আর ভাবতে পারলুম না। কঁদো কাঁদো গলায় বললুম, ছোটমামা! তাহলে সিঙ্গিমশাইয়ের বাগানের সেই গলায়দড়ে ভূতটা আপনি সেজে আমাকে এখানে টেনে এনেছিল।
শাট আপ! –বলে ছোটমামা উঠে দাঁড়ালেন। খালি বাজে গল্প! মিথ্যুক! লোভী! বিশ্বাসঘাতক! তোর শাস্তি পাওয়া উচিত। থাক তুই শ্মশানে পড়ে। আমি চললুম।
ছোটমামা দৌড়তে থাকলেন। আমি মরিয়া হয়ে ওঁকে অনুসরণ করলুম। ভাগ্যিস, ওঁকে টর্চ জ্বেলে দৌড়তে হচ্ছিল। তাই ওঁর নাগাল পেতে অসুবিধা হচ্ছিল না…
যাই হোক, বাড়ি ফিরে দুজনেই ঘটনাটা চেপে গিয়েছিলুম। ছোটমামা বলে দিলে মা ওঁকে খুব বকাবকি করতেন। আমি বললে শুধু মা নন, বাবাও আমাকে মিথ্যকের চূড়ামণি বা আর পেটুক সাব্যস্ত করে একটা জব্বর শাস্তি দিতেন।
ছোটমামার রাগ পড়তে তিন দিন লেগেছিল। তবে আমার কথা উনি কিছুতেই বিশ্বাস করেননি। আমার মনে এই দুঃখটা আজও থেকে গেছে। তবে ঠকে শিখেছি, আম কুড়োতে গেলে সাবধান থাকাই উচিত। আর হ্যাঁ, ভোঁদাকে ঘটনাটা চুপিচুপি বলতেই সে আমায় চিমটি কেটে বলেছিল,–তুই সত্যি বড় বোকা পুঁটু। গলায়দড়ে ব্যাটাচ্ছেলে যখন আম সাবাড় করছিল, তুই রাম বললেই পারতিস! রাম নামে সব ভূত জব্দ। আমের বদলে রাম। মনে রাখিস।
কাটিহারের গঙ্গারাম
ছোটমামার সঙ্গে রাতবিরেতে বাইরে কোথাও গেলেই কী সব বিদঘুটে কাণ্ড বেধে যায়। তাই ছোটমামা সাধাসাধি করলেও সন্ধ্যার পর তার সঙ্গে কোথাও যেতুম না। সে কলকাতায় যাত্রা দেখতেই হোক, কী মেলা দেখতেই হোক। অবশ্য সব সময় দোষটা যে ছোটমামারই, এমন কিন্তু নয়। কোথাও দিনদুপুরে গিয়ে কোনও কারণে ফিরতে সন্ধ্যা বা রাত্রি তো হতেই পারে। তখন কী আর করা যাবে?
তেমনই একটা রাতের বিদঘুটে কাণ্ডের কথা মনে পড়ে গেল। সেটা গোড়া থেকেই বলা যাক।
ঠাকুরদা সপ্তাহে তিনদিন দাড়ি কামাতেন। আর তাঁর দাড়ি কামাতে আসত ভোলারাম নরসুন্দর। ভোলারামকে নাপিত বললেই জিভ কেটে সে বলত, ছি-ছি! নাপিত বলতে নেই। নাপিত বললে কী হবে জানো খোকাবাবু? এই বয়সেই বড়বাবুর মতো তোমার গোঁফদাড়ি গজিয়ে যাবে। আমাকে বলবে নরসুন্দর। কেমন?
এই ভোলারামের অভ্যাস ছিল দাড়ি কামাতেকামাতে গাঁয়ের সবরকম খবর বলা। গাঁয়ের খবর ফুরিয়ে গেলে তখন সে অন্য গাঁয়ের নানারকম খবর বলা শুরু করত। ঠাকুরদা আরামে চোখ বুজে থাকতেন আর হুঁ দিয়ে যেতেন।
সেবার শরৎকালে এক রোববারের সকালে ভোলারাম ঠাকুরদার দাড়ি কামাতে এসেছে। উঠোনে পেয়ারাতলায় চেয়ারে বসে ঠাকুরদা পা ছড়িয়ে চোখ বুজে আছেন। ভোলারাম অভ্যাসমতো ঠাকুরদার গালে সাবান মাখাতে-মাখাতে বকবক করে চলেছে। দাড়ি কামানো হয়ে গেলে সে ঠাকুরদার গোঁফ ছাঁটতে কচি বের করল। তার খবরের এইখানটায় ছিল সিঙ্গিমশাইয়ের ঠাকরুনদিঘির মাছ। জেলেরা জালে একটা দশ কেজি মাছ তুলেছিল। মাছটার লেজের কাছে নাকি সিঙ্গিমশায়ের নাম লেখা। গাঁসুদ্ধু লোক ভিড় করে দেখতে গিয়েছিল।
এবার মাছের কথায় আরও কত খবর এসে গেল। গোঁফ ছাঁটা হয়ে গেলে আয়নায় গোঁফ দেখতে-দেখতে ঠাকুরদা বললেন, হ্যাঁ হে ভোলারাম! এরকম মাছের খবর তো দিচ্ছ। কিন্তু আজকাল আগের মতো বড়-বড় খয়রা মাছ দেখি না কেন? বড় খয়রা কেন, ছোট খয়রারও পাত্তা নেই।
ভোলারাম বলল, কী যে বলেন বড়বাবু? খয়রার পাত্ত থাকবে না কেন? আর ছোট খয়রা কী বলছেন, এই হাতের মতো বড়-বড় জ্যান্ত খয়রা বিক্রি হচ্ছে। দোমোহানির হাটে। বিলভাসানো জল টেনে নিচ্ছে মৌরি নদী। আর নদীর মুখে জাল পেতে বসে আছে জেলেরা। পেল্লায় সাইজের খয়রা জালে উঠছে। দেখলে চোখ জ্বলে যাবে বড়বাবু!
ঠাকুরদা চেয়ারে সোজা হয়ে বসে বললেন, বলো কী হে! শুনেছি দোমোহানিতে হাট বসে বিকেলবেলায়। তিন মাইল মেঠো রাস্তায় পায়ে হেঁটে তোমার পেস্লায় সাইজের খয়রা আনতে যাবে কে?
ছোটমামা সবে তখন বাড়ি ঢুকছিলেন। তাকে দেখিয়ে ভোলারাম বলল, ওই তো! নান্টুবাবুকে পাঠিয়ে দিলেই হল। দুপুরে খেয়েদেয়ে বেরিয়ে যাবেন। পড়ন্ত বেলায় বিল থেকে মাছ আসতে শুরু করবে। সস্তার তিন অবস্থা বলে কথা আছে না? দশ টাকা কেজি দর হাঁকতে-হাঁকতে মেছুনিমাসিরা শেষ অবধি পাঁচ টাকায় দর নামাবে। অত খদ্দের কোথা?
ছোটমামার ডাকনাম নান্টু আর আমার ডাকনাম পুঁটু। ঠাকুরদার হুকুম না মেনে উপায় নেই। ছছাটমামা মুখ ব্যাজার করে ঘরে ঢুকলেন। বিকেলে স্কুলের মাঠে ক্রিকেটের টুর্নামেন্ট! আমিও মনমরা হয়ে গেলুম। একা-একা কি খেলা দেখতে ভালো লাগে?
ভোলারাম নরসুন্দর ছুরি-কাঁচি-নরুন গুটিয়ে ছোট্ট বাকসোতে ভরে আমার দিকে তাকাল। চোখ নাচিয়ে সে বললে,—পুঁটুবাবু! তুমিও মামার সঙ্গে যেও। দোমোহানির হাটতলায় ম্যাজিকবাজির তাঁবু বসেছে। কাটা মুণ্ডুর খেলা দেখলে তুমি একেবারে অবাক হয়ে যাবে। হ্যাঁ গো পুঁটুবাবু! দু-চোখের দিব্যি। আমি নিজে গিয়ে দেখে এসেছি, কাটামুণ্ডু কথা বলছে।
ঠাকুরদা সায় দিয়ে বললেন,বাঃ! এখন তো পুজোর ছুটি। পুঁটু! নান্টুর সঙ্গে দোমোহানি গিয়ে ম্যাজিক দেখে এসো। আমি বাড়তি টাকা দেব।…
পাড়াগাঁয়ের ছেলেদের পায়ে হাঁটার অভ্যাস তখনও ছিল। এদিকের লোকে দূরত্ব মাপতে কিলোমিটার বলত না। কিলোগ্রাম বা কেজি অবশ্য চালু হয়েছিল। কিন্তু মাইল বা ক্রোশ কথাটা চালু ছিল। তিন মাইল মানে দেড় ক্রোশ।
