পটলাদা বলে চললেন, “এরপর মারাত্মক কয়েকটা লাইন রয়েছে। বিবেকানন্দ জানাচ্ছেন, গরিবরা এক ডেলা চিনি মুখের মধ্যে রেখে তার উপর দিয়ে চা পান করে এবং একজনের পান শেষ হলে, আর একজনকে সে চিনির ডেলাটা বার করে দেয়। সে ব্যক্তিও সে ডেলাটা মুখের মধ্যে রেখে পূর্ববৎ চা পান করে।”
পটলাদা আর একটা পয়েন্ট তুললেন। “ভাল চা ভালভাবে পান করবার লোক সংসারে কম নেই। তারা যে ভাল লোক তাও মেনে নিচ্ছি, কিন্তু ক’জন নামীদামী লোক নিজেই চা তৈরি করতে পেরেছেন? রবীন্দ্রনাথ চা রসিক, কিন্তু তাঁকে রান্নাঘরে ঢুকে চা করতে দেখা গিয়েছে এমন বর্ণনা আজও আমার নজরে পড়েনি। বিবেকানন্দের ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই, যিনি হাঁড়ি হাঁড়ি খিচুড়ি বা পলান্ন রাঁধতে পিছপা নন তার পক্ষে চা তৈরি তো নস্যি! এর ভূরি ভূরি বর্ণনা রয়েছে, মাঝরাতেও এইসব বাই উঠেছে, কিন্তু লোকশিক্ষকরা নিজেরা কিছু করেই হাত গুটিয়ে নেন না, অন্যদেরও মাঠে নামান।
আমি বললাম, “পুণাতে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় এই কাণ্ডটা করেছিলেন। স্বহস্তে শ্যামপর্ণী প্রস্তুত করে এই অধমকে খাইয়েছেন, তারপর শিষ্যকেও সুযোগ দিয়েছে পরের রাউন্ডটা খেলবার। আমার উইকেট পতন হয়নি, এই কারণে যে, ছাত্রাবস্থায় ইস্কুলের হেডমাস্টারমশাই বিবেকানন্দ-পাগল হাঁদুদা ওরফে সুধাংশুশেখর ভট্টাচার্যের বাড়িতে অভ্যাগতদের জন্য বহুবার চা তৈরি করতে হয়েছে। তবে ফুল মার্কস পাওয়া সম্ভব নয়, কারণ প্রেসার স্টোভ জ্বালানোর দক্ষতা আমি শত চেষ্টাতেও অর্জন করতে পারিনি। হায়, তখন যদি এল পি জি গ্যাস থাকতো তা হলে একশ’র মধ্যে একশ আমিও পেতাম।”
পটলাদা বললেন, “বিখ্যাত লেখক শরদিন্দু একজন অখ্যাত লেখককে দয়াপরবশ হয়ে চা তৈরির ঘরানা দিলেন, এটা প্রমাণ করে যে তিনি ছিলেন স্নেহপ্রবণ, দয়ার শরীর তার। কিন্তু চাপ্রেমী বিবেকানন্দর মধ্যে ছিল মিশনারি মনোবৃত্তি। শোন, স্বয়ং বালগঙ্গাধর তিলককে স্বামীজি আসরে নামিয়ে দিয়েছিলেন। রেকর্ডে রয়েছে, বেলুড় মঠে এসে ‘মোগলাই’ চা প্রস্তুত করে লোকমান্য তিলক সকলকে চা খাইয়েছিলেন। জায়ফল, জয়ত্রী, ছোট এলাচ, লবঙ্গ, জাফরান ইত্যাদি একসঙ্গে সিদ্ধ করিয়া ঐ সিদ্ধ জলের কাথে চা, দুধ, চিনি মিশাইয়া এই চা প্রস্তুত হইয়াছিলো।”
ভীষণ ব্যাপার! বেলুড় মঠে টিবয়ের ভূমিকায় স্বয়ং তিলক। “কিন্তু পটলাদা, ঐ মোগলাই ব্যাপারটায় একটু খটকা লাগছে। মোগলসম্রাট আকবর কি কখনও চা খাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন? আইন-ই আকবরিতে তো কোন চায়ের উল্লেখ নেই। চাকফি-কোকো এবং সেই সঙ্গে লঙ্কা এটসেটরা এদেশের আসর আলোকিত করলো মোগলসম্রাট শাজাহানের আমল থেকে। তার আগে আমাদের নোলাতে ছিল অবিশ্বাস্য অপূর্ণতা। সপ্তদশ শতকে এক সাহেব (ওডিংটন) সুরাটের বেনেদের আসরে চা-পানের বর্ণনা দিচ্ছেন। সেই চায়ে চিনি নেই, কিন্তু আছে মাথাধরা ছাড়াবার জন্যে নানারকম মশলা ও কণেক ফোঁটা লেবুর রস।
পটলাদা বললেন, “ইতিহাসে একটু-আধটু উল্লেখ যেখানেই থাকুক, বিশ শতকটাই চায়ের শতক–চেয়ো বাঙালি প্রাণভরে চায়ের সায়রে ডুব দিলো, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের উপদেশ সে কানেই নিলো না। ভাড়ে চা, কাপে চা, রুপোর সরঞ্জামে চা, কাগজের পাত্রে চা, প্লাস্টিকের আধারে চা। শুনেছি এক-আধজন রসিক মাঝে মাঝে সাবেকি বাঙালি কায়দায় বেলের। খোলাতেও চা পানের এক্সপেরিমেন্ট করেছে।”
একটু থেমে পটলাদা বললেন, “অনেকে বদনাম দিয়েছে, বাঙালির বদহজম, ডিসপেপসিয়া ইত্যাদির পিছনে চায়ের অবদান নিতান্ত কম নয়। খালি পেটে চা-খাওয়ার এমন দুঃসাহস পৃথিবীর খুব কম জাতই দেখাতে পেরেছে। কিন্তু আমার মনে হয়, চা আমাদের মস্ত উপকার করেছে, আমাদের চেয়ে মাতালরা এদেশের মোদো মাতালদের সবসময় দাবিয়ে রেখেছে। মাদকতার প্রসার যতটা হতে পারতো এই বঙ্গভূমে ততটা হয়নি স্রেফ এই চায়ের জন্যে।”
“টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি শেষ হয়ে গিয়েছে। একবিংশ শতকেও আমাদের এই কলকাতায় চা যুগ যুগ জিও!”
পটলাদা এবার কিন্তু মোটেই উৎসাহ দেখালেন না। “অনেকদিন পরে এলাম, পরিস্থিতি মোটেই সুবিধের নয় মুখুজ্যে। কলকাতার পুরনো চায়ের দোকানগুলো আরও মলিন হয়ে ধুকছে–চায়ের সঙ্গে তারুণ্যের সম্পর্কটা খালি চোখে ধরা পড়ছে না। মনে হচ্ছে, কফির অভাবনীয় অনুপ্রবেশ ঘটছে।”
“সে তো পঞ্চাশ বছরের ওপর চলছে পটলাদা, কফি হাউস ইনটেলেকচুয়ালরা তো সব বাহাত্তুরে হতে চললো।”
“ওরে সে তো মাত্র দু’খানা কফি হাউসে কলেজ স্ট্রিটের অ্যালবার্ট হলে আর চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউতে কটা আর তোক ধরতো, বাকি সবাই তো চায়ের খদ্দের। জেনুইন বাঙালি তো বাড়িতে কখনও কফি ঢুকতে দেয়নি, কফি বোর্ডের প্রাণান্ত প্রচার সত্ত্বেও। এবার তো পদে পদে দুঃসংবাদ, পাড়ায় পাড়ায় বারিস্তা, কাফে কফি এটসেটার সমারোহ শহরের ছেলেমেয়ে, বুড়োবুড়ি সবাই ওইসব জায়গায় দ্বিগুণ-ত্রিগুণ দামে কফি পান করতে বদ্ধপরিকর। চায়ের বাঙালি এবং বাঙালির চা মস্ত চোট খেতে চলেছে।”
“বাঙালির রক্তে চায়ের লিকার রয়েছে, কেউ কিসসু করতে পারবে না পটলাদা, পোড়া শালপাতার গন্ধওয়ালা কফি এবং দার্জিলিঙের শ্যামপেনসম চা যে এক বস্তু নয় তা বাঙালির পক্ষে ভোলা সম্ভব নয়।”
