”আপনি কাতানাচ্চিচও ডিফেন্স চাইছেন অর্থাৎ ফুটবলকে খুন করতে চাইছেন?”
সরোজ হঠাৎ গোঁয়ারের মতো রেগে উঠল। কমল এই রকম একটা কিছু হবে আশা করেছিল। সে বলল, ”মোহনবাগানের কাছে আমরা পাঁচ গোল খেয়ে দুটো পয়েন্ট হারাতুম না এই ফরমেশনে খেললে। একটা পয়েন্ট পেতুমই। সেটা কি মন্দ ব্যাপার হত? তুমি মিড ফিল্ড খেলার ওপর বড় বেশি জোর দাও, কিন্তু এখন ওটার আর কোনও গুরুত্বই নেই। এখন লড়াই পেনাল্টি এরিয়ার মাথায়—অ্যাটাকিং অ্যাঙ্গেলকে সরু করে গোলে শট নেওয়ার পথ বন্ধ করে দেওয়ার জন্যে। তুমি এটা বুঝছ না কেন, গোল করাই হচ্ছে খেলার একমাত্র উদ্দেশ্য, খেলা জেতা যায় গোল করেই। শোভাবাজারের ক্ষমতা নেই গোল দেওয়ার কিন্তু গোল খাওয়া তো বন্ধ করতে পারে।”
”কমলদা, আপনার আর আমার চিন্তাধারা এক খাতে বোধ হয় বইছে না। শোভাবাজার টিম যতদিন আমার হাতে থাকবে, আমি আমার চিন্তা অনুসারেই খেলাতে চাই।”
সরোজ কঠিন এবং দৃঢ়স্বরে যেভাবে কথাগুলি বলল তাতে বুঝতে অসুবিধা হয় না, আর তর্ক করতে সে রাজি নয়। কমল মুখটা ঘুরিয়ে আলতো স্বরে বলল, ”বেশ।”
”কাল তা হলে খেলছেন?”
কমল মাথা হেলিয়ে হাসল।
।।সাত।।
দু’দিন কামাই করে কমল অফিসে এল। রণেন দাসকে চেয়ারে দেখতে পেল না। খাটো চেহারার ঘোষদা অর্থাৎ বিপুল ঘোষকে অবশ্য প্রতিদিনের মতো কাঁটায় কাঁটায় দশটায় চেয়ারে বসে কাগজে লাল কালিতে ”শ্রীশ্রীদুর্গা সহায়’ লিখতে দেখা যাচ্ছে। প্রায় সাড়ে চারশো লোকের বিরাট পাঁচতলা অফিস বাড়িটা হট্টগোলে মুখর। সাড়ে দশটার আগে কেউ কলম ধরে না। কলমদের ডেসপ্যাচ বিভাগে তারা মাত্র তিনজন।
বিপুল তার নিত্যকর্ম সেরে কমলকে বলল, ”দু’দিন আসেননি, অসুখবিসুখ করেছিল?”
”এক আত্মীয় মারা গেলেন তাতেই ব্যস্ত ছিলাম। ঘোষদা, আপনার কাছে লিভ অ্যাপ্লিকেশন ফর্ম আছে?”
বিপুল ড্রয়ার থেকে ছুটির দরখাস্তের ফর্ম বার করে দিল। কমল তাতে যা লেখার লিখে সেটা নিয়ে নিজেই গেল চারতলায় লিভ সেকশনে জমা দিতে। সেখানে অনুপম ঘোষালকে ঘিরে অল্পবয়সীরা জটলা করছে। অনুপম যুগের যাত্রীর উঠতি রাইট উইঙ্গার। রথীনই চাকরি করে দিয়েছে। কাল অনুপম হ্যাটট্রিক করেছে কুমারটুলির বিরুদ্ধে।
”আর একটা গোল কি অনুপমের হত না! সেকেন্ড হাফের শুরুতেই প্রসূন তিনজনকে কাটিয়ে যখন সেলফিসের মতো একাই গোলটা করতে গেল, তখন অনুপম তো ফাঁকায় গোল থেকে পাঁচ হাত দূরে। প্রসূন ওকে বলটা যদি দিত, তা হলে কি অনুপমের আর একটা গোল হত না? কী অনুপম, হত কি না?”
মৃদু হেসে অনুপম বলল, ”ফুটবল খেলায় কিছুই বলা যায় না।”
”প্রসূনকে তুই দোষ দিচ্ছিস কেন? অনুপমকে বল দেবে কি, ও তো তখন ক্লিয়ার অফ সাইডে!”
”বাজে কথা। অনুপম, তুই তখন অফ সাইডে ছিলিস কি?”
অনুপম গম্ভীর হয়ে মুখটা পাশে ফিরিয়ে বলল, ”লেফট ব্যাক আর আমি এক লাইনেই ছিলুম!”
”তবে, তবে! আমি কতদিন বলেছি প্রসূনটা নাম্বার ওয়ান সেলফিস। বল পেলে আর ছাড়ে না, একাই গোল দেবে। ওর জন্য যাত্রীর অনেক গোল কমেছে। বালী প্রতিভার দিন পাঁচটা গোল হল বটে, কিন্তু প্রসূন ঠিক ঠিক যদি বল দিতে অনুপমকে, অন্তত আরও পাঁচটা গোল হত। অনুপম হার্ডলি চারটে বলও প্রসূনের কাছ থেকে পেয়েছে কি না সন্দেহ। কী অনুপম, ঠিক বলেছি কি না?”
অনুপম উদাসীনের মতো হেসে বলল, ”যাকগে ওসব কথা।”
”হ্যাঁ হ্যাঁ, বাদ দে তো ফালতু কথা। প্রসূন বল দিল কি না দিল তাতে অনুপমের কিছু আসে যায় না। এর পরের ম্যাচ ইস্টার্ন রেল। অনুপম, আগেই কিন্তু বলে রাখছি, আমার ভাগ্নেটা ধরেছে খেলা দেখার জন্য।”
”সত্যদা, আজকাল ঢোকানো বড্ড শক্ত হয়ে পড়েছে। ডে—স্লিপ দেওয়ার ব্যাপারেও গোনাগুনতি।”
”ওসব কোনও কথা শুনব না। তোমায় ব্যবস্থা করে দিতেই হবে।”
অনুপম, সেকশনাল ইন—চার্জ নির্মল দত্তর টেবিলের দিকে এগোবার উদ্যোগ করে বলল, ”আচ্ছা দেখি।”
দত্তর কাছে বসে কিছুক্ষণ গল্প করে অনুপম রোজই অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ে।
”অনুপম, ইস্টবেঙ্গলের দিন কিন্তু এই রকম খেলা চাই।”
অনুপম এগিয়ে যেতে যেতে হাসল মাত্র।
এবার ওদের চোখ পড়ল কমলের ওপর। দরখাস্তটা হাতে একটু দূরে দাঁড়িয়ে সে অপেক্ষা করছে।
”কী ব্যাপার কমলবাবু, ক্যাজুয়াল? এই টেবিলে রেখে যান।”
কমল রেখে দিয়ে চলে যাচ্ছিল, একজন ডেকে বলল, ”আচ্ছা, আপনার কী মনে হয় অনুপমের খেলা সম্পর্কে? দারুণ খেলে, তাই নয়?”
”হ্যাঁ, দারুণ খেলে।”
”আপনি ওর এ বছরের সব ক’টা খেলাই দেখেছেন?”
”একটাও না।”
”তা হলে যে বললেন দারুণ খেলে!”
”আপনারা বলছেন তাই আমিও বললাম।”
”না না, ঠাট্টা নয়, সত্যি বলুন, ছেলেটার মধ্যে পার্টস আছে কি না। আপনার চোখ আর আমাদের চোখ তো এক নয়।”
কমল কয়েক মুহূর্ত ভাবল। তারপর কঠিন স্বরে বলল, ”শুধু খেলা দেখেই প্লেয়ার বিচার করবেন না। খেলা সম্পর্কে তার অ্যাটিচিউড, চিন্তা, সাধনা কেমন সেটাও দেখবেন। হয়তো ভাল খেলে। কিন্তু গোল থেকে পাঁচ হাত দূরে ফাঁকায় যে দাঁড়িয়ে, সে যদি বলে যে, গোল করতে পারতুম কি না কিছুই বলা যায় না, তা হলে আমি তাকে প্লেয়ার বলে মনে করব না।”
”পৃথিবীর বহু বড় প্লেয়ার এক হাত দূর থেকেও তো গোল মিস করেছে।”
