ছোটমামা টর্চের আলো ফেলতে-ফেলতে আমগাছের অজস্র গুঁড়ির আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। কোনও গাছের মাথায় একটা পাখি ডানার জল ঝাড়ল। সেই শব্দেই আমার বুক ধড়াস করে উঠেছিল। কিন্তু সুস্বাদু আমের মিঠে গন্ধ আমার ভয়টয় ক্রমশ তাড়িয়ে দিচ্ছিল।
কতক্ষণ পরে ধুপধুপ শব্দে ছোটমামা এসে গেলেন। নাহ। গাছটা খুঁজে পেলুম না। ওদিকে দিঘির পাড়ে টর্চের আলো দেখলুম, ভোলা আসছে।
–ছোটমামা! বড্ড অন্ধকার যে!
–হুঁ, টর্চ জ্বালি আর ভোলা দেখতে পাক! খালি বোকার মতো কথাবার্তা। থলেটা আমায় দে। আর আমার এই হাতটা ধরে থাক। ছাড়বিনে বলে দিচ্ছি।
ছোটমামা আমভর্তি থলেটা নিলেন, কিন্তু ওঁর একটা হাত ধরেই ছেড়ে দিলুম। উঃ! কী সাংঘাতিক ঠান্ডাহিম হাত!
ছোটমামা বললেন, কী হল? হাত ছাড়লি কেন?
–আপনার হাত যে বিচ্ছিরি ঠান্ডা!
–ধুর বোকা! জলকাদা ঘেঁটে আম কুড়িয়েছি, হাত ঠান্ডা হবে না? চলে আয় শিগগির!
এই সময় সত্যিই ভোলার হেঁডেগলার গান শুনতে পেলুম। ছোটমামার বরফের মতো ঠান্ডা হাতটা অগত্যা চেপে ধরে থাকতে হল। ছোটমামা এবার প্রায় হন্তদন্ত হয়ে দৌড়চ্ছেন। আমিও দৌডুচ্ছি।
কতক্ষণ দৌড়েছি জানি না। আমি এবার হাঁপিয়ে পড়েছিলুম। কাঁদো কাঁদো গলায় বললুম,–ছোটমামা। আমার পা ব্যথা করছে যে!
ছোটমামার মনে দয়া হল, বললেন, হুঁ। অনেকটা ঘুরপথে আসতে হল। কিন্তু কী আর করা যাবে? এবার আস্তেসুস্থে যাওয়া যাক।
অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না। এখানে-ওখানে ঝাঁকে ঝাঁকে জোনাকি জ্বলছে। কাছে কোথায় আচমকা শেয়াল ডাকতে থাকল। একটু ভয় পেয়ে বললাম, আমরা কোথায় এসে পড়েছি ছোটমামা?
–নদীর ধারে। ঝুঝলি না? ভোলার চোখ রাতবিরেতেও দেখতে পায় তাই পুরো গ্রামটার পাশ দিয়ে ঘুরতে হল। বলে ছোটমামা অদ্ভুত শব্দে হাসলেন। –তা পুঁটু! এবার একটা আম টেস্ট করে দেখি। কী বলিস? সিঙ্গিমশাইয়ের বাগানের আমের এত নামডাক। দেখি, সত্যি কি না।
ছোটমামা সেখানেই বসে পড়লেন। তারপর তেমনি অদ্ভুত শব্দে আম খেতে শুরু করলেন। চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি আর ভাবছি, এবার আমাকেও একটা আম খেতে দেবেন ছোটমামা। কিন্তু উনি যেন আমার কথা ভুলেই গেছেন। ক্রমাগত আম খাচ্ছেন আর আঁটিগুলো ছুঁড়ে ফেলছেন। শব্দ শুনে বুঝতে পারছি, ওগুলো জলেই পড়ছে।
কিছুক্ষণ পরে না বলে পারলুম না, কেমন আম ছোটমামা?
জিভে একটা শব্দ করে ছোটমামা বললেন,-ফাস্টো কেলাস! তুই খেলে টের পেতিস পুঁটু! কিন্তু কী আর করা যাবে? সবগুলোই যে আমি কেঁকের বশে খেয়ে ফেললুম!
প্রায় ভ্যাঁ করে কেঁদে ওঠার মতো বললুম, স-ব?
–হ্যাঁ। তোর কথা মনেই ছিল না। বরং তার বদলে তোকে একটু আদর করি। বলে ছোটমামা আমার মাথায় তারপর মুখে হাত বুলোতে থাকলেন। কী অসহ্য ঠান্ডা হাত! আমি চেঁচিয়ে উঠলুম,–আর না ছোটমামা! বড় ঠান্ডা লাগছে যে!
–আমের গন্ধ কেমন মিঠে টের পাচ্ছিস বল পুঁটু! এই নে। আমার হাত শোক।
ছোটমামার আঙুল আমার নাকে ঢুকতেই আঙুলটা চেপে ধরলুম। তারপরই টের পেলুম আঙুলটা বেজায় শক্তও বটে। আঙুল না হাড়ঃ রাগে-দুঃখে কেঁদে ফেললুম। ছোটমামা আদুরে গলায় বললেন, কাঁদে না ছোঁড়া? কাল তোমায় আম খাওয়াব। এবার আমি নদীর জলে হাত ধুয়ে আসি।
ছোটমামা যে এমন অদ্ভুত কাণ্ড করবেন, কল্পনাও করিনি। উনি উঠে গেলেন হাত ধুতে, গেলেন তো গেলেনই। আর ফেরার নাম নেই। জলের ওপর এতক্ষণে তারা ঝিলমিল করছে দেখতে পেলুম। আবার একদল শেয়াল ডেকে উঠল। তখন ভয় পেয়ে ডাকলুম,–ছোটমামা! ছোটমামা!
কিন্তু কোনও সাড়া এল না। আমি এবার মরিয়া হয়ে আরও জোরে ওঁকে ডাকতে থাকলুম। কিছুক্ষণ পরে একটু দূরে টর্চের আলো ঝিলিক দিল। তারপর ছোটমামার গলা ভেসে এল, পুঁটু! পুঁটু!
সাড়া দিলুম। ছোটমামা দৌড়তে-দৌড়তে কাছে এলেন। তারপর টর্চের আলোয় খালি থলে দেখে প্রচণ্ড খাপ্পা হয়ে বললেন,–বিশ্বাসঘাতক! এইটুকু ছেলের হাড়ে হাড়ে এত বুদ্ধি! নদীর ধারে শ্মশানের কাছে আম নিয়ে পালিয়ে এসেছে। তারপর হায়! হায়! সবগুলো আম একা সাবাড় করেছে!
অবাক হয়ে বললুম,–ছোটমামা! আপনিই তো—
উনি থাপ্পড় তুলে বললেন, আমিই তো মানে? মিথ্যুক কোথাকার!
-না ছোটমামা! আপনিই তো আমাকে এখানে এনে আমগুলো একা খেয়ে তারপর নদীর জলে হাত ধুতে গেলেন।
–শাট আপ! দেখি তোর মুখ খুঁকে!
আমার মুখে আমের গন্ধ পেয়ে ছোটমামা আরও তর্জন-গর্জন জুড়ে দিলেন। ওঁকে কিছু বলার সুযোগ পাচ্ছিলুম না। একটু পড়ে উনি হতাশ হয়ে ভিজে ঘাসে বসে পড়লেন। বাতাসাভোগ আমগাছটা খুঁজে না পেয়ে ফিরে এসে দেখি, তুই নেই। ভাবলুম, ভোলা আসছে টের পেয়ে তুই বাড়ি চলে গেছিস। বাড়িতে তোকে পেলুম না। তারপর তোকে ডেকে ডেকে–ওঃ! পুটু রে! তুই এমন করবি ভাবতেও পারিনি।
–বিশ্বাস করুন ছোটমামা! আমি আম খাইনি। আপনিই খেয়েছেন।
–আবার মিথ্যে কথা? তোর মুখে আমের গন্ধ।
–আপনিই তো আদর করছিলেন এঁটো হাতে। কী সাংঘাতিক ঠান্ডা আপনার হাত!
আমার হাত ঠান্ডা? বাজে কথা বলবিনে!–বলে ছোটমামা ওঁর একটা হাত আমার গলায় ঠেকালেন।–বল এবার। আমার হাত ঠান্ডা না গরম?
কী আশ্চর্য! ছোটমামার হাত তত মোটেই তেমন ঠান্ডা নয়। অমনি বুকটা ধড়াস করে উঠল। তাহলে কে ছোটমামা সেজে আমাকে নদীর ধারে শ্মশানে এনেছিল? তার আঙুলটা নিরেট হাড় কেন?
