“চোখ বুজে থাকাই আমাদের জাতীয় স্বভাব। বিয়েবাড়িতে মিষ্টি দই উঠে গেল। নিমন্ত্রিতরা আইসক্রিম চাখছে এটাও তো ভাবা যেতো না, শেষ হয়ে গেল মিষ্টি দইয়ের সাংস্কৃতিক আধিপত্য। মাটির খুরিকে দাবড়াচ্ছে প্লাস্টিক কাপ, ভাবা যায় না! রসনার রাজত্বেও সংখ্যালঘু হবার দুঃখ কি তা তোরা এখনও বুঝতে চেষ্টা করছিস না।”
পটলাদা বললেন, “বিশেষ একটা লবি তিনশ বছর ধরে কফিকে জাতে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছে, অথচ এঁরা জানতেন সুরসিক সম্রাট চতুর্দশ লুই প্রথমে কফি পান করে মোটেই সন্তুষ্ট হননি। অথচ ফ্রান্সে প্রচারের ধাক্কায় কফির এমন প্রমোশন হলো যে লেখা হলো, ইংরেজের চা, জার্মানদের বিয়ার, স্প্যানিয়ার্ডের চকোলেট, তুর্কের আফিম আর ফরাসির কফি এক জিনিস। এই পানীয়কে জনপ্রিয় করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন প্যাস্কাল নামে এক ভদ্রলোক, যাঁকে কফি মিশনারি বলা যেতে পারে। প্যারিসের এক মেলায় উর্দিপরা ওয়েটাররা গরম কফি ফেরি করতে লাগলো। মেলা শেষ হয়ে যাওয়ার পর প্যাস্কাল এক কফি বুটিক খুলেছিলেন। খরিদ্দারের ভিড় থাকায় প্যাস্কালকে পাড়ায় পাড়ায় গরম কফির ফেরিওয়ালা পাঠাতে হতো। তারপর ডাক্তাররা কফির গুণে মোহিত হয়ে নাকি রোগীদের বলতে লাগলেন কফি খাও।”
পটলাদার দুঃখ চায়ের প্রচারের জন্য কেউ কিছু করে না, কলকাতার চায়ের দোকানগুলোর সঙ্গে কফির দোকানগুলোর তুলনা করলেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। “বাঁচতে হলে বিবেকানন্দর প্রদর্শিত পথে তোদের ফরাসী সাহায্য ভিক্ষা করতে হবে। জপল স্টেশনের কাছে একটা টি সালো আছে যেখানে কুড়িটা দেশের তিনশো রকম চা মজুত থাকে, আর আছে দুশ রকমের টি-পট, রসিকের মর্জি অনুযায়ী চা পরিবেশন করবে ফরাসী সুন্দরীরা। আমাদের এই শহরে চা আছে, টি-পট আছে, দোকান আছে, সুন্দরীরাও অঢেল, নেই শুধু আইডিয়া এবং উদ্যম, ফলে দার্জিলিঙের এতো কাছে থেকেও আমরা বিবেকানন্দের শহর কলকাতাকে চায়ের ওয়াটারলু করে তুলেছি।”
বললাম, “এক সময় ব্যান্ডেল স্টেশনেই দশ রকম গরম চা পাওয়া যেতো, রসিকরা জানতেন কোন্ ভেন্ডারের কেটলিতে কি জিনিস আছে।”
“কলকাতার কপালে অনেক দুঃখ! ভড়কে চায়ের প্রচারে নিয়োগ না করে তা দিয়ে পূজামণ্ডপ বানানো হচ্ছে,” পটলাদার খেদোক্তি।
“তা হলে কিংকর্তব্যম, পটলাদা?”
“খোদ কলকাতায় কফির হাতে চায়ের পরাজয় হবার আগেই যেন আমার কলকাতায় আসা বন্ধ হয়। কফির সঙ্গে পাঞ্জা লড়া, প্রয়োজনে কফির দোকানের সামনে অবস্থান প্রতিবাদ করা, লোককে বলা, কলকাতার সেরা মানুষরা কখনও কফিকে প্রশ্রয় দেননি, বড়জোর নিষিদ্ধ পানীয় হিসেবে নমাসে ছ’মাসে একবার কফি হাউসে পদার্পণ করেছেন। অমন যে অমন স্বামী বিবেকানন্দ তিনিও খোদ প্যারিসে সূর্যাস্তের পর কফি পান করতেন না, ওতে ওঁর ঘুমের বারটা বেজে যায়।”
আমি পটলাদার পয়েন্টগুলো নোট করে নিচ্ছি। পটলাদা বললেন, “বাঙালির বাঙালিত্ব বলতে ওই চটনা ওঠা চায়ের কাপটুকুই পড়ে আছে, ওটা কিছুতেই আমরা ছাড়বো না, আমাদের চূড়ান্ত দাবি, কফি দূর হটো! বিবেকানন্দের চা, যুগ যুগ জিও। যুগ যুগ জিও।” এই বলে পটলাদা উঠে পড়লেন। এন আর আই মানুষ, কলকাতা ছাড়বার আগে ক্যামেরায় কলকাতার বিলুপ্তপ্রায় চায়ের দোকানগুলোর ছবি তাকে তুলে নিতে হবে।
৪. সন্ন্যাসীর শরীর
শরীরম্ ব্যাধিমন্দিরম্! এদেশের কোন মহাপুরুষ কথাটা প্রথম ব্যবহার করেছিলেন তা আমার জানা নেই। স্বামী বিবেকানন্দের অসুখবিসুখ সম্বন্ধে খবরাখবর নিতে গেলেই কথাটা কিন্তু বারবার মনে পড়ে যায়। আমার পিতৃদেব অকালে মৃত হয়েছিলেন, সেই থেকে পিতৃস্থানীয়দের অকালপ্রয়াণ এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর ওই ধরনের দুর্ঘটনার সুদূরপ্রসারী প্রভাব আমাকে আজও নাড়া দেয়। এই মানসিকতা থেকেই নরেন্দ্রনাথ দত্ত ওরফে স্বামী বিবেকানন্দের শরীর-স্বাস্থ্য আমার অনুসন্ধানের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
নরেন্দ্রনাথের পিতৃদেব বিশ্বনাথ দত্তর মৃত্যু হয় ১৮৮৪ সালে, ৫২ বছর বয়সে। তার জ্যেষ্ঠপুত্রের বয়স তখন ২১ বছর।
কর্পোরেশন ডেথ রেজিস্টার অনুযায়ী বিশ্বনাথ দত্তের মৃত্যুর কারণ বহুমূত্ররোগ, দেহাবসানের তারিখ ২৩শে ফেব্রুয়ারি ১৮৮৪। স্বামী গম্ভীরানন্দের বিবরণ সামান্য আলাদা : “১৮৮৪ খ্রীষ্টাব্দের ২৫শে ফেব্রুয়ারি সোমবার অপরাহ্নে তিনি (নরেন্দ্র) বরাহনগরে আগমনপূর্বক সঙ্গীতাদিতে রাত্রি প্রায় এগারটা পর্যন্ত কাটাইয়া শয্যাগ্রহণানান্তে বন্ধুদের সহিত নানাবিধ আলাপে নিযুক্ত আছেন, এমন সময় তাহার বন্ধু ‘হেমালী রাত্রি প্রায় দুইটার সময় সেখানে আসিয়া খবর দিলেন, তাঁহার পিতা অকস্মাৎ ইহলোক ছাড়িয়া চলিয়া গিয়াছেন।” বিভিন্ন সূত্র থেকেই হৃদরোগকে বিশ্বনাথ দত্তের মৃত্যুর কারণ বলা হয়েছে।
পিতৃদেবের স্বাস্থ্যের ইতিহাসটি ভাল নয়। মৃত্যুর একমাস আগেই ডায়াবিটিসের রোগী বিশ্বনাথের হৃদরোগ দেখা দেয় এবং মৃত্যুর দিনে তিনি স্ত্রীকে বলেন, “তিনি হৃদয়ে বেদনা অনুভব করিতেছেন। অতঃপর রাত্রে আহারের পর বুকে ঔষধ মালিশ করাইয়া তামাক সেবন করিতে করিতে তিনি কিছু লেখাপড়ার কাজে মন দেন; নয়টায় উঠিয়া বমি করেন এবং তারপরেই রাত্রি দশটায় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হইয়া যায়।”
