
”লাস্ট গোলটা, বুঝলেন কমলদা, যদি দেখতেন তো হাসতে হাসতে মরে যেতেন। ওদের শ্যামল বোস দুটো গোল করেছে। রাইট আউট বল নিয়ে এগোচ্ছে। স্বপন ট্যাকল করতে কর্নার ফ্ল্যাগের দিকে এগিয়ে হঠাৎ ঘুরে পেনাল্টি বক্সের মধ্যে শ্যামল বোসের কাছে দৌড়ে এসে দাঁড়াল। ওদিকে রাইট আউট ফাঁকায় এগিয়ে এসে গোল করে দিল। আমরা তো অবাক। বললুম—স্বপন, তুই ওভাবে ছেড়ে দিয়ে এদিকে দৌড়ে এলি কেন? কী বলল জানেন! যদি শ্যামল বোসকে বল দিত আর যদি শ্যামল বোস গোল করত তা হলে ওর হ্যাটট্রিক হয়ে যেত না?”
বলতে বলতে সত্য হো হো করে হেসে উঠল। বলাইও। ”বুঝলেন কমলদা, উফফ, স্বপন হ্যাটট্রিক করতে দেয়নি। ওহঃ, গোল খাও, পরোয়া নেই, হ্যাটট্রিক হোনে নেহি দেগা।”
কমলও হাসল। তারপর চোখে পড়ল, ভরত টেন্টের মধ্যে চেয়ারে বসে তাদের দিকেই তাকিয়ে। কমল এগিয়ে এসে বলল, ”সরি ভরত।”
”আপনি থাকলে কাল গোল খেতুম না।”
”কী করব, অফিসের খেলা ফেলে আসতে পারলাম না।”
”কমলদা, শোভাবাজারে ন’বছর আছি। ফার্স্ট গোলি সাত বছর ধরে। এমন জঘন্য টিম কোনও বার দেখিনি। থার্ড ডিভিশনেও এরা খেলার যোগ্য নয়। না আছে স্কিল না আছে ফুটবল সেন্স। পারে শুধু গালাগালি আর লাথি চালাতে। বলাই, সত্য, শ্রীধর তিনজনকেই রেফারি ওয়ার্ন করেছে। স্বপন যতই বোকামি করুক, প্রাণ দিয়ে খেলেছে ওর সাধ্য মতো।”
”নেকস্ট ম্যাচ কার সঙ্গে? বাটা?”
”হ্যাঁ।”
সেক্রেটারির ঘর থেকে এই সময় সরোজ বেরোল। কমলকে দেখেই গম্ভীর হয়ে উঠল তার মুখ।
”আসতে পারলাম না সরোজ।”
”জানি, অফিসের হয়ে খেলেছেন।”
”পরের ম্যাচে অবশ্যই খেলব। তাতে চাকরি যায় যাবে।”
”সরি কমলদা, টিম হয়ে গেছ। স্বপনই খেলবে।”
”সরোজ, আমি রিটায়ার করেছি বলে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। ওটা মিথ্যা রটনা প্রমাণ করতে আমাকে নামতেই হবে মাঠে।”
”টিম আর বদলানো যাবে না।” সরোজ স্বরে কাঠিন্যের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ”অন্য ম্যাচে খেলবেন।”
শোভাবাজারের মতো নগণ্য টিমের অতি নবীন কোচ যে এভাবে তার সঙ্গে কথা বলবে, কমলের তা কল্পনার বাইরে। কথা না বাড়িয়ে সে সেক্রেটারির ঘরে ঢুকল।
কৃষ্ণ মাইতি বাড়িতে তিন—চার টাকার বেশি বাজার করেন না। বাইরে লুকিয়ে রসনা—তৃপ্তিকর খাদ্য উদরস্থ করাই তাঁর জীবনের একমাত্র শখ। আস্ত চিকেন রোস্ট নিয়ে ধস্তাধস্তি করছিলেন। যখন কমল সামনে এসে বসল, কথা না বলে একবার তাকালেন শুধু তিনি।
”সামনের ম্যাচ বাটার সঙ্গে। কেষ্টদা, আমি খেলতে চাই।”
”বেশ তো, নিশ্চয় খেলবি।”
”সরোজ টিমে আমার নাম রাখেনি।”
”সে কী!” কৃষ্ণ মাইতি চিৎকার করে উঠলেন, ”সরোজ, সরোজ!”
সরোজ ঘরে ঢোকা মাত্র বললেন, ”কমল বাটা ম্যাচ খেলবে।”
”কিন্তু—” সরোজ কড়া চোখে কমলের দিকে তাকাল।
”কিন্তুটিন্তু নয়। কমল কলকাতা মাঠের সব থেকে সিনিয়ার প্লেয়ার। বড় বড় টিম এখনও মাঠে ওকে দেখলে ভয়ে কাঁপে। ও খেলতে চেয়েছে, খেলবে।”
”কিন্তু কেষ্টদা, আমি টিমটা অনেক ভেবেই করেছি একটা বিশেষ প্যাটার্নে খেলাব বলে। তা ছাড়া কমলদা তো একদিনও প্র্যাকটিস করলেন না ছেলেদের সঙ্গে।”
”প্র্যাকটিস!” কেষ্টদা দারুণ বিষম খেলেন। কয়েকবার ব্রহ্মতালু থাবড়ে নিয়ে ধাতস্থ হয়ে বললেন, ”প্যাটার্ন, প্র্যাকটিস সব হবে, সব হবে। যা বললুম তাই করো। কমল খেলবে।”
”আচ্ছা।”
সরোজ বেরিয়ে যাবার সময় কঠিন দৃষ্টি হেনে গেল কমলের দিকে।
”বুঝলে কমল, বাবুরা কোচিং করে ক্লাবকে উদ্ধার করবে। শেষ দিকে পয়েন্ট ম্যানেজ করে তো রেলিগেশন থেকে বাঁচতে হবে। ওঠা—নামা যদ্দিন বন্ধ ছিল, বুঝলে, শান্তিতে ছিলুম।”
”কেষ্টদা, আপনি যে মেয়েদের স্কুলের কমিটি মেম্বার, সেখানে টিচার নেওয়া হচ্ছে। আমার একজন পরিচিত অ্যাপ্লাই করেছে। আপনি একটু দেখবেন?”
”কে হয় তোর?”
”পল্টু মুখার্জির বড় মেয়ে।”
ভ্রূ কুঁচকে কৃষ্ণ মাইতি আঙুলে লেগে থাকা ঝোল চাটতে চাটতে কী যেন ভাবলেন। তারপর বললেন, ”আচ্ছা দেখব’খন। কিন্তু তোর সঙ্গে একটা কথা আছে। যুগের যাত্রীর সঙ্গে লিগের প্রথম খেলা সতেরোই। পয়েন্ট নিতে হবে। যদি নিতে পারিস, তা হলে চাকরিটা হবে।”
কমল অবাক হয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। চাকরি দেবার এরকম অদ্ভুত শর্তের কারণ সে বুঝতে পারছে না।
”কেষ্টদা, তা কী করে হয়!”
