”করেছে কি না জানি না, কিন্তু তারা কখনওই বলবে না—পাঁচ হাত দূরের থেকে গোল করতে পারব কি না! এই ‘কি না’ অর্থাৎ অনিশ্চয়তা, নিজের উপর অনাস্থা, কখনওই তাদের মুখ থেকে বেরোবে না। দুইকে দুই দিয়ে গুণ দিতে বললে, আপনার কি সন্দেহ থাকতে পারে, উত্তরটা চারের বদলে আর কিছু হবে?”
ঝোঁকের মাথায় কথাগুলো বলে কমল লক্ষ করল, শ্রোতাদের মুখে অসুখী ছায়া পড়েছে।
”আপনার কথাগুলো একদিক দিয়ে ঠিক, তবে কী জানেন, যোগ—বিয়োগটা শিশুকাল থেকে করে করে শ্বাস—প্রশ্বাসের মতো হয়ে যায়, আজীবন দুই দুগুণে চারই বলব। কিন্তু ফুটবল খেলাটা তো তা নয়, একটা বয়সে রপ্ত করে আর একটা বয়সে ছেড়ে দিতেই হয়। যত বড় প্লেয়ারই হোক, একই ভাবে সে খেলতে পারে না চিরকাল। আপনি যেভাবে একদিন চুনী কি প্রদীপ কি বলরামকে রুখতেন, পারবেন কি আজ সেই ভাবে অনুপমকে আটকাতে?”
বক্তার বলার ভঙ্গিতে তেরছা বিদ্রূপ ছিল। কমলের রগ দুটো দপদপ করে উঠল। পিছন দিক থেকে কে মন্তব্য করল, ”নখদন্তহীন বৃদ্ধ সিংহ!”
কমলের ইচ্ছে হল ঘুরে একবার দেখে, কথাটা কে বলল! কিন্তু বহু কষ্টে নিজেকে সংযত রেখে বলল, ”শিক্ষায় যদি ফাঁকি না থাকে, তা হলে যে স্কিল মানুষ পরিশ্রম করে অর্জন করে তা কখনও সে হারায় না, বয়স বাড়লেও।”
”তার মানে, আপনি আগের মতোই এখনও খেলতে পারেন?”
”না। কিন্তু অনুপমদের আটকাবার মতো খেলা বোধহয় এখনও খেলতে পারি।”
প্রত্যেকের মুখে বিস্ময় ফুটে উঠে তারপর সেটি অবিশ্বাস্যতা থেকে মজা পাওয়ায় রূপান্তরিত হল কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। কমলের মনে হল সে বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে।
”বুড়োবয়সে ল্যাজেগোবরে করে ছেড়ে দেবে।”
দাঁতে দাঁত চেপে কমল বলল, ”যাত্রীর সঙ্গে লিগে শোভাবাজারের তো দেখা হবেই, তখন দেখা যাবে’খন।”
কমল যখন চারতলার হলঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির কাছে, শুনতে পেল কে চেঁচিয়ে বলছে, ”ওরে চ্যালেঞ্জ দিয়ে গেল। অনুপমকে জানিয়ে দিতে হবে।”
কমল নিজের সেকশনে আসামাত্রই রণেন দাস তাকে ডাকল, ”এই যে, ছিলেন কোথায় এই দু’দিন? ডুব মারবেন তো আগেভাগে বলে যেতে পারেন না? লোক তো তিনজন অথচ কাজ থাকে বারোজনের। তার মধ্যে একজন কামাই করলে কী অবস্থাটা হয়? এর উপর তিনটে বাজতে না বাজতেই তো প্লেয়ার হয়ে যাবেন।”
যে বিশ্রি মেজাজ নিয়ে কমল চারতলা থেকে নেমে এসেছে সেটা এখনও অটুট। তিক্ত স্বরে সে বলল, ”দরকার হয়েছিল বলেই ছুটি নিয়েছি। ছুটি নেবার অধিকারও আমার আছে।”
”অ। অধিকার আছে? রোজ তিনটের সময় বেরিয়ে যাওয়াটাও বুঝি অধিকারের মধ্যে!”
কমল জবাব দিল না। রণেন দাসকে সে একদমই পছন্দ করে না। লোকটা অর্ধেক সময় সিটে থাকে না। ক্যান্টিন অথবা ইউনিয়ন অফিসঘরে কিংবা চারতলা বা পাঁচতলায় গিয়ে পরচর্চায় সময় কাটায়, চুকলি কাটে আর ওভারটাইম রোজগারের তালে থাকে। ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছে, তিরিশ বছর প্রায় চাকরি করছে, এগারোশো টাকা মাইনে পায়, কিন্তু সিগারেটটা পর্যন্ত চেয়ে খায়। রণেন দাস ডেসপ্যাচের কর্তা।
দুপুর দুটো নাগাদ গেমস সেক্রেটারি নতু সাহা খাতা হাতে কমলের কাছে হাজির হল।
”কাল আপনাকে খুঁজে গেছি, আপনি আসেননি। আজ খেলা আছে বেঙ্গল টিউবের সঙ্গে ভবানীপুর মাঠে।” বলতে বলতে নতু সাহা খাতাটা খুলে এগিয়ে দিল। খাতায় টিমের খেলোয়াড়দের নাম লেখা। কমলের নামটি দু’জনের পরেই। সকলেরই সই আছে নামের পাশে।
প্রথমেই কমলের মনে পড়ল, আজ শোভাবাজারের খেলা আছে, তাকে খেলতেই হবে। কিন্তু সেকথা বললে নতু সাহা রেহাই দেবে না। রথীনের কথাগুলো মনে পড়ল—অফিসের দুটো খেলায় তুই খেলিসনি—এই নিয়ে কথা উঠেছে…তোকে চাকরি দেওয়ায় ইউনিয়ন থেকে পর্যন্ত অপোজিশন এসেছিল….তোর জন্য এ জি এম পর্যন্ত ধরাধরি করেছি।
কমল খাতায় নিজের নামটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে ভাবল, কী করে এখন! শোভাবাজারে আজ তাকে দরকার। সেখানকার টিমেও তার নাম আছে। ওই খেলারই গুরুত্বটা বেশি, কিন্তু এই খেলাটা চাকরির জন্য। অবশ্য খেলব না বলে দেওয়া যায় নতু সাহাকে। তা হলে তিনটে—চারটের সময় অফিস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সুবিধেটা চিরকালের মতো বন্ধ হয়ে যাবে।
”কী হল, সইটা করে দিন। একটু পরেই তো বেরোতে হবে।” অধৈর্য হয়ে নতু সাহা বলল।
”আমাকে আজ বাদ দেওয়া যায় না কি?”
”না না, আমাদের ডিফেন্সে আজ কেউ নেই। ফরোয়ার্ডে শুধু অনুপম। গোবিন্দ তো এক হপ্তার ছুটিতে গেছে, জহরের পায়ে চোট, আজ তো টিমই হচ্ছিল না।”
কমল আর কথা না বলে নিজের নামের পাশে সই করে দিল। সেই মুহূর্তে একবার সরোজের মুখটা সে দেখতে পেল—অসহায় এবং রাগে থমথমে।
.
।।আট।।
প্রগ্রেসিভ ব্যাঙ্কের ভ্যান ওদের চারটের সময় মাঠে পৌঁছে দিল। কমল লক্ষ করে, ভ্যানের এককোণে অনুপম বসে মাঝে মাঝে তার দিকে তাকাচ্ছিল, তাইতে ওর মনে হয়, নিশ্চয় কথাটা কানে গেছে। কমল অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করে। ড্রেস করে মাঠে নামতে গিয়ে সে দেখল, অনুপম ড্রেস করেনি। নতু সাহাকে কমল জিজ্ঞাসা করল, ”অনুপম নামবে না?”
”বলছে, দরকার হলে নামব। বড় প্লেয়ার, বুঝলেন না!” তির্যক স্বরে নতু সাহা বিরক্তি চাপতে চাপতে বলল, ”কিছু বলাও যাবে না, সারা অফিস জুড়ে অমনি ভক্তরা হইহই করে উঠবে।”
