অনুপম বাঁ দিক দিয়ে এগিয়ে গেল বলের আশায়। তার সঙ্গে গেল টিউবের তিনজন। কমল বাঁ পায়ে বলটা ঠেলে দিল দুজন ডিফেন্ডারের মাঝ দিয়ে পেনাল্টি বক্সের মাঝখানে। আর রাইট ইন, যে বল সে একশোটার মধ্যে আটানব্বুইটা গোলের বাইরে মারবে, সে—ই বল গোলে পাঠিয়ে দিল।
খেলা শেষে নতু সাহা হাত বাড়িয়ে এগিয়ে এল কমলের দিকে। কমল থমকে দাঁড়িয়ে অনুপমকে বলল, ”পাস কখন দেবে, কেন দেবে এবং দেবে না, সেটা প্রসূন জানে। বল পেয়ে খেলা যেমন, না পেয়েও তেমন একটা খেলা আছে। সেটাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
অনুপমের কাঁধে একটা চাপড় দিয়ে নতু সাহার হাতটা সরিয়ে কমল টেন্টের দিকে এগিয়ে গেল।
বাড়ি ফেরার পথে সে ট্রামে শুনল, শোভাবাজার তিন গোলে রাজস্থানের কাছে হেরেছে।
.
।।নয়।।
পরদিন অফিসে পৌঁছোনো মাত্র কমল শুনল, রথীন তাকে দেখা করতে বলেছে। ওর চেম্বারে ঢুকতেই রথীন টেলিফোনে কথা বলতে বলতে ইশারায় কমলকে বসতে বলল।
”তারপর,” রথীন টেলিফোন রেখে বলল, ”কাল নাকি দারুণ খেলেছিস!”
”কে বলল!” কমল ভাবতে শুরু করল, রথীনকে এর মধ্যেই কে খবর দিতে পারে!”
”যেই বলুক না। তিন গোল খাইয়ে অনুপমকে মাঠে নামিয়েছিস, এমন থ্রু বাড়িয়েছিস যাতে না ও ধরতে পারে, তারপর গোল দিয়ে মান বাঁচিয়েছিস। সাবাস, অসাধারণ! এক ঢিলে তিন পাখি—একেই বলে।”
কমল কথা না বলে ফিকে হাসল। রথীনের মুখ থমথম করছে।
”একজন সিনিয়ার প্লেয়ার জুনিয়ারকে মাঠের মাঝে অপদস্থ করবে ভাবা যায় না। আনস্পোর্টিং।”
কমল শক খেয়ে সিধে হয়ে বসল। রাগটা কয়েকবার দপদপ করে উঠল চোখের চাউনিতে।
”ব্যাপারটা কী? অনুপম তোর ক্লাবের প্লেয়ার বলেই কি আমি আনস্পোর্টিং?”
”আমার ক্লাব বলে কোনও কথা নয়। একটা উঠতি প্রমিসিং ছেলে, তাকে হাস্যকর করে তুললে সাইকোলজিক্যালি তার একটা সেটব্যাক হয়। এবছর যাত্রীর ফরোয়ার্ড লাইনে অনুপম অত্যন্ত ইম্পর্টান্ট রোল প্লে করছে। যাত্রী শিল্ড পেয়েছে কিন্তু লিগ পায়নি কখনও। আমার আমলে যাত্রীকে আমি লিগ এনে দেব। এ বছর নিখুঁত যন্ত্রের মতো যাত্রী খেলছে। আমি চাই না এর সামান্য একটা পার্টসও বিগড়ে যাক। আমি তা হতে দেব না।” রথীনের মুঠো করা হাতটার দিকে কমল তাকাল। হিংস্র আঘাতের জন্য মুঠোটা তৈরি। কমল নির্লিপ্ত স্বরে বলল, ”আমি কি এবার উঠতে পারি?”
কঠিন চোখে রথীন তাকাল। কমলও।
”আমার কথাটা আশা করে বুঝিয়ে দিতে পেরেছি।”
কমল ঘাড় নাড়ল। তারপর হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়ার ভঙ্গি করে বলল, ”একশো টাকাটা এখনও শোধ দিতে পারিনি, হাতে একদমই টাকা নেই। সামনের মাসে মাইনে পেলেই দিয়ে দেব।”
”না দিলেও চলবে। একশো টাকার জন্য যাত্রী মরে যাবে না।”
”কত টাকার জন্য তা হলে মরতে পারে?”
”মানে!”
”পাঁচ হাজার?”
রথীনের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। কমল সেটা লক্ষ করে বলল, ”আমার মনে হয় না যুগের যাত্রী খুব একটা স্পোর্টিং ক্লাব।”
”এখন তুমি যেতে পারো।’ রথীন দরজার দিকে আঙুল তুলল।
কমল নিজের চেয়ারে এসে বসা মাত্র বিপুল ঘোষ ফিসফিস করে বলল, ”কাল কী রকম খেলেছেন মশাই, অফিসের ছোকরারা খাপ্পা হয়ে গেছে। আপনি নাকি খুব বড় একজন প্লেয়ারকে খেলতে না দিয়ে একাই খেলেছেন?”
”হ্যাঁ।”
”কত বড় প্লেয়ার সে!”
”মস্ত বড়। আট হাজার টাকা নাকি পায়।”
”আ—ট! বলেন কী মশাই, সাত ঘণ্টা চোদ্দো বছর ধরে কলম পিষে আজ পাচ্ছি বছরে আট হাজার। আর এরা একটা বলকে লাথি মেরে পাচ্ছে আট হাজার টাকা! তার সঙ্গে চাকরির টাকাটাও ধরুন।”
”পাক না টাকা। ভালই তো। কলম পেষার থেকে ফুটবল খেলা মোটেই সহজ ব্যাপার নয়।”
কমল আলোচনা বন্ধের জন্য চিঠির গোছা সাজাতে শুরু করল। এগুলোর কুষ্ঠি—ঠিকুজি এখন খাতায় এন্ট্রি করতে হবে। তারপর খামে ভরে দপ্তরির কাছে পাঠানো স্ট্যাম্প দিয়ে ডাকে পাঠাবার জন্য। ভুল হয়ে গেলে একের চিঠি অন্যের কাছে চলে যাবে। চাকরি নিয়ে তখন টানাটানি পড়বে।
রণেন সাহা এতক্ষণ একমনে কাজ করছিল। মাথা না তুলে এবার বলল, ”আজও তিনটের সময় চলে যাবেন নাকি?”
”কেন!” কমল বলল।
”কাল যে দুটো গোল করেছেন।”
কমল হেসে উঠল।
ছুটির কিছু আগে ফোন এল কমলের। অরুণার গলা: ”কমলদা, একবার তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই। বেলেঘাটায় একটা স্কুলে টিচার নেওয়া হচ্ছে। তোমাদের ক্লাবের সেক্রেটারির সঙ্গে একবার আলাপ করিয়ে দেবে? উনি ওই স্কুলের কমিটিতে আছেন। যদি চাকরিটা পাই, তা হলে এখন যেটা করি সেটা বরুণাকে দিয়ে দেব।”
কমল ওকে জানাল, ক্লাবে গিয়ে কেষ্টদার সঙ্গে সে আজকেই কথা বলবে।
অফিস থেকে বেরিয়ে কমল হেঁটেই ময়দানে যায়। আজ যাবার পথে সারাক্ষণ রথীনের কথাগুলো, তার আচরণের পরিবর্তন এবং সব থেকে বেশি ‘আনস্পোর্টিং’ শব্দটি কমলের মাথার মধ্যে ঠকঠক করে আঘাত করতে লাগল।
”এই যে। আপনার কাছেই যাব ভাবছিলুম। দেখা হয়ে ভালই হল।”
চমকে উঠে কমল দেখল, সাংবাদিক সামনে দাঁড়িয়ে। হেসে বলল, ”কেন?”
”একটা কথা জিজ্ঞাসা করা হয়নি, আপনি কি রিটায়ার করেছেন?”
”সে কী! কোথায় শুনলেন?”
”কাল যুগের যাত্রীর টেন্টে গেছলুম। সেখানে প্রতাপ ভাদুড়ি বলল আপনি নাকি রিটায়ার করেছেন।”
চলতে চলতে কমল বলল, ”আচ্ছা, তাই নাকি! আর কী শুনলেন?”
